বিপাশা চক্রবর্তী- সময়টা ছিল করোনাকাল (Covid Period)। গোটা বিশ্ব (World) এক অস্থিরতার অন্ধকারে। আতঙ্ক, ভয় কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। এই সময়ের সব থেকে বেশি প্রভাব পড়েছিল কর্মজগতে। হঠাৎ করে চাকরি চলে যাওয়া, বেতন কম, ছাঁটাই এক অনিশ্চিত দিশাহীন ভবিষ্যত সকলকে গ্রাস করেছিল। অনেকের মতোই সেই অন্ধকার গ্রাস করেছিল দুই বঙ্গতনয়াকে (Two women) ।

২০১৭ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা, মেধাবী ছাত্রী প্রিয়া চৌধুরী (Priya Chowdhury) ও অন্বেষা ঘোষ (Anwesha Ghosh) স্বপ্ন দেখেছিল নামী সংস্থায় চাকরি করবে দুজনে। কিন্তু স্রষ্টা তাঁদের দুজনের ভবিষ্যত লিখেছিল অন্যভাবে ।
অন্বেষা ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী আর প্রিয়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ইতিহাসে। তখনও দুজনে দুজনের কাছে অপরিচিত। পড়াশোনা শেষে দুজনেই অধ্যাপনার জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু করোনা সব কিছুকেই থামিয়ে দিল। পড়াশোনার বিষয় আলাদা হলেও, একটা বিষয় দুজনের মিল ছিল, ‘ভ্রমণ’, দেশ ঘুরে বেড়ানোর নেশা। সেই নেশাই দুজনকে পেশাগত দিক দিয়ে এক বন্ধুত্বের বন্ধনে বেঁধে ফেলল। শুরু হল লড়াই।

অনেকটাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটা ট্রাভেল গ্রুপ খুলে ফেলেন প্রিয়া। অ্যাড হয়ে যায় অন্বেষাও । সাথ দেয় সোশ্যাল মিডিয়াও। ২০২১ সালে নিজেরা কিছু করব সেই তাগিদ নিয়ে অনেকটা সাহস নিয়ে শুরু হল ‘নাড়ির টানে নারীর ভ্রমণ’ (Narir Tane Narir Bhraman) গ্রুপ। প্রথম ১৩ জনকে নিয়ে শুরু হল গ্রুপ ট্যুর।
‘বাঁকুড়ার জয়পুরের জঙ্গল ভ্রমণ। সাফল্য পান তাঁরা। বাড়ে আত্মবিশ্বাস। প্রতিবন্ধকতা এসেছিল, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কিছুই। মেয়ে বলে শুনতে কথা হয়েছিল সমাজের অনেক কথাও, কিন্তু পিছিয়ে যাননি।

প্রিয়া আর অন্বেষা দুজনের কথায়, নিজের কিছু করার তাগিদ যেমন ছিল, নারীদের জন্য কিছু করব এই রকম একটা ভাবনা চিন্তাও ছিল। আমরা মনে করি, মেয়েরা সব পারে। তবে অনেক সময় পরিস্থিতি সাথ দেয় না। সেই ভাবনা নিয়েই এই গ্রুপের জন্ম। যেখানে সারাদিনের কাজের পর, দুদিন থেকে তিনদিনও তারা নিজের মতো করে কাটাক। নিজেকে সময় দিক, নিজেকে ভালোবাসুক, এটা চেয়েছিলাম। এই গ্রুপে সব নারীদেরই স্বাগত। অল্পবয়সী থেকে বয়স্ক সকলেই এই গ্রুপে জয়েন করে বেড়াতে যেতে পারে। বেড়াতে গিয়ে সবার সঙ্গে সকলের বন্ধুত্বও হয়ে যায়। ট্যুরের শেষে সকলের হাসিমুখ দেখাটাই আমাদের এই কাজের মূলধন। সেই হাসি, সকলের ভালো লাগা আমাদের আরও এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।

প্রিয়ার আর অন্বেষা জানান, জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ভাল্কিমাচান ট্রিপ। প্রথম ২৬ জনকে নিয়ে ট্যুর করি, দারুণ সাকসেস পাই। তখনই দুজনে সিদ্ধান্ত নিই, আর চাকরি নয়, এবার নিজেদের নেশাকে পেশা হিসেবে বেছে নেব। সেই মতো ছোট থেকে বড় ট্যুর খুব সুন্দরভাবে অর্গানাইজ করে নিয়ে যাওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য। এই পাঁচ বছরে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় দেড়শোর বেশি ট্যুর হয়ে গেছে।

দুই বঙ্গতনয়া আরও জানান, এই ট্যুরে গিয়ে বুঝেছি প্রত্যেক মেয়েই নিজের মতো একটু সময় খোঁজে। হয়তো সে মুখ ফুটে বলার সাহস পাচ্ছে না, বা ঘরের বাইরে যেতে পারছে না, ভয় পাচ্ছে, নিরাপত্তার অভাব বোধ করছে।

আমাদের এই গ্রুপ নিঃসন্দেহে তাঁদের এবং সেইসঙ্গে আমাদের নিজেদের জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম। যা আমাদের হেরে না গিয়ে নতুন ঘুরে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। আমাদের দুজনের লক্ষ্য কোনও দিন শুধুই ব্যবসা করব, সেটা ছিল না, সকলকে নিয়ে একসঙ্গে ভালো থাকব, ভালো রাখব সেটাও চেয়েছিলাম। এই নারী দিবসে (International Women’s Day) একটা কথাই বলতে চাই, নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে পেরেছি দুজনেই, এটাই আমাদের বড় পাওয়া।

সময়ের যাঁতাকলে আজ দুজনেই বিবাহিত ও দুই কন্যাসন্তানের মা। তবে সাংসারিক ব্যস্ততা ও সন্তানের দায়িত্ব, সংসার সব সামলেও নিজের স্বপ্নকে আরও সুন্দর করতে চান দুজনেই।

দুই বঙ্গতনয়ার কথায়, আমরা মেয়েরাই সব পারি, প্রয়োজন একটু সাহস, আর আত্মবিশ্বাস। বাইরের জগতটায় আমাদের জন্য অনেক কিছু নিয়ে অপেক্ষা করছে সেটা দুচোখ ভরে দেখব, নিজেকে ভালোবেসে, সাবলম্বী হয়ে বাঁচব। প্রতিবন্ধকা আসুক, তবে লড়াই করার সাহস রাখি দুজনেই। হার মানব না।

‘এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব’।
