কলকাতা: ভয়ঙ্কর তুষার, কনকনে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, পায়ের নীচে সাক্ষাৎ মৃত্যু জুতোর ফিতে ধরে টানছে। সারারাত তাঁবুতে ঠকঠক করে কাঁপছেন দুই ব্যক্তি। ফুরিয়ে আসছে অক্সিজেন, অথচ এখনও বাকি বহু পথ। তাহলে কি এবারেও আগের ছবারের মতো নাগালে এসেও হাত ফসকে যাবে এভারেস্টের চূড়া? না, তা হতে দেওয়া যায় না। দাঁতে দাঁত চেপে উত্তেজনায় কাটল রাত।
কিন্তু, সকাল হতেই বিধি বাম। ভাগ্যদেবীর একি বিধান! সঙ্গী সাহেবের জুতো যে জমে পাথর হয়ে গিয়েছে। তাহলে কী হবে! প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে চলল জুতোর বরফ ছাড়ানোর কাজ। তারপর ফের রওনা। আর কয়েক ঘণ্টার অক্সিজেন মজুত রয়েছে। পিঠে ৩০ পাউন্ড ওজনের লটবহর। আর মাত্র ৪০ ফুট। কিন্তু, সামনে সোজা খাড়া পাহাড়। অলঙ্ঘ্য। কিন্তু, এবার আর পিছন ফেরা নয়। যেভাবেই হোক বেলা সাড়ে ১১টার সময় সেই বরফের খাঁজে পা রেখে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে পা রাখলেন যিনি, তাঁর নাম তেনজিং নোরগে। আর বিশ্বের ইতিহাসে তাই এই দিনটিকেই আন্তর্জাতিক এভারেস্ট দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের ৭০ বছর পূর্তি হচ্ছে এ বছর।
আরও পড়ুন: Weather Update | সপ্তাহের শুরুতেই ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল বঙ্গবাসী, পারদ চড়বে ৪০-এ
তেনজিংয়ের সঙ্গী গোরা সাহেবের নামও সকলেরই জানা। এডমন্ড হিলারি, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। তেনজিংয়ের জন্মনাম নামগিয়াল ওয়াংদি। ওরফে শেরপা তেনজিং নোরগে। সেই সময়কার নেপালিদের মতো জন্মস্থান কিংবা জন্মতারিখ সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানতেন না নোরগে। তবে ১৯১৪ সালের মে মাসের শেষ নাগাদ তিনি জন্মগ্রহণ করেন বলে জানা যায়। আর তিনি নিজে পরে এভারেস্ট জয়ের দিনটিকেই অর্থাৎ ২৯ মে তাঁর জন্মদিন বলে ঘোষণা করেন। সেই হিসেবে আজ জন্মদিনও নোরগের।
১৯৩২ সালে ১৮ বছর বয়সে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে তেনজিং ১২ জন বন্ধুর সঙ্গে দার্জিলিং শহরের দিকে রওনা হন। কিন্তু ভারত-নেপাল সীমান্তে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তেনজিংকে এক স্থানীয় নেপালি আশ্রয় দেন। সেখান থেকে তেনজিং দার্জিলিংয়ের নিকটবর্তী আলুবাড়িতে যান ও দুধ বিক্রি শুরু করেন। পরের বছর একটি ব্রিটিশ এভারেস্ট পর্বত অভিযানে মালবাহকের কাজ চেয়েও তা পাননি। ব্যর্থ মনোরথে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। কিছুদিন পরে তেনজিং আবার দার্জিলিং পালিয়ে আসেন এবং টংসুং বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে দাওয়া ফুটি নামে এক শেরপা মেয়েকে বিয়ে করেন। সেই হিসেবে দার্জিলিংয়ের সঙ্গে নোরগের ওতপ্রোত সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে।
তাঁর সাফল্যে নেপাল সরকার ২০০৮ সালের ২৯ মে আন্তর্জাতিক এভারেস্ট দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। প্রাচীনকালে সংস্কৃত ও নেপালি ভাষায় এই শৃঙ্গের নাম ছিল ‘সাগরমাথা’। ইংরেজদের হাতে পড়ে তার নাম হয় এভারেস্ট। তিব্বতি ভাষায় সর্বোচ্চ এই শৃঙ্গের নাম ‘চোমোলাংমা’ অথবা ‘ধরিত্রীর মাতৃদেবী’। ১৮৬৫ সালে ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল জর্জ এভারেস্টের সম্মানার্থে ইংরেজ সরকার শৃঙ্গের নাম রাখে এভারেস্ট। শোনা যায়, এই নাম পরিবর্তনে নাকি স্বয়ং এভারেস্ট সাহেবের ঘোরতর আপত্তি ছিল।
তেনজিং নোরগের জন্ম নেপালে। তবে তাঁর কোথায় জন্ম, তা নিয়ে বহুমত রয়েছে। ‘ম্যান অফ এভারেস্ট: দ্য অটোবায়োগ্রাফি অফ তেনজিং’ গ্রন্থে লেখক বলেছেন, উত্তর-পূর্ব নেপালের সোলুখুম্বু জেলার তেনবোচে গ্রামে তাঁর জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা। তাঁর ছেলে জামলিং তেনজিং নোরগে যে বই লিখেছেন, সেই ‘টাচিং মাই ফাদার্স সোল: আ শেরপাজ স্যাক্রেড জার্নি টু দি টপ অফ এভারেস্টে’ উল্লেখ রয়েছে তিব্বতের ইউসাং-এ নোরগের জন্ম এবং নেপালে থামে গ্রামে বড় হয়েছেন।
৭০ বছর আগে ৮৮৪৯ মিটার (২৯,০৩২ ফুট) উচ্চতার এভারেস্ট জয়ের পূর্বে তেনজিং নোরগে মোট ৬টি অভিযানে শেরপা বা মোটবাহক হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু, প্রবল তুষারপাত, ঝোড়ো তুষারবায়ু ও অক্সিজেনের অভাবে কোনওবারই সফল হননি। জর্জ মেলরি এবং অ্যান্ড্রু আরভিনের মতো পর্বতারোহীসহ ৩০০ জনের বেশি শৃঙ্গজয়ের অভিলাষীর মৃত্যু হয়েছে এভারেস্টের টানে। সপ্তমবারে সফল হন নোরগে। এই কৃতিত্বের জন্য রানি এলিজাবেথ নোরগেকে সেই বছর জর্জ মেডাল দিয়ে সম্মানিত করেন। হিলারিকে দেওয়া হয় নাইট। ভারত সরকার দেয় পদ্মভূষণ।