বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলে দেব, এ এক অতি প্রচলিত বাক্য, যা বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সমস্ত সরকার আর রাজনৈতিক দলকে নিয়েই বলা হয়। গনি খান চৌধুরি বাম সরকার নিয়ে বলেছেন, তৃণমূল বলেছে, বামেরাও বলেছে, কংগ্রেস বিজেডি সরকারকে নিয়ে বলেছে, বিজেডি কংগ্রেস দলকে নিয়ে বলেছে। ক’দিন আগেই ভারত রাষ্ট্র সমিতির নেতা তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও এই কথাই বললেন। বললেন, মানুষ কংগ্রেসকে বঙ্গোপসাগরের জলে ফেলে দেবে। মজার কথা হল, কিছুদিন আগে হায়দরাবাদ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজেপি দারুণ ফল করে। তার আগেই ২০১৯-এ চারটে এমপি জিতেছে, কিছুদিন আগে জমি মামলায় ফেঁসে যাওয়া চন্দশেখর মন্ত্রিসভার মন্ত্রী এটালা রাজেন্দর দল ছেড়ে বিজেপিতে যায়, এবং বাই ইলেকশনে জিতেও আসে। তারপর থেকে অনেক রাজনৈতিক পণ্ডিত মনে করছিল তেলঙ্গানায় বিজেপিই উঠে আসছে দু’ নম্বরে, ওরাই চ্যালেঞ্জ জানাবে বিআরএস-কে। চন্দ্রশেখর রাও-ও তাই মনে করেছিলেন, উনি টিআরএস থেকে দলকে বিআরএস করলেন, মানে তেলঙ্গানা থেকে ভারত, তারপর বিরোধী ঐক্যের জন্য রাজ্যে রাজ্যে সফর, বাংলাতেও এসেছিলেন, মমতার সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। ইতিমধ্যে ওখানে চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। বিজেপির আদি নেতা বন্দি সঞ্জয় কুমার আর ইটেলা রাজেন্দ্রের লড়াই আমাদের দিলীপ ঘোষ আর শুভেন্দু অধিকারীর মতো বা তার চেয়েও তীব্র। ওদিকে জোটসঙ্গী হিসেবে টিডিপির চন্দ্রবাবু নাইডুর সঙ্গে কথা হয়েছে, কিন্তু তাঁকে নিয়ে মতভেদ আছে রাজ্যের মধ্যে, তেলঙ্গানা রাজ্যের বিরোধিতা করেছিলেন চন্দ্রবাবু নাইডু।
বিজেপি যখন ব্যাকফুটে তখন কংগ্রেস অনেকটা এগিয়ে গেছে, বিআরএস ছেড়ে দুজন উল্লেখযোগ্য নেতা, অনেকেই ভেবেছিল বিজেপিতে যাবেন, যোগ দিলেন কংগ্রেসে। ওদিকে কর্নাটকের ঢেউ লেগেছে তেলঙ্গানায়। ইউপিএ থাকাকালীনই তেলঙ্গানা রাজ্য তৈরি হয়, কংগ্রেস এখন সেই ক্রেডিট দাবি করছে, সব মিলিয়ে তেলঙ্গানায় লড়াই এখন বিআরএস আর কংগ্রেসে। এই মেরুকরণ যত বেশি হবে, বিআরএস-এর কপালে তত বেশি দুঃখ আর বিজেপি ততটাই পিছিয়ে যাবে। কাজেই কে চন্দ্রশেখর রাও আপাতত বিরোধী ঐক্য ইত্যাদি ভুলে মন দিয়ে রাজ্যের রাজনীতিটাই করছেন, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। অথচ বিজেপির কাছে এই রাজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, রাষ্ট্রীয় কার্যকারিণী সমিতির বৈঠক হায়দরাবাদে ডাকা হয়েছিল, কংগ্রেস এবং টিআরএস-কে ভাঙার চেষ্টাও চলছিল, এবং দক্ষিণে কর্নাটকের দরজা বন্ধ হওয়ার পরে বিজেপির কাছে তেলঙ্গানাই ছিল একমাত্র ভরসা, যা ক্রমশ হাতের বাইরেই চলে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তেলঙ্গানার ফলাফল এখনও কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের দিকেই ঝুঁকে রয়েছে। বিজেপি নিশ্চিতভাবে তিন নম্বরে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | বিজেপি বাড়ছে, না কমছে?
এবার চলুন মধ্যপ্রদেশে, সেখানে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী নর্মদা নদীতে পুজোপাঠ সেরে বিজয় শঙ্খনাদ করছেন, এবং এই অনুষ্ঠান দিয়েই মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের প্রচার অভিযানের সূচনা হল। এসব তো বিজেপিতে দেখা যেত, মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস হিন্দুত্বের প্রশ্নে বিজেপিকে পাল্লা দিচ্ছে। এক কথক, মানে মঞ্চ খাটিয়ে রামকথা, কৃষ্ণকথা শোনান যাঁরা, তেমন এক কথক রিচা গোস্বামী সারা রাজ্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কথাও চলছে, কংগ্রেস এর প্রচারও চলছে। এর আগেই কমল নাথ ২০০ ইউনিট বিজলি ফ্রি ইত্যাদি বলেই রেখেছেন, ক’দিন আগে বজরং সেনা নামের এক সংগঠন নাকি কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে গেল। মানে ওই যে, দে উইল বি পেইড বাই দেয়ার ওন কয়েন, অন্তত মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস তাই করছে, ওখানে হিন্দুত্বের প্রশ্নে বিজেপির সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দিচ্ছে। এবং কংগ্রেসের এবারে এক সুবিধে হল কোনও দলীয় কোন্দল নেই, ঘোষিত মুখ্যমন্ত্রী চেহারা কমল নাথ। দিগ্বিজয় সিং সরে গেছেন, জ্যোতিরাদিত্য দলেই নেই। কর্নাটকের মতোই এখানে কংগ্রেসের রিসোর্স আছে, মানে গ্যাঁটের জোরও আছে, কমল নাথ সেসব খেলা ভালোই জানেন। ওদিকে নিমরাজি হয়ে মামাজি মানে শিবরাজ সিং চৌহানকে মোদি–শাহ মেনে নিলেও, জ্যোতিরাদিত্য মানছেন কি? কংগ্রেস ভাঙিয়ে যাদের বিজেপিতে আনা হল, তাঁদের টিকিট তো দিতে হবে, ওদিকে সেসব আসনে তো আদি বিজেপিরা আছে, ধরুন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকেই হারিয়েছিলেন যিনি, গুনা কেন্দ্রের আপাতত বিজেপি সাংসদ কৃষ্ণপাল সিং যাদব, তিনি তো তাল ঠোকা শুরু করে দিয়েছেন। কাজেই তিনটে বিষয় বিজেপিকে ভাবাচ্ছে, এক, দলের মধ্যে কোন্দল। দুই, সরকারে থাকার ফলে অ্যান্টি ইনকমব্যান্সি, মানুষের সরকার বিরোধিতা। তিন, আগের বারে দল ভেঙে সরকার তৈরি করার ফলে দলের মধ্যের জটিলতা। এবং এইসবের কারণেই বিজেপি প্রথম ল্যাপেই অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। ছবিটা এক্কেবারে কর্নাটকের মতো, বিজেপির নেতারা নির্বাচনের আগে যোগ দিচ্ছেন কংগ্রেসে আর প্রিয়াঙ্কার মিছিলে উপচে পড়া ভিড়। কাজেই এই মুহূর্তে ভোট হলে কংগ্রেস ড্যাং ড্যাং করে জিতবে, এটা বিজেপিও জানে।
এবার চলুন ছত্তিশগড়, এই একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পাঁচ বছর সরকার চালানোর পরে অনায়াসে বলতে পারেন, সরকারের বিরুদ্ধে কোনওরকম অ্যান্টি ইনকমব্যান্সি নেই। একেবারে নেই? না তা বলব না, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবেই তা সারফেস লেভেলে দেখা যাচ্ছে না। ছোট্ট রাজ্য, সরকার তার কাজ ছড়িয়েছে প্রত্যেক প্রান্তে, প্রত্যেক গোষ্ঠীর মধ্যে, সবমিলিয়ে ভূপেশ বাঘেল একজন সফল প্রশাসক হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। পাঁচ বছরের সরকারের ওপর তেমন কোনও গুরুতর দুর্নীতির দায় নেই, রাজ্যে নকশালপন্থীদের কিছু ঘটনা বাদ দিলে শান্তি আছে, এমনকী মাওয়িস্ট অধ্যুষিত এলাকাতেও বাঘেল সরকার কাজ করেছে, গ্রামবাসীরাই বলছে। পর্যটন উন্নত হয়েছে। এবং এই রাজ্যতেও বিজেপি থেকে কংগ্রেসে নেতারা, কর্মীরা যোগ দিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ট্রাইবাল নেতা নন্দকুমার সাই কিছুদিন আগেই যোগ দিলেন কংগ্রেসে। এবং এই চার রাজ্যের ক্ষেত্রে ছত্তিশগড়ে খুব জোর দিয়েই বলা যায় যে বিজেপি হারবে, ভালোভাবেই হারবে।
এরপরে মরুরাজ্য রাজস্থান। ৪৮ বছর বয়সে অশোক গেহলত রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে, পাঁচ বছর পরে হারেন, বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া মুখ্যমন্ত্রী হন, আবার পাঁচ বছর বাদে অশোক গেহলত, কংগ্রেসি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী, আবার পাঁচ বছর পরে বসুন্ধরা রাজে, এবং শেষে ২০১৮তে বিজেপিকে হারিয়ে আবার মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত। মানে রাজস্থানে একবার বিজেপি, একবার কংগ্রেস এমনটা হয়েই থাকে। সেই হিসেবে তো এবারে বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার টার্ম, বিজেপিরই আসা উচিত। কিন্তু ওইখানেই সমস্যা। রাজ ঘরানার এই মহিলা দু’জন কমোনারকে তেমন পাত্তা দিতে রাজি নন। উনি আদবানি, অটলজির সময়ে রাজনীতি করেছেন কেবল তাই নয়, ওনার কাছে রাজনীতিটা পাওয়ার গেম, বেঁচে থাকার রসদ নয়। কাজেই গোয়ালিয়র রাজ ঘরানার এই মহিলাকে পছন্দ করেন না মোদি–শাহ, ওনাদের উসকানি আর সমর্থন আছে রাজ্য সভাপতি সতীশ পুনিয়ার দিকে। ওদিকে বসুন্ধরাও তাঁর সমান্তরাল কাজকর্ম চালিয়েই যাচ্ছেন, কোভিডের সময়েও নিজের মতো করে রিলিফের কাজ করেছেন, দলকে পাত্তাও দেননি। ক’দিন আগেই তৈরি হয়ে গেছে বসুন্ধরা রাজে সমর্থক মঞ্চ, সে মঞ্চ রাজস্থান জুড়ে পদযাত্রা করছে। কিছুদিন আগে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক বি এল সন্তোষ, যিনি সংগঠনের দায়িত্বে আছেন তিনি এক চিন্তন শিবির ডাকেন কুম্ভলগড়ে। দু’ দিন ধরে চলা চিন্তন শিবিরে এই দলীয় কোন্দল নিয়ে দুই পক্ষকেই সতর্কও করেন, কিন্তু শিবিরের পরেই বসুন্ধরা রাজে নিজেই রাজস্থান জুড়ে সংকল্প যাত্রা শুরু করেন। ওদিকে কংগ্রেসের মধ্যেও জব্বর লড়াই আছে, গেহলত এবং পাইলট। কিছুদিন আগেই দিল্লিতে হাত ধরাধরি করে মিটিং হল, কিন্তু মিটেছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু এই দু’ দলের কোন্দলের মধ্যে তফাত হল কংগ্রেসের বড় শক্তি কংগ্রেসে থেকেই লড়বে, পাইলট বেরিয়ে গেলেও যেতে পারেন, কিন্তু বিজেপির বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া সমান্তরাল মঞ্চ খুলে বসলে বিজেপিকে পথে বসতে হবে। অতএব আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে দু’ দলের ঝগড়ার পরিণতির দিকে। কথা ছিল বাবা রাজেশ পাইলটের মৃত্যুদিনে ১১ জুন শচীন পাইলট নিজের নতুন দলের নাম জানাবেন, কিন্তু সম্ভবত তিনি তাঁর সামর্থ্য আর ক্ষমতা বুঝতে পেরেছেন। নতুন দলের ঘোষণা হয়নি। আবার বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার সঙ্গে জে পি নাড্ডার বৈঠক হয়েছে, কোনও সমাধান সূত্রের কথা অবশ্য জানা যায়নি। এটা বলাই যায় যে, যে পক্ষ আগে দলের ভেতরের লড়াই সামলে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে পারবে তারাই এগিয়ে থাকবে। অতএব রাজস্থানের অবস্থা এখন ফিফটি ফিফটি বলাই ভালো, এই দলীয় কোন্দলের একটা পরিণতির পরেই রাজস্থানের ভবিষ্যৎ বুঝতে সুবিধে হবে। মানে চারটে রাজ্য, দুটোতে এগিয়ে কংগ্রেস, একটাতে ভারত রাষ্ট্র সমিতি, সেখানে দু’ নম্বরে কংগ্রেস, তিন নম্বরে বিজেপি। আর রাজস্থান এখনও ফিফটি ফিফটি।