গতবারে ছায়া মন্ত্রিসভা তৈরি করা হয়েছিল, শুনেছিলাম রুদ্রনীল ঘোষ, সেই ছায়া মন্ত্রিসভাতে তথ্য সংস্কৃতি দফতর না পেয়ে, যার পর নাই রেগে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা ছিল খুব ছোট্ট ব্যাপার, কারণ আসল লড়াই তো চলছিল ‘কোন বনেগা মুখ্যমন্ত্রী’ নিয়ে। কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী? প্রশ্নের উত্তরে দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, ‘দল আমাকে যে দায়িত্ব দেবেন সেটাই মাথা পেতে নেব’। স্বাভাবিকভাবে সেই একই প্রশ্ন গিয়েছিল শুভেন্দু অধিকারীর কাছেও, সদ্য দলে ঢুকেছেন, বলেছিলেন, ‘সে তো আমাদের, মানে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ঠিক করবেন’। আসলে নির্বাচনকে বেশ জমিয়ে দিতে যাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করেন, তাঁরা হলেন সাংবাদিক, সংবাদকর্মী। কাজেই মুখ্যমন্ত্রী পদে আদি বিজেপি দিলু ঘোষের সঙ্গে নব্য বিজেপির খটামটি লাগিয়ে দেওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। লেগেও ছিল, সেই সময় থেকেই দিলু বনাম মেজখোকার একটা অঘোষিত লড়াই আজও বরকরার। ২০১৯-এ দিলীপ ঘোষই তো এনে দিয়েছিলেন ১৮টা লোকসভা আসন, হিসেব করলে ১২৬টা বিধানসভা আসন, কাজেই তাঁর দাবেদারি থাকবে বৈকি। ওদিকে তৃণমূলের অন্যতম নেতাকে ভাঙিয়ে বিজেপিতে আনার শর্তই নাকি ছিল ওই মুখ্যমন্ত্রীত্ব। কাজেই ভোটের শেষ দিন নয়, ফলাফল ঘোষণার আগের দিন রাত পর্যন্ত সেই ডাডার অনুগামী, দিলুদার অনুগামীদের মধ্যে কথা চালাচালি হয়েছে। মিডিয়াতেও ‘কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী’তে দু’জনের নাম ছিল। কিন্তু আজ? ২০২৬-এ? শুনেছেন নাকি কোথাও? বরং উলটো চর্চা চলছে। সেটাই বিষয় আজকে, বিরোধী দলনেতা কে হবেন? দিলীপ ঘোষ না শুভেন্দু অধিকারী?
আচ্ছা একবারও ভেবে দেখেছেন, কেন হঠাৎ ২০২১ সালে ওই প্রশ্ন উঠেছিল? কারণ সেবারে নির্বাচনের দিন ঘোষণার দিনেই এবিপি তাদের ওপিনিয়ন পোলে জানিয়েছিল, তৃণমূল যদি খারাপ ফল করে তাহলে তারা, ১৫২টা আসন পাবে, আর বিজেপি ভালো করলে ১২১টা আসন পাবে, বাকি আসন বাম-কংগ্রেস। ওদিকে রাজ্যের তিন মন্ত্রীর সঙ্গে ফলাফল বের হলেই পালটি মারার আলোচনা হয়েই গিয়েছে, অতএব ওই ১২১ পেলেও সরকার তো বিজেপির। কাজেই ছায়া মন্ত্রিসভা তৈরি করা শুরু হল, মুখ্যমন্ত্রীত্ব নিয়ে গোষ্ঠীদন্দ্ব শুরু হল, অনেকে সেই আলোচনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উলটো দিকে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের নামও আলতো করে ভাসিয়ে দিলেন, কারণ সেবারে সাংসদ লকেট বিধানসভাতেও প্রার্থী ছিলেন। স্বরাষ্ট আর পূর্ত দফতর নিয়েও জল্পনা হল, কারণ একটাতে আছে ক্ষমতা, অন্যটাতে আছে টাকা, অবশ্য দুটোর যে কোনও একটা থাকলেই তো অন্যটা এমনিই এসে যায়।
আরও পড়ুন: Aajke | দু’দফায় বিজেপির দফারফা
কাজেই মূল প্রশ্নটা ছিল, মন্ত্রিসভা তো হচ্ছেই, বাংলা তো দখলে আসছেই, তাহলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? শুভেন্দু অধিকারী, না দিলীপ ঘোষ? আর এবারে, সেই একই এবিপি তাদের ওপিনিয়ন পোলে জানিয়েছে তৃণমূল পাবে ১৫৫–১৭০টা আসন, বিজেপি পাবে ১০০ থেকে ১১০টা আসন। আর গতবারে মুখ পোড়ার পরে আর কেউ ঐ ‘কোন বনেগা মুখ্যমন্ত্রী’ প্রশ্ন আর তুলছেন না, উচ্ছৃষ্টভোগী সাংবাদিকেরাও নয়। কারণ খুব পরিস্কার, গত বারে তৃণমূল পাবে ১৫২টা, বলার পরে তৃণমূল পেয়েছিল ২১৩টা আসন, কাজেই এবারের হিসেবের পরে পড়ে থাকছে ওই বিরোধী দলনেতার পদ। তো খড়গপুরে দিলীপ ঘোষ, সিওর সিট, হিরো হিরণকে সরিয়ে নেওয়ার পরে ২০২৪ এর শহীদ দিলুদার প্রত্যাবর্তন তাঁকে অনায়াস জয় এনে দেবে। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী? তাঁকে কি মুরগি করা হল? নন্দীগ্রামে গতবারের জয় কত ভোটে? মাত্র ১৯৫৬ ভোটে জিতেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী, সেবারে এক প্রবল হাওয়ার মধ্যেও জয় এসেছিল কান ঘেঁষে। সেই মার্জিন পার করা যায় না, এমন মার্জিন তো নয়। কাজেই শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম থেকে জিতবেনই, এমন গ্যারান্টি সামান্য নির্বাচন নিয়ে পড়াশুনো করেছে এমন মানুষজন দেবেন না। অন্যদিকে ভবানীপুরে? প্রথমে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ২৮ হাজার ৭১৯ ভোটে রুদ্রনীল ঘোষকে হারিয়েছিলেন, পরে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় পদত্যাগ করেন, সেই উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়ালকে ৫৮ হাজার ৮৩৫ ভোটে হারান। কাজেই সেই অর্থে এই আসন তৃণমূলের সেফ সিট গুলোর মধ্যে একটা। কাজেই এখানে শুভেন্দু অধিকারীকে জিততে হলে তৃণমূলের থেকে ১০ শতাংশ ভোট বেশি পেতে হবে। সেই অবস্থা আছে কি? আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপাতত বিধানসভার বিরোধী দলনেতাকে নন্দীগ্রাম জিততে হলে দাঁতে দাঁত দিয়ে লড়তে হবে, কারণ মার্জিন ছিল ২০০০-এর কম, আবার ভবানীপুরে তাঁর জেতা বেশ কঠিন। তাহলে কি আগামী বিধানসভাতে বিরোধী দলনেতার আসনে আমরা দিলীপ ঘোষকেই দেখতে পাবো? শুনুন মানুষজন কী বলছেন।
হ্যাঁ, এটাই হল সেই ‘মাইনকা চিপা’, সেই টানাপোড়েন, সেই জাঁতাকলের অবস্থা, মুখ্যমন্ত্রী তো দুরস্থান, বিরোধী দলনেতা হতে গেলেও শুভেন্দু অধিকারীকে বেগ পেতে হবে। হ্যাঁ, গতবারের সেই হাওয়া নেই, সেই আবেগ নেই, উলটে এসআইআর বা এই মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ার মতো ঘটনাগুলো বিজেপির বিরুদ্ধেই কাজ করছে। বিচারাধীন ৬০ লক্ষ মানুষজনের ৮০ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলমান, যাঁরা এবারে এককাট্টা হয়ে তৃণমূলের দিকে ভোট দেবেন। সব মিলিয়ে জীবনের কঠিনতম লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন শুভেন্দু অধিকারী। হ্যাঁ, তাই আপাতত প্রশ্ন কে হবেন বিরোধী দলনেতা? শুভেন্দু অধিকারী না দিলীপ ঘোষ?
দেখুন আরও খবর:

