ওয়েব ডেস্ক : শহরের বড় বড় পুজোর ভিড়ে আলাদা আবহ তৈরি করে দেশবন্ধুপাড়ার চক্রবর্তী বাড়ির দুর্গাপুজো (Durga puja 2026)। এখানে পুজোর প্রস্তুতি শুধু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পুজোর দিনগুলিতে গোটা পাড়াই যেন হয়ে ওঠে এই বাড়ির আপনজন। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ির উঠোনে বসে গানের আসর। পাড়ার মহিলাদের আগমনী গানের মহড়ায় ধীরে ধীরে তৈরি হয় দুর্গোৎসবের পরিবেশ।
প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এই পুজোর শিকড় অবশ্য শিলিগুড়িতে (Siliguri) নয়। বাংলাদেশের ঢাকার বিক্রমপুরে পূর্বপুরুষদের হাত ধরে শুরু হয়েছিল এই দুর্গারাধনা। সেই সময় পুজোর সঙ্গে মোষ বলির প্রথাও জড়িত ছিল। সময়ের সঙ্গে বদলেছে রীতি। একসময় কয়েক বছরের জন্য পুজো বন্ধও হয়ে যায়। পরে প্রায় ১৫ বছর আগে শিলিগুড়িতে ফের শুরু হয় দেবী আরাধনা। বর্তমানে রামকৃষ্ণ মিশনের নিয়ম মেনেই পুজো পরিচালিত হয়। চক্রবর্তী বাড়ির পুজোয় এখনও ধরে রাখা হয়েছে বেশ কিছু নিজস্ব রীতি। পুজোর প্রয়োজনীয় দশকর্মার সামগ্রী বাজার থেকে কিনে আনার পরিবর্তে পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের হাতে সেগুলি সংগ্রহ করেন। শুধু তাই নয়, সাতটি নদীর জলও আলাদা করে সংগ্রহ করে আনা হয়। ফলে পুজোর প্রতিটি আচারেই মিশে থাকে পরিবারের সদস্যদের শ্রম, বিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের আবেগ।
আরও খবর : গণেশ চতুর্থীতে বাড়িতেই পুজো করবেন? মূর্তি স্থাপন থেকে নৈবেদ্য, মেনে চলুন এই নিয়মগুলি
এই পুজোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের গৃহকর্ত্রী শ্রাবণী চক্রবর্তীর আবেগ। তাঁর কাছে দেবী দুর্গা শুধুমাত্র আরাধ্যার দেবী নন, পরিবারের মেয়ের মতো। সেই অনুভূতি থেকেই পুজোর নিয়ম মেনে নিজের হাতে দেবীর গায়ে হলুদ দেন তিনি। ভোগের আয়োজনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে তাঁর। পুজো উপলক্ষে বাড়িতে প্রায় ৫০ ধরনের পদ রান্নার প্রস্তুতি চলে। খাবারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট পারিবারিক রীতি। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত সেই নিয়ম মেনেই চলে রান্নাবান্না। পঞ্চমী থেকে নিরামিষ খাবারের আয়োজন থাকলেও দশমীর দিন থাকে আমিষ পদ।
চক্রবর্তী বাড়ির পুজোকে ঘিরে প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণও এই আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রান্নাবান্না, অতিথি আপ্যায়ন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে পুজোর বিভিন্ন কাজ—সবেতেই পাড়ার মানুষের সক্রিয় উপস্থিতি থাকে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে ভোগ খাওয়ার মুহূর্তও হয়ে ওঠে উৎসবের অন্যতম আনন্দ। দূরদূরান্ত থেকে আসা অতিথি ও দর্শনার্থীদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেদিকেও নজর রাখেন পরিবারের গৃহকর্তা দীপজ্যোতি চক্রবর্তী। তাঁর কাছে পুজোর সার্থকতা তখনই, যখন বাড়িতে আসা প্রত্যেক মানুষ আপনজনের মতো স্বচ্ছন্দে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।
এবারও সুশান্ত পালের তৈরি ডাকের সাজের প্রতিমায় পুজো হবে চক্রবর্তী বাড়িতে। চারদিন ধরে আগমনী গান, ধুনুচি নাচ-সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। এই পুজোর আরও একটি আকর্ষণ চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখেদের উপস্থিতি। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী-সহ একাধিক তারকা এই বাড়ির পুজোয় আসেন।
তবে তারকা হলেও এই বাড়ির চৌহদ্দিতে তাঁদের জন্য তৈরি হয় না কোনও আলাদা দূরত্ব। পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী এবং অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে একসঙ্গেই উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন তাঁরা। তাই চক্রবর্তী বাড়ির দুর্গাপুজো শুধু দেবী আরাধনার উৎসব নয়, বরং ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য, প্রতিবেশীর ভালোবাসা এবং সকলকে আপন করে নেওয়ার এক অনন্য গল্প।
