যে পুরুষের শাশুড়ি গত হয়েছেন, কিংবা শ্বশুরবাড়ির দেশে জামাই ষষ্ঠীর প্রচলন নেই, তাঁকে এককথায় ‘নরাধম’ বলাই চলে। জামাই ষষ্ঠী হল— বঙ্গপুঙ্গবদের জন্মসূত্র অধিকার। জামাই ষষ্ঠীতে যার নেমন্তন্ন থাকে না, পুরুষ সমাজে তাঁকে নপুংসকের চোখে দেখাটাই রীতি। কিন্তু, কী এই জামাই ষষ্ঠী? কেনই বা এই ষষ্ঠী পালন করা হয়? কী ফল হয় এই ব্রতপালনে? কবে, কেন প্রচলন হয়? বঙ্গ সংস্কৃতির সঙ্গেই বা কীভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই ষষ্ঠী?
জামাই ষষ্ঠী শুধু জামাইয়ের জন্য নয়। সন্তানদের জন্যও পালিত হত এই অনুষ্ঠান। পূর্ববঙ্গে তালপাতার পাখা ভিজিয়ে বা কচি বাঁশপাতার গোছায় গঙ্গাজল দিয়ে মা সন্তানদের মাথায় ছিটে দিতেন। জামাই ষষ্ঠীর দিন বাড়ির ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড়ও হত। সব মিলিয়ে এটা ছিল সন্তানদের কল্যাণ কামনা করে পালিত এক আচার। এখানে আরও একটি কথা বলা যায়, জামাই শব্দের উৎপত্তি কোথা থেকে! সমার্থ শব্দকোষে রয়েছে, ‘জামি’ মানে সধবা বধূ, কুলবধূ, এয়োস্ত্রী। অর্থাৎ এখান থেকে কন্যার স্বামী, জামাই শব্দের উৎপত্তি। প্রসঙ্গত বলা যায়, ভারতের প্রথম স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের নামও ‘জামাই ষষ্ঠী’। ছবিটি ১৯৩১ সালের ১১ এপ্রিল ক্রাউন সিনেমা হলে মুক্তি পায়। পরিচালক ছিলেন অমর চৌধুরী। যদিও ছবিটির প্রিন্ট এখন আর পাওয়া যায় না। ওই বছরই প্রথম ভারতীয় পূর্ণ দৈর্ঘ্যের সবাক চলচ্চিত্র ‘আলম আরা’ মুক্তি পেয়েছিল।
জামাই ষষ্ঠী সম্ভবত মধ্যযুগ বা অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে এসেছে। মঙ্গলকাব্যের হাত ধরে যে সময়ে লৌকিক দেবদেবীর বঙ্গে আগমন, সেই সময়েই ষষ্ঠী পুজো চালু হয়। ষষ্ঠী হলেন সন্তানাদির দেবী। পক্ষান্তরে ঊর্বরতার প্রতীক। সে যুগে বিবাহিত কন্যা যতদিন না পুত্রসন্তানের জন্ম দিত, ততদিন বাপের বাড়ি আসার অনুমতি ছিল না। তাই জামাইকে নেমন্তন্ন করে এনে মেয়েকে কৌশলে বাপের বাড়ি আনার রীতি তৈরি হয়। আবার কেউ মনে করেন, দূরে দূরে বিয়ে হওয়ার কারণে মেয়েরা একা বাবার বাড়িতে আসতে পারত না। তাই পুজোর ছলে জামাই বরণের নামে মেয়েকে দেখার সাধ মিটত বাবা-মায়ের। তৃতীয় একটি মত হল, জামাইকে পরিবারের ছেলের সমতুল মর্যাদা দানের জন্য তাঁর হাতে তেল-হলুদ ছোপানো সুতোর গিঁট বেঁধে একাত্মীকরণ হতো জামাই ষষ্ঠী পালনে। কারণ যাই হোক, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের পুত্রসন্তান কামনার ব্রত এটি।
চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর ‘হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান’ বইটিতে এ সম্পর্কে অনেক কিছু পাওয়া যায়। ষষ্ঠীর ব্রতকথায় আছে, বাড়ির বউ সব খাবার খেয়ে পোষা বিড়ালের নামে দোষ দিত। সেই বিড়াল ছিল মা ষষ্ঠীর বাহন। বাহনের নামে এই দোষারোপের জেরে ছোট বউয়ের ওপর কুপিত হন মা ষষ্ঠী। তাঁর অভিশাপে ছোট বউয়ের সন্তানেরা জন্মের পর একে একে আঁতুড়ঘরেই মারা যেতে থাকে। শোকে পাগল হয়ে সেই গৃহিণী আশ্রয় নেন এক বনে। অন্য সংস্করণে, তাঁকে গৃহচ্যুত করা হয়। বনে বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তাঁকে দেখা দেন মা ষষ্ঠী। তাঁকে তুষ্ট করে আবার সন্তানদের ফিরে পান ওই বধূ। তাঁকেই নিজের ব্রত প্রচারের ভার দেন মা ষষ্ঠী। হয়তো বনে দেবীর দেখা পেয়েছিলেন বলে ব্রতর নামের সঙ্গেও জুড়ে গিয়েছে ‘অরণ্য’ শব্দটি। অন্যান্য ষষ্ঠীর মতো এই ব্রততেও উল্লেখযোগ্য হল পুজোর ডালি। আমের পল্লব দিয়ে সাজানো ঘট তো থাকেই। থাকে কাঁঠালপাতার ওপর সাজানো পাঁচ, সাত বা নয় রকমের ফল। তার মধ্যে একটি হতেই হবে করমচা। আর থাকে ১০৮ গাছা দূর্বা। সেই গাছা ঘটের জলে ভিজিয়ে তালপাতার সঙ্গে ধরে বাতাস করা হয় সন্তানদের এবং অবশ্যই জামাইকেও। দুই বাংলাতেই এই ষষ্ঠীর প্রচলন আছে। তবে রীতি-রেওয়াজের সামান্য তফাত আছে। বরিশাল, চট্টগ্রামে এই ষষ্ঠী পালন হয় না। জামাইকে দেওয়া ফলের ডালিকে ওপার বাংলায় বলা হয় ‘মুঠা’। আর এপারে বলে ‘বাটা’। জামাইকে খাবার-দাবার দিয়ে কপালে দইয়ের ফোঁটা, ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করাই রীতি। সঙ্গে পড়া হয় একটি ছড়া। ছড়াটি মূলত এ রকম, ‘ জ্যৈষ্ঠ মাসে অরণ্য ষষ্ঠী,ষাট ষাট ষাট / শ্রাবণ মাসে লোটন ষষ্ঠী,ষাট ষাট ষাট / ভাদ্র মাসে মন্থন ষষ্ঠী,ষাট ষাট ষাট / আশ্বিন মাসে দুর্গা ষষ্ঠী,ষাট ষাট ষাট / অঘ্রাণ মাসে মূলা ষষ্ঠী,ষাট ষাট ষাট / পৌষ মাসে পাটাই ষষ্ঠী, ষাট ষাট ষাট/ মাঘ মাসে শীতল ষষ্ঠী,ষাট ষাট ষাট/ চৈত্র মাসে অশোক ষষ্ঠী,ষাট ষাট ষাট / বারো মাসে তেরো ষষ্ঠী ষাট ষাট ষাট |’
শুধু, ধর্ম বা রেওয়াজেই সীমাবদ্ধ নয় জামাই ষষ্ঠী। বঙ্গ সংস্কৃতিতেও জড়িয়ে রয়েছে তা। যেমন, নদিয়া জেলার ধানতলা থানার আড়ংঘাটার যুগলকিশোর মেলা৷ ‘জামাইষষ্ঠী মেলা’ হিসেবে পরিচিত এই মেলার বয়স প্রায় ৩০০ বছর ৷ জামাই ষষ্ঠীর দিন নবদম্পতিরা আশীর্বাদ নিতে আসেন রাধাগোবিন্দের কাছে। কারণ এই জামাই ষষ্ঠীর দিন রাধারানি এবং গোবিন্দের বিবাহ হয়েছিল। বৈশাখ মাসের সংক্রান্তিতে শুভ সূচনা হয় এই প্রাচীন মেলার ৷ লোকবিশ্বাস এই যে, মেলার সময় যুগলকিশোরের মূর্তি দর্শন করলে মহিলারা শুধু এই জন্মেই নয় পরজন্মেও বিধবা হন না৷ জামাই ষষ্ঠীর দিনই কাতারে কাতারে নবদম্পতি বিগ্রহ দর্শনে আসেন। একদা মহাত্মা গঙ্গারাম দাস নামে এক ব্রাহ্মণ বৃন্দাবন থেকে একটি গোবিন্দ মূর্তি নিয়ে আসেন৷ নবদ্বীপের কাছাকাছি সমুদ্রগড় নামে একটি জায়গায় স্থাপন করে পূজার্চনাও করতে থাকেন৷ কিন্তু সেই সময়ই বর্গীর আক্রমণ বাড়তে থাকে৷ প্রাণ বাঁচাতে গঙ্গারাম দাস গঙ্গা পেরিয়ে আড়ংঘাটায় এসে উপস্থিত হন৷ প্রথম রাতেই গোবিন্দ তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন৷ বলেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে যে রাধারানি আছে তাঁর সঙ্গে গোবিন্দের বিবাহ দিতে৷ পরদিনই গঙ্গারাম রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে হাজির হন৷ রাজাকে স্বপ্নাদেশের কথা বলেন৷ কিন্তু রাজা অবিশ্বাস করেন৷ সেই রাতেই গঙ্গারাম ফের স্বপ্নাদেশ পান৷ এবার গোবিন্দ তাঁকে বলেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে একটি চুনের দাগ দেওয়া পরিত্যক্ত দেওয়াল আছে৷ সেই দেওয়ালের মধ্যে আছে একটি রাধারানি৷ পরদিন সকালে ফের রাজাকে পুরো স্বপ্নাদেশের কথা খুলে বলেন৷ রাজা এবার তাঁর কথায় বিশ্বাস করেন৷ সেই দেওয়াল খুঁড়ে দেখা যায় সেখানে একটি রাধারানির মূর্তি রয়েছে৷ তখন সেই গোবিন্দের সঙ্গে খুঁজে পাওয়া রাধারানির বিবাহ দেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র৷ উভয় বিগ্রহের একসঙ্গে নাম দেওয়া হয় যুগলকিশোর৷ এই যুগলের মিলনের আনন্দ উৎসব পালনের জন্য মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মাসব্যাপী মেলার সূচনা করেন৷
কিন্তু, কখনও কি বিগ্রহকে জামাইরূপে দেখা হয়েছে? শুনতে অবাক লাগলেও এই নিদর্শনও আছে নবদ্বীপে। জ্যৈষ্ঠমাসের শুক্লপক্ষে মহাপ্রভু মন্দিরে পালিত হয় জামাই ষষ্ঠী। সে দিন আর শ্রীকৃষ্ণের অবতার নন, বরং নিমাই তাঁদের জামাই। এই মন্দিরের সেবায়েতরা বংশ পরম্পরায় বিষ্ণুপ্রিয়ার ভাইদের উত্তরপুরুষ। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে এই তিথিতে শ্রীচৈতন্যদেবের বিগ্রহকে তাঁরা জামাই হিসেবে আপ্যায়ন করে আসছেন। স্থানীয় প্রবীণারা মহাপ্রভুকে ষাটের বাতাস দেন। হাতে পরিয়ে দেন সুতো। বিগ্রহের পরনে নতুন পোশাকের সঙ্গে থাকে রাজসিক ভোগের আয়োজন। রুপোর বাসনে থাকে ফল, রুপোর বাটিতে ক্ষীর, রুপোর গ্লাসে জল দিয়ে ঘুম ভাঙানো হয় মহাপ্রভুর। তার পর থাকে চিঁড়ে, মুড়কি, দই, আম, কাঁঠাল ও মিষ্টির ফলাহার। দুপুরে নানা তরকারি, ডাল, ভাজা, থোড়, বেগুন পাতুরি, ছানার ডালনা, ধোকার ডালনা, লাউ, চালকুমড়ো এবং পোস্ত দিয়ে রাঁধা যায় এমন সব রকমের নিরামিষ পদ। দিবানিদ্রার পরে বিকেলে নিমাইয়ের উত্থানভোগে থাকে ছানা আর মিষ্টি। রাতে গাওয়া ঘিয়ের লুচির সঙ্গে মালপোয়া আর রাবড়ি। সবার শেষে সুগন্ধী দেওয়া খিলি পান। ভোগের বিশেষত্ব হল আমক্ষীর। সুমিষ্ট আমের রস ক্ষীরের সঙ্গে পাক দিয়ে তৈরি হয় এই পদ। এরসঙ্গে সেবায়েত পরিবারের ঘরে তৈরি মিষ্টি দিয়ে জামাইরূপী নিমাইকে তুষ্ট করা হয়।।
জামাইবাবুর সঙ্গে শ্যালক-শ্যালিকার রঙ্গ রসিকতার দিনও কিন্তু এটাই। জামাইকে ঠকাতেই কোনও এক বনেদি গিন্নির ফরমায়েশে হুগলির সূর্য মোদক বানিয়েছিলেন জলভরা তালশাঁস। নতুন মিষ্টি দেখে আগ্রহ ভরে কামড় বসিয়েছেন জামাই। পরমুহূর্তেই তাঁর হাত, নতুন পাঞ্জাবি মাখামাখি গাঢ় রসে। শোনা যায়, কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে ঘটা করে হতো জামাইষষ্ঠী। পরিবারের এক জামাইয়ের নাকি ঘনঘন পান খাওয়ার নেশা। তাই তাঁকে দেওয়া হতো সোনার লবঙ্গ গুজে দেওয়া পানের খিলি। তিনি সেই সোনার লবঙ্গ খুলে মাটিতে ফেলে দিতেন। বাড়ির বাচ্চারা সেগুলি কুড়িয়ে নিত।
গল্পকথা যাই থাক, বঙ্গজ পুরুষদের মধ্যে যে রাজার জামাই হওয়ার এক অবদমিত সাধ আছে, সেকথা তো সত্যজিৎ রায়ই বলে গিয়েছেন। তাই না…..!