২০১৪ থেকে নরেন্দ্র মোদির সরকার তিনটে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাম মন্দির তৈরি করেছে, আর একটা বিরাট দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এতদিন পর্যন্ত সরাসরি মোদিজির দিকে কেউ আঙুল তুলে দুর্নীতির প্রশ্ন তুলতে পারেনি, এখন কার্টেসি গৌতম আদানি, সে আঙুলও উঠেছে। তিনটে বড় সিদ্ধান্ত কী কী? প্রথমটা হল ডিমনিটাইজেশনের সিদ্ধান্ত, দ্বিতীয়টা হল মধ্যরাতে জিএসটি চালু করার সিদ্ধান্ত, তৃতীয়টা হল কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। রাম মন্দির আরএসএস–বিজেপির ঘোষিত অবস্থান, রাম মন্দির স্থাপনা হয়েছে। আর এই সময়ের মধ্যে মোদিজি দাঁড়িয়েছেন করোনাকালের মুখোমুখি। এই ১৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির চেহারা আমাদের সামনেই আছে। আর দেশের বাইরের পৃথিবী আমাদের দেশকে কীভাবে দেখছে, এটাও জরুরি বিষয়। মোটামুটি এগুলোর ভিত্তিতেই মোদি সরকারের পারফর্ম্যান্স কার্ড তৈরি করাই যায়। ডিমনিটাইজেশন কতটা বাজে ভাবনাচিন্তা ছিল তা আজকে মোদিজিকে দেখলেই বোঝা যায়, উনি এই শব্দটা মুখেও আনেন না আর। জিএসটি নিয়ে সংশোধনী এখনও চলছে, শুধু তাই নয়, এই জিএসটি-তে রাজ্যগুলো তাদের প্রাপ্য টাকা পাবে বলে যা বলা হয়েছিল তা ছিল এক নির্ভেজাল জুমলা। এই ২১-২২ আর্থিক বছরে রাজ্যের প্রাপ্য ৬০ হাজার কোটি টাকা এখনও বকেয়া পড়ে আছে।
পরের সিদ্ধান্ত হল কাশ্মীরকে ভাগ করা, পূর্ণ রাজ্যের তকমা কেড়ে নিয়ে জম্মু-কাশ্মীর আর লাদাখকে দুটো আলাদা ইউনিয়ন টেরিটরি ঘোষণা করা, ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়া। সবটাই আপাতত ঘেঁটে ঘ। ওধারে ৩৭০ ধারা, যার সত্যি করে আর কিছুই কার্যকারিতা ছিল না, যা ছিল কেবল এক নিয়মতান্ত্রিক অবস্থান, তা সরিয়ে দেশের ভেতরে আর বাইরে অনাবশ্যক জটিলতা তৈরি করা হল, ঘা ছিলই, তাকে খুঁচিয়ে বড় করা হল, কবে শুকোবে তা কেউ জানেন না। রাম মন্দির তৈরি আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতাকে যতই আঘাত করুক না কেন, দেশের এক বিশাল সংখ্যক মানুষজন এই কর্মকাণ্ডে বিজেপির সঙ্গেই আছে। এরপর বিপর্যয়ের কথায় আসি। মধ্যিখানে অবস্থা হাত থেকে বেরিয়ে যাবার দশা হলেও, শেষমেশ ভ্যাক্সিনেশন ইত্যাদি দিয়ে অবস্থা সামাল দিতে পেরেছেন মোদিজি। এবার আসি অর্থনৈতিক অবস্থার আলোচনায়, যত কম বলা যায় ততই ভালো, দেশের অর্থনীতির এরকম ধারাবাহিক অধঃপতন এর আগে দেখা যায়নি। আর ভারতবর্ষ নিয়ে বিশ্বের মানুষ, বিভিন্ন সংগঠনের ধারণা? আর্থিক বৈষম্যের পরিসংখ্যান সবার সামনে, শিশু জন্ম মৃত্যুর হার, পুষ্টি, হাঙ্গার ইন্ডেক্স ইত্যাদিও সবার সামনেই আছে, দেশে গণতন্ত্রের কী হাল? সরকারকে এক ডকুমেন্টারি ব্যান করতে হচ্ছে, এটাই আপাতত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে গণতন্ত্রের চেহারা। ঠিক এইখানটায় এসে আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, পারফর্ম্যান্স কার্ডে ডাহা ফেল, তাহলে বিজেপি সরকার, মোদি সরকার টিঁকে আছে কেমন করে? কেবল টিঁকে আছে, তাও তো নয়, বহাল তবিয়তে টিঁকে আছে। কীভাবে? কোন ম্যাজিকে? ম্যাজিকটা লুকিয়ে আছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতির মধ্যে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar: শান্তিনিকেতনের বিদ্যুৎ-বাংলা
কংগ্রেস দলের হাইকমান্ড রাজনীতি জন্ম দিয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক দলের, বিজেপি সময় বুঝে সেই সব আঞ্চলিক দলগুলোকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে, সব মিলিয়ে বিজেপি বিরোধী শক্তি ভাগ হয়েছে, আর এদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তো জীবনে কোনও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারেনি, তাদের কাজ হল ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া, কিছুদিন পরে ভুল স্বীকার করা, আবার কিছুদিন পরে নতুন ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া। সংসদীয় রাজনীতিই করেন, কিন্তু ভাবখানা আগুনখেকো বিপ্লবীদের মতন। জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে এই দক্ষিণপন্থী উথ্বানকে রোখা যেত, ওনাদের হিমালয়ান ব্লান্ডার বিজেপির কাছে সে সুযোগ এনে দিল। এখনও তাই চলছে। আঞ্চলিক দলের সমস্যা হল সেখানে এক নেতা, একটাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্র, ফলে ভুল হলে ভুল, ঠিক হলে ঠিক। এবং আঞ্চলিক দলের কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে, যার ফলে তাদের রাজনীতিতে আঞ্চলিকতাবাদের ঝোঁক থাকতে বাধ্য। তারা টিঁকে থাকার রাজনীতি করে বলেই তারা প্রাগম্যাটিক, কোনও শক্তপোক্ত নীতি, দর্শন ইত্যাদির দায় তাদের থাকে না। কিন্তু ঠিক এই সময়েই বিরাট সুযোগ এসেছে বিরোধীদের কাছে, আঞ্চলিক দলগুলো বিজেপির বিরোধিতায় নেমেছে। তার মূল কারণ তাদের আঞ্চলিক ইস্যু, বিজেপি যখন এক শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার চায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক দলগুলো তা মেনে নিতে পারে না, তারা ফেডারেলিজমের কথা বলে, মমতা বলছেন, স্তালিন বলছেন, আকালিরা বলছে, টিআরএস বলছে, জগন রেড্ডি বলছেন, নবীন পট্টনায়ক বলছেন, হেমন্ত সোরেন বলছেন।
এই বিরোধিতার স্বরকে এক জায়গায় আনার দায়িত্ব কার? কংগ্রেসের, সংসদীয় অঙ্কে আপাতত ছোট হলেও এ দায়িত্ব কমিউনিস্টদেরও। কিন্তু মাঠে কী দেখছি? অধীর চৌধুরির কাজ হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করা, তিনি প্রতিদিন দায়িত্ব নিয়ে সেই কাজ করে চলেছেন। তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা সেই আক্রমণের জবাবও দিচ্ছেন, তিক্ততা বেড়েই চলেছে, মুখোমুখি আলোচনার পরিসরও নেই, ঐক্য কীভাবে হবে? মহম্মদ সেলিমের বক্তৃতার দিকে নজর রাখুন, দিদি মোদি এক হ্যায়, এটা হল বটম লাইন। তারপর বক্তৃতা শুরু, কংগ্রেসি সরকারের পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ বেদির পাশে দাঁড়িয়ে আধঘণ্টার ভাষণে ১০ মিনিট বিজেপি, ২০ মিনিট মমতার বাপবাপান্ত। কীসের ঐক্য হবে? এই সিপিএম বিহারে ক’দিন আগে বিজেপির সঙ্গে ঘর করা নীতীশ কুমারের সঙ্গে মহাগঠবন্ধন করতে পারে, বিজেপি মন্ত্রিসভায় থাকা, এনডিএ-র প্রাক্তন পার্টনার ডিএমকে-র সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়া করতে পারে, চরম দক্ষিণপন্থী শিবসেনার সঙ্গে মহা আঘাড়ি জোট সরকারকে সমর্থন করতে পারে, কিন্তু এ রাজ্যে দিদি মোদি এক হ্যায়। আম জনতা, বাংলার মানুষের কপালে খোদাই করা অদৃশ্য বোকা শব্দটি কেবল সিপিএমই কি দেখতে পায়? কংগ্রেসের অবস্থাও খানিক বিশ্বম্ভর রায়, জলসাঘরের জমিদারের মতো। ভারত জোড়ো যাত্রা করছেন, বেশ করছেন, দীর্ঘ সময় পরে নড়ে চড়ে বসেছেন, এত বড় এক রাজনৈতিক পদক্ষেপ, মানুষের সমর্থন পাচ্ছে, দারুণ ব্যাপার। কিন্তু অমুকদিন আমরা ভারত জোড়ো যাত্রা শেষ করছি শ্রীনগরে, আপনারা আসুন, আসুন টিএমসি, আসুন এসপি, আসুন আসুন আসুন। কেন আসবেন তাঁরা? এর আগে তাঁদের কোন রাজনৈতিক মঞ্চে আপনারা হাজির ছিলেন? দুর্নীতির দায়ে মমতাকে জেলে যেতে হবে, অধীর চৌধুরি বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়ে হাজির হবেন ভারত জোড়ো যাত্রায়, কেন? এবং ছোট হলেও বিরোধী প্রত্যেক দলের কার্যকারিতা একেক রাজ্যে একেক রকম, তাই প্রত্যেক বিরোধী দলকে গুরুত্ব দেওয়াটা শিখতে হবে কংগ্রেসকে, শিখতে হবে কমিউনিস্টদের, শিখতে হবে আঞ্চলিক দলগুলোকেও। আমরাই সঠিক এমন মনোভাব ছাড়তে হবে সবাইকে, বিরোধী ঐক্য তার ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar: আরএসএস এবার মুখোশ খুলেই মাঠে নামছে
একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। দিল্লিতে বিরোধী দলের বৈঠক, আদানি ইতাদি নিয়ে সরকারকে কীভাবে আক্রমণ করা যায় তাই নিয়ে আলোচনা, অংশ নিলেন সব্বাই, এমনকী তৃণমূল, আপ, প্রত্যেকেই। তারপরের দিন সংসদ অচল হল। সেদিনই কংগ্রেস সাগরদিঘিতে লড়ার সিদ্ধান্ত জানাল, সিপিএম কংগ্রেসকে সমর্থন জানাল। এদিন বিজেপি প্রচার শুরু করল, দেশের প্রথম আদিবাসী মহিলা রাষ্ট্রপতির ধন্যবাদ জ্ঞাপনে হাজির না থাকা বিরোধীরা আসলে আদিবাসী বিরোধী। তারপরের দিন আবার বৈঠক, মল্লিকার্জুন খাড়গের ঘরে, এদিন তৃণমূল হাজির থাকল না। তাদের বক্তব্য তারা জানাল, তৃণমূল দল সংসদ অচল না করেই আলোচনা চায়, গণশক্তিতে লেখা হল, দিদি মোদি এক হ্যায়, বিরোধী ঐক্য ভেঙে আসলে বিজেপির সুবিধে করে দিতে চায় তৃণমূল। পরেরদিন মানে গতকাল সাতসকালে তৃণমূল সাংসদরা এলআইসি দফতরের সামনে বিক্ষোভে, গতকাল কংগ্রেস সমেত বিরোধী দল সিদ্ধান্ত নেয়, তাঁরা সংসদে আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন। দেশসুদ্ধু মানুষ সংসদে রাহুল গান্ধীর বক্তৃতা শুনলেন, ফালা ফালা করে চিরলেন তিনি বিজেপিকে, প্রধানমন্ত্রীকে দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ করলেন, সে সব যুক্তির সামনে বিজেপি সাংসদদের অসহায় দেখাল। তারপর তৃণমূলের সাংসদরা, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও ব্রায়েন। তাহলে? অন্তত এই সময়ে সংসদের বৈঠকে উপস্থিত থাকাটা জরুরি ছিল, সেটা প্রমাণিত। হ্যাঁ, এদিন তৃণমূলই পথ দেখিয়েছে, অন্য আরেকদিন হয়তো সমাজবাদী দল সেই পথ দেখাবে, কোনওদিন হয়তো ঝাড়খণ্ড পার্টি সেই দায়িত্ব নেবে। নেতৃত্ব দেবার একচ্ছত্র অধিকার তো কারওর নেই, মঙ্গলবারের সংসদের আলোচনা সেটাই প্রমাণ করল। আজকের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর গড়ে উঠুক বিরোধী ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান আস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠুক বিরোধী ঐক্য, যে ঐক্য না গড়ে ওঠা পর্যন্ত মোদি সরকারের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।