ওয়েব ডেস্ক : ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। সেই কর্মসূচি ঘিরে শনিবার রাজধানীজুড়ে ব্যাপক পুলিশি অভিযান চালানো হয়। আটক করা হয় ১৫০০-রও বেশি জনকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বাম নেতা পিনারাই বিজয়ন এবং মানিক সরকার। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল।
দিল্লিতে পৌঁছনোর পর বিমান থেকেই আটক করা হয় ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে (Abhijeet Dipke) এবং দলের নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে। পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন মহারাষ্ট্রে তাঁর নিজের শহরে প্রয়াত হন দীপকের পিতামহী। শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি যেতে পেরেছেন কি না, তা জানা যায়নি। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরে পৌঁছতে গেলে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের আটক করা হয়। একাধিক এলাকায় ব্যারিকেড বসানো হয়। চলাচলে বিধিনিষেধ জারি করা হয়। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর বিপুল সংখ্যক কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। বিক্ষোভের অনুমতি না থাকার কথা জানিয়ে আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি করতে বাধা দেওয়া হয়।
যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ধর্নায় বসার চেষ্টা করেছিল ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের সভানেত্রী নেহা বোরার নেতৃত্বে সেখানে জমায়েত হয়। অভিযোগ, লাঠি হাতে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। অন্যদিকে, গুরুগ্রাম থেকে আটক করা হয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও। বহু আন্দোলনকারীকে তাঁদের বাড়ি ও হোটেল থেকে আটক করা হয়।
আরও খবর : ‘ভারত কোনও বানানা রিপাবলিক নয়’, বিরোধীদের কড়া ভাষায় আক্রমণ বিজেপির
দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। ছাত্রদের সঙ্গে একটি কর্মসূচিতে যোগ দিতে তিনি তখন চেন্নাইয়ে ছিলেন। এক্সে তিনি লেখেন, “সব নেতাকে গ্রেফতার করুন। সব তরুণকে গ্রেফতার করুন। আমাদের সবাইকে গ্রেফতার করুন। আমরা আপনাদের ঘিরে ধরছি এবং পিছিয়ে আসব না। আমার কথা মনে রাখবেন, আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ইতিমধ্যেই হাতে রয়েছে… ভারতের তরুণদের নিয়ে আমি গর্বিত। প্রতিবাদ চালিয়ে যান। আমরা আপনাদের পাশে আছি।”
চলতি সপ্তাহে টানা চার দিন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাহুল। শুক্রবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে স্মারকলিপি জমা দেয় বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোট। শনিবার আটক হওয়া নেতাদের মধ্যে ছিলেন সিপিআইএমের এম এ বেবি, বৃন্দা কারাঠ, সিপিআইএমএলের দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব ও প্রশান্ত ভূষণ। আম আদমি পার্টির সঞ্জয় সিং, সৌরভ ভরদ্বাজ ও গোপাল রাইয়ের পাশাপাশি তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন এবং সাকেত গোখলেকেও আটক করা হয়। বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের গেট বন্ধ রাখা হয়েছিল। বাতিল করা হয় ২৫০টিরও বেশি ট্রেন। যন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ রাখা হয়েছিল। দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মিলিয়ে অন্তত ২৫ হাজার কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল।
আটক হওয়ার আগে দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দেশজুড়ে তরুণদের রাজধানীতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “এতদিন মোদিজি ভোট চুরি করেই নির্বাচনে জিততেন। এখন তিনি হাতেনাতে ধরা পড়েছেন।” তিনি আরও বলেন, “মোদিজি যেখানে আপনাদের আটকাবেন, সেখানেই বসে পড়ুন। সেই জায়গাকে যন্তর মন্তর বানিয়ে দিন। গোটা দেশকে যন্তর মন্তর করে তুলুন।” সকালে থেকেই দিল্লির লোধি এস্টেটে কেজরিওয়ালের বাড়ির বাইরে পুলিশ মোতায়েন ছিল। যন্তর মন্তরের উদ্দেশে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে বের হলে তাঁকে আটক করা হয়। তাঁকে পুলিশ বাসে তোলার সময় কয়েকজন কর্মী তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। একই সময়ে আটক হন আপের অন্য নেতারাও।অন্যদিকে, সাউথ অ্যাভিনিউয়ে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের অন্য নেতাদের যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দেওয়া হয়। তবে তাঁদেরকেও আটক করা হয়।
আন্দোলনকারীদের আটক করার ঘটনায় সরব হয়েছেন লাদাখের পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকও। শনিবারের বিক্ষোভে যোগ না দিলেও তিনি বলেন, ভারতে “অঘোষিত জরুরি অবস্থা” চলছে। আটক নেতাদের মুক্তি না দিলে অনশন অথবা পদযাত্রার কথা ভাবতে বাধ্য হবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। লাদাখে গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা জানিয়ে আগেই বিক্ষোভে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন ওয়াংচুক।
এদিকে, সোমবার সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতে চারটি দাবি জানানো হয়েছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, নির্বাচন কমিশনারদের আজীবন আইনি সুরক্ষা দেওয়া ২০২৩ সালের আইন প্রত্যাহার, এসআইআর স্থগিত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৩.৩ কোটি ভোটারের নাম পুনর্বহাল এবং সব নির্বাচনে কাগজের ব্যালট ফিরিয়ে আনা। গত দু’বছরে যেসব বিধানসভা নির্বাচনে ভোটচুরির চূড়ান্ত প্রমাণ রয়েছে বলে বিরোধীরা দাবি করেছে, সেই নির্বাচন বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে।
