অনাস্থা প্রস্তাবের বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে, অনেকেই বলবেন, অনেক কিছুই বলবেন। দোরগোড়ায় নির্বাচন কাজেই সেসব কথার অভিমুখ নির্বাচনের দিকেই হবে। আগে নির্বাচনের মাস দুই কি তিন আগে থেকে প্রচারের ঢাকে কাঠি পড়ত, এখন বিজেপির কল্যাণে দেশের রাজনীতিতে প্রথম এবং একমাত্র বিবেচনা নির্বাচন। তার উপরে আবার বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাব। কাজেই আলোচনায় নির্বাচন ফিরে ফিরে আসবে, শাসকদলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হবে বিরোধীদের নয়া জোট এবং অনাস্থা প্রস্তাব ধ্বনি ভোটেই খারিজ হয়ে যাবে সে তো সব্বাই জানেন, বিরোধীরাও জানেন বইকী। তাহলে এই অনাস্থা প্রস্তাব আনা হল কেন? আসলে সংসদীয় গণতন্ত্রে অনাস্থা প্রস্তাব সবসময়ে সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য আনা হয় না, ইন ফ্যাক্ট আমাদের দেশে সরকার পড়েছে আস্থা ভোটের পরে, অনাস্থা প্রস্তাব নয়। ১৯৭০ থেকে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার মধ্যের জনতা সরকারের সময় বাদ দিলে আর ওই জরুরি অবস্থার দিনগুলোকে বাদ দিলে ১৫ বার অনাস্থা প্রস্তাব এসেছে, প্রতিবারই উনি জয়ী হয়েছেন। তাহলে অনাস্থা প্রস্তাব কেন আনা হয়? অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয় কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সংসদে বহুক্ষণ ধরে আলোচনা করার জন্যে, কোনও এক বিশেষ বিষয়ে সরকার পক্ষের অবস্থান বা বিরোধী দলের কে কোন অবস্থানে আছেন তা মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। কাজেই এই অনাস্থা প্রস্তাবেও মোদিজির সরকার পড়ে গেল কি গেল না তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। মোদিজির মৌনতা ভাঙার জন্যই এই অনাস্থা প্রস্তাব জরুরি ছিল।
দেশের এক প্রান্ত। সীমান্তবর্তী এক রাজ্য জ্বলছে, মানুষ খুন হয়েছে দেড়শোর বেশি, নারীদের গণধর্ষণ করা হয়েছে, ৬০ হাজার মানুষ ঘরছাড়া, নারীদের নগ্ন করে প্যারেড করানো হচ্ছে, ২৫০-র বেশি উপাসনালয় ভাঙা হয়েছে। রাজ্যে বিজেপি সরকার, মুখ্যমন্ত্রী ইম্ফল ছেড়ে বের হতে পারছেন না এরকম একটা সময়ে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী চুপ করে বসে আছেন, উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে বসে আছেন, ঝড় থামার অপেক্ষায়। এই ইনিই নির্বাচনের সময় ছোট্ট ওই মণিপুর রাজ্যেই গিয়েছেন নয় নয় করে পাঁচ বার। ডাবল ইঞ্জিনের কথা বলেছেন, বিকাশের কথা বলেছেন, মিলা কি নহি মিলা, মিলা কি নহি মিলা বলে রাজ্যের মানুষের সায় নিয়েছেন। সেই মানুষেরা বিপন্ন, উনি চুপ করে বসে আছেন, এমনকী সংসদে এসেও মণিপুর নিয়ে কথা বলতে তিনি রাজি নন। তাই গৌরব গগৈয়ের ভাষায় ঘোড়াকে জলের কাছে টেনে আনা হয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী যিনি ভড়ং দেখানোর জন্য ঘটা করে নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন করেন, সেই তিনিই সংসদের অধিবেশনে থাকতে পছন্দ করেন না। বন্দে ভারতের ফ্ল্যাগ দেখানোটাই আপাতত আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেছেন, আলোচনা চেয়েছেন, সরকারপক্ষ রাজি নন। কাজেই অনাস্থা ছাড়া আর গত্যন্তর কীই বা ছিল? অনাস্থা প্রস্তাবের রীতি অনুযায়ী সাংসদদের যাবতীয় প্রশ্নের জবাবি ভাষণ প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হয়। কাজেই সংসদে না এসে যেভাবে প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তা আটকাতেই, বা সংসদে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে হাজির কারানোর জন্যই বিরোধীরা এই অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে, সরকার ফেলে দেওয়ার জন্য নয়, সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিরোধীদের নেই। কাজেই গতকাল এবং আজ বিরোধী সদস্য, সরকারে থাকা বিজেপি বা এনডিএ-র সদস্যরা অনেক কথা বললেন, রাহুল গান্ধীও বললেন, বললেন মণিপুরে হত্যা করা হচ্ছে ভারতবর্ষকে। কিন্তু সবার বলার শেষে প্রধানমন্ত্রীকে মৌনতা ভাঙতে হবে, বলতে হবে। কিন্তু তার আগে দেখে নিন, দেশজুড়ে বিজেপির প্রচার বাহিনী এই মণিপুর নিয়ে কোন প্রচারে নেমেছে বা এই মণিপুরে দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ তো কোনও রাজনৈতিক দলকেই গৌরবান্বিত করে না, কিন্তু এই দাঙ্গা থেকেই বিজেপি কীভাবে তাদের ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | এই মুহূর্তের নির্বাচনী সমীক্ষা, ইন্ডিয়া বনাম এনডিএ
বিজেপির ইতিহাস হল দাঙ্গার ইতিহাস। মাছ জল ছাড়া বাঁচতে পারে না, মানুষ অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনই দাঙ্গা ছাড়া বিজেপি বাঁচতে পারে না। দাঙ্গার থেকেই বিজেপি অক্সিজেন পায়, নিজের বেড়ে ওঠার জন্য বিজেপির দাঙ্গা দরকার, ধর্মীয় দাঙ্গা, জাতি দাঙ্গার প্রতিটি ঘটনা আজ থেকে নয়, আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, জনসঙ্ঘ বা বিজেপিকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। যোগীজি যখন বলেন আমাদের রাজ্যে দাঙ্গা হয় না তখন জানবেন তা সরাসর ঝুট, ১০০ শতাংশ নির্ভেজাল মিথ্যে। যোগীজি ক্ষমতায় আসার পর থেকে উত্তরপ্রদেশে কমবেশি ৩৫,০৪০-এর মতো ছোট বড় দাঙ্গা হয়েছে ২০১৭ থেকে ২০২১ এর মধ্যে। হ্যাঁ, ৩৫ হাজারের বেশি দাঙ্গার ঘটনার সাক্ষী উত্তরপ্রদেশ, কোনওটা এক বেলার, কোনওটা তিন দিনের, কোনওটার অভিযোগ এসেছে, পুলিশ যায়নি। এরকম দাঙ্গার সংখ্যা ৩৫ হাজার। না এই দাঙ্গা গণহত্যার নয়, গণ ধমকির, সংখ্যালঘু সমাজের মানুষজনকে আতঙ্কে রাখা, বুলডোজারের আতঙ্ক, গুমখুন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক, আর এই তথ্য ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর যা সরকারি তথ্য। স্বাধীনতার পর থেকেই দাঙ্গার পিছনে আরএসএস-এর সংগঠন কাজ করেছে, তার উদাহরণ ভূরি ভূরি। মজফ্ফরপুর থেকে আলিগড়, মীরাট থেকে দ্বারভাঙ্গা, দাঙ্গার ছকের কোনও না কোনও জায়গায় পাওয়া গিয়েছে এই আরএসএস-কে। পরবর্তীতে জনসঙ্ঘের নেতারা এই কাজে হাত দিয়েছিলেন। বিজেপি যে দুই থেকে ৮৪-র উত্থানের কথা বলে তাও তো ছিল আদবানির রথযাত্রার রাস্তা জুড়ে দাঙ্গার প্রেক্ষিতেই, যে রথযাত্রার অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী। কে কবে এই বাংলায় তরোয়াল, ত্রিশূল নিয়ে রামনবমী দেখেছে? আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে ছিল নাকি এসব? হঠাৎ করে জয় শ্রীরাম হুঙ্কারে কানে তালা লাগিয়ে দিয়ে যে দাঙ্গাবাজেরা নামল তাদের সমর্থনেই তো ছিলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ ঘোষ, রাজ্য বিজেপির নেতারা। একই সঙ্গে বিহার মহারাষ্ট্র জুড়েও এরকমই দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা, আর সেই দাঙ্গা থেকেই অক্সিজেন পেয়ে আরও তাগড়া হওয়ার চেষ্টায় ছিল বিজেপি। হয়নি, হবে না সেটা অন্য কথা, কিন্তু তা তো বিজেপির সংস্কৃতি।
দেশের সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরুর মধ্যে এক তীব্র মেরুকরণ করিয়ে ৮০ শতাংশ হিন্দুদের অন্তত ৬০-৬৫ ভাগ সমর্থনের সোজা অঙ্কে নেমেছেন তাঁরা। কিন্তু ১৯২৫ থেকে এত চেষ্টা চালানোর পরেও এই ইস্যুতে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ হিন্দুদের ভোট তাঁরা জোটাতে পেরেছেন। বাকি যে ভোট তাঁরা পান তা বিকাশের, তা উন্নয়নের কথা বলেই পান, সেগুলো বানিয়াদের ভোট, উচ্চ-মধ্যবিত্তদের ভোট। তাই তাঁদের ক্ষমতায় আসার পরেও ওই দাঙ্গার আগুনকে জ্বেলে রাখতে হয়। আপনি ভাবছেন মণিপুরে এই জাতি দাঙ্গা যা এখন হিন্দু আর খ্রিস্টানদের দাঙ্গায় এসে দাঁড়িয়েছে এর ফলে তো বিজেপিরই ক্ষতি, তাদের মণিপুরের দুটো আসন, নাগাল্যান্ডের আসন হারাতে হতেই পারে। হ্যাঁ, ওই ক’টা আসন যেতেই পারে, কিন্তু বিজেপির নজর সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দিকে। তাদের ন্যারেটিভ হল, মণিপুরে হিন্দু মেইতিরা মরছে, বিরোধীরা সেদিকে কান না দিয়ে তারা কুকিদের সমর্থনে নেমেছে। তাদের ন্যারেটিভ হল, হিন্দু খতরে মে হ্যায়। কাজেই উত্তর পূর্বাঞ্চলে মণিপুর জ্বলছে কিন্তু তার আলো এসে পড়ছে সমতলে, বাংলায়, অসমে, বিহারে, মহারাষ্ট্রে, গোটা দেশে আর সেটাই বিজেপির চাহিদা, হিন্দু ভোটকে মেরুকরণ করা। তারজন্যই তারা এক সংগঠিত জাতিদাঙ্গা লাগিয়েছে, জাতিদাঙ্গা ক্রমশ হিন্দু-খ্রিস্টান দাঙ্গা হয়ে উঠছে, যতদিন চলবে তত বেশি লাভ বিজেপির, অন্তত ওঁরা সেটাই মনে করেন। কাজেই নরেন্দ্র মোদি এ নিয়ে কথা না বলে চুপ করে আছেন, অটল বিহারী বাজপেয়ী অন্তত গুজরাত গিয়েছিলেন, দাঙ্গায় বিধ্বস্তদের ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদি সেটাও করেননি। কারণ জানেন দাঙ্গার ডিভিডেন্ড ওঁর কাজে দেবে, ওঁর পক্ষে যাবে। জেএনইউ-র রঙ্গনাথন থেকে দীপক সাই, খুলে দেখুন ওঁদের ইউটিউব, প্রত্যেকে হিন্দু মেইতিদের জন্য চোখের জল ঝরাচ্ছেন। ঠিক যে সময় সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময়েই টিভি নাইন চ্যানেলে কী চলছে? তারা কি সংসদের আলোচনা দেখাচ্ছে? না, তাদের চ্যানেলে লাইভ চলছে জগৎগুরু রামভদ্রাচার্যের আলোচনা, বিষ ছড়াচ্ছেন এই সাধু নামে প্রচারক। প্রকাশ্যে বলছেন অযোধ্যা এসেছে, কাশী-মথুরা চাই, তারপরে আর ৩০ হাজার মন্দির নিয়েও কথা হবে, দেশজুড়ে আগুন লাগাতে চায় এরা।
অবশ্যই মণিপুরে জাতি দাঙ্গা এক হাতে হয়নি, দুই জাতির আর্মড ক্যাডারেরা আছে, দুই জাতিতেই দাঙ্গা লাগানোর মানুষ আছে, তাদের নিজেদের আলাদা আলাদা এজেন্ডা আছে তাই একজনের দায় তো নয়। হিন্দু মেইতি বা খ্রিস্টান কুকিরদের এক অংশ দাঙ্গায় নেমেছে। কিন্তু সেকথা এই প্রচারকরা বলছেন না, হিন্দুত্বের উগ্র ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, তাই দাঙ্গা আজও থামছে না। যদি বা এখানে থামে, নিশ্চিত আরও কোথাও এটা শুরু করতেই হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অবরে সবরে ৫৬ ইঞ্চি সিনার কথা বলে থাকেন, আসলে তিনি ভিতু, ভিতু না হলে এভাবে চুপ করে বসে থাকতেন না। দেশের মানুষ মরছে, সেখানে গিয়ে হাজির হতেন, কিন্তু সেখানেও সমস্যা, গিয়ে বলবেনটা কী? বীরেন সিং পদত্যাগ করো? তাহলে প্রশ্ন তো উঠবেই ১১০০ মানুষের হত্যার পরে আপনি গদি ছাড়েননি কেন? সেদিনের স্মৃতি ওঁকে তাড়া করে বেড়াবে আজন্ম, প্রশ্ন উঠবেই আজ দেশের মানুষ তো কাল বিদেশি সংবাদমাধ্যম কিন্তু গুজরাত দাঙ্গার কলঙ্ক তিনি মুছে ফেলতে পারবেন না। সংসদে এ নিয়ে আলোচনাতে সেটাই সবচেয়ে বড় বাধা। কিন্তু বলতে ওঁকে হবে। কিন্তু মণিপুর নিয়েই বলতে হবে? এমনকি কোনও আইন আছে? না, নেই। তাহলে? তাহলে তিনি আবার আগের বারের মতোই মণিপুরের নাম না করেই নানান ফালতু কথা বলে, ভাষণ শেষ করে সংসদ থেকে বাড়ি চলে যেতে পারেন। এর আগে সংসদে আদানি-হিন্ডেনবার্গ রিপোর্ট নিয়ে আলোচনার সময়ে তিনি একবারও আদানির নাম মুখেও আনেননি, ভাসুর যেমন ভাদ্র বৌ-এর নাম নেয় না, তিনিও আদানির নাম না নিয়েই বক্তৃতা না দিয়েই বাড়ি ফিরেছিলেন। এবারেও কি সেরকম হবে? সেটা জানতে হলে অবশ্য আরও ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতেই হবে।