আগে হলে ওহ তো পাপ্পু হ্যায় বলে উপেক্ষা করতেন মোদি, যা তিনি সংসদের ভেতরে বা বাইরে এতদিন ধরেই করে এসেছেন। এবার পারলেন না। আদরণীয় অধ্যক্ষজি থেকে শেষের ধন্যবাদ, এক ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের ভাষণের পুরোটাই ছিল রাহুল গান্ধীর প্রতি নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ। মধ্যে কয়েক মিনিটের জন্য নাম না করেই রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে তৃণমূল নেতা অখিল গিরির কটু মন্তব্য প্রসঙ্গে দু’ একটা কথা বলেন, ব্যস, এরপর গোটা ভাষণ জুড়েই ছিল রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস, ইউপিএ। গোটা ভাষণের সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছিলেন রাহুল গান্ধী, একবারও নাম না করলেও তিনি যে সংসদে রাহুল গান্ধীকেই পাখির চোখের মতো নিশানায় রেখেছেন, তা পরিষ্কার এবং এটা এই প্রথম। এর আগে পর্যন্ত রাহুল গান্ধীকে মোকাবিলা করার জন্য মোদিজির অস্ত্র ছিল উপেক্ষা আর পাপ্পুর মতো কয়েকটা শব্দ। এইখানেই পয়লা রাউন্ডে রাহুল এগিয়ে গেলেন। না হলে এতদিনের পোড় খাওয়া নরেন্দ্র মোদি হঠাৎ করে তিনিও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন, দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তা মনে করাতে গেলেন কেন? এই উল্লেখ আসলে রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রার স্বীকৃতি।
সংসদ ভন্ডুল না করে, বয়কটের পথে না হেঁটে শেষমেষ বিরোধীরা যে সংসদে আলোচনায় অংশ নেবার সিদ্ধান্ত নিলেন, তারই ফলে আমরা সাংবাদিকরা খুশি। দেশের মানুষ, রাজনৈতিক আলোচক, বিশেষজ্ঞরা অনেকদিন পরে সংসদে ঝাঁঝালো বিতর্ক, আলোচনা শুনতে পেলেন, দেখতে পেলেন। দেখতে পেলেন যেমনটা মনে করা হয়েছিল রাহুল গান্ধী ভারত জোড়ো যাত্রার পরে দাড়ি কেটে ফেলবেন, তিনি কাটেননি। দেখতে পেলেন, ক’দিন আগে পর্যন্ত প্লাস্টিক বোতল রিসাইকেল করে জুতো তৈরি হচ্ছিল, এখন জ্যাকেটও তৈরি হচ্ছে, ফ্যাশন দুরস্ত ওই প্লাস্টিক বোতল রিসাইকেল করা উজ্জ্বল নীল রংয়ের জ্যাকেট পরে হাজির হলেন ফকির মোদিজি। স্পষ্টতই দেখা গেল বিরোধীরা মোদি মোদি কলরবের জবাব পেয়ে গেছেন, বিরোধীদের তরফে আদানি আদানি কলরব সত্যিই মোকাবিলা করল মোদি-মন্ত্রকে। এ যুদ্ধ তো মাঠে দেখা গেল মঙ্গল আর বুধবার, কিন্তু প্রস্তুতি তো ছিলই দু’ পক্ষেই। রাহুল গান্ধী বা তাঁর অ্যাডভাইজাররা ভালো করেই জানেন মোদিজির নাটক, বলা ভাল নৌটঙ্কির সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে রাহুল গান্ধীকে দশ গোল আগেই খেতে হবে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar: বিরোধী ঐক্য, রত্ন মণি মাণিক্য
ঠিক সেই কারণেই মঙ্গলবার সংসদে রাহুল গান্ধী হাজির ছিলেন নির্দিষ্ট প্রশ্ন নিয়ে, ৫১ মিনিটের ভাষণে রাহুল গান্ধী যে প্রশ্নগুলো করলেন, তা ছিল সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকেই। তিনি প্রশ্ন করলেন, বলুন আপনার সঙ্গে আদানির সম্পর্ক কী? যে ব্যবসায়ী ২০১৪তে বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় ৬০৯ নম্বরে ছিল, সেই আদানি ২০২৩-এর জানুয়ারিতে ২ নম্বরে চলে এলেন, কোন ম্যাজিকে? কার দৌলতে? রাহুল গান্ধীর সোজা প্রশ্ন, ২০১৪তে বিজেপি জেতার পরে নরেন্দ্র মোদি দিল্লিতে এলেন আদানির প্লেনে চেপে, সে ছবিও তিনি দেখালেন। এরপর আদানি মোদিজির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া গেলেন, সেখানে কয়লা চুক্তি করলেন, শ্রীলঙ্কা গেলেন সেখানে বন্দর চুক্তি করলেন। আদানি মোদিজির সঙ্গে বাংলাদেশ গেলেন সেখানে গ্যাস উত্তোলন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেন। তিনি ওনার সঙ্গে ইজরায়েল গেলেন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বরাত পেলেন, এসবের মানে কী? এমনকী যে রাফায়েল নিয়ে এত বিতর্ক, সেই রাফায়েলের বরাত অনিল আম্বানির কাছ থেকে নিয়ে আদানিদের দেওয়া হয়েছে, অভিযোগ রাহুল গান্ধীর। তিনি সংসদে ছবি দেখালেন মোদি আদানির। জানালেন, কিছু ভুয়ো কোম্পানিকে দিয়ে আদানি গ্রুপ প্রথমে নিজেদের শেয়ারের দাম বাড়িয়েছেন, তারপর সেই বেড়ে ওঠা শেয়ারের বিনিময়ে এলআইসি, এসবিআই থেকে ঋণ নিয়েছেন, এগুলো সম্ভব কী করে হয় যদি না মোদিজি আদানিদের সাহায্য না করেন, এবং এইখানেই রাহুল গান্ধীর প্রশ্ন, তাহলে মোদিজির সঙ্গে আদানিদের সম্পর্কটা ঠিক কী? দেশের প্রধানমন্ত্রী কি ওনার ব্যবসা বাড়ানোর কাজ করছেন?
রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, দেশের এয়ারপোর্ট, জাহাজ বন্দর তুলে দেওয়া হচ্ছে আদানির হাতে। ৫১ মিনিটের বক্তৃতায় রাহুল গান্ধী খুব স্পেসিফিক প্রশ্ন করেছেন, জবাব চেয়েছেন। এবার চলুন দেশের প্রধানমন্ত্রীর ১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের বক্তৃতায়। তিনি যা বলার সবই রাহুল গান্ধীকেই বলেছেন, কিন্তু নাম নেননি, ভাসুর ভাদ্র বউয়ের কথোপকথনের মতোই আড়েঠড়েই জবাব দিয়ে গেলেন, একটাও প্রশ্নের জবাব দিলেন না, কিন্তু প্রত্যারোপে ভরিয়ে দিলেন তাঁর ভাষণ। এমনিতেই মোদিজি প্রশ্নের মুখোমুখি ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েন, তা আমরা দেখেছি, করণ থাপারের প্রশ্নের সামনে নার্ভাস মোদিজিকে ইন্টারভিউ ছেড়ে চলে যেতেও দেখেছি, সে পলায়ন দৃশ্য আজও নেট দুনিয়ায় পাওয়া যায়। (ভিডিও) বিবিসি সাক্ষাৎকারেও একই অবস্থা, দৃশ্যতই নার্ভাস আমাদের নরেন্দ্র ভাই দামোদরদাস মোদি। এবারেও প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, বদলে বিস্তর পুরনো কাসুন্দি তুলে আনলেন। কংগ্রেসের দুর্নীতি, কংগ্রেসের সময়ে বেকারত্ব, কংগ্রেস আমলে মূল্যবৃদ্ধি, কংগ্রেসের আমলে উগ্রপন্থার উথ্বান ইত্যাদি ইত্যাদি। জবাবটা আমাদের কাছে শোনালো খানিকটা এই রকম, ওরাও চুরি করেছিল, ওদের আমলেও দাম বেড়েছিল, ওদের আমলেও বেকারত্ব বেড়েছিল। মোদিজি ভুলেই গেছেন এইসব কারণেই মানুষ কংগ্রেসকে সরিয়ে বিজেপিকে, ওনাকে ক্ষমতায় এনেছে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar: আরএসএস এবার মুখোশ খুলেই মাঠে নামছে
আরেকটা বিষয় মোদিজি গতকাল সংসদে তুললেন, এটা তাঁর ফেভারিট বিষয়, তিনি এক কল্পনার ঘোরে এই কথাগুলো বহুবার বলেন, এবারেও বললেন। বিশ্বের দরবারে নাকি ভারতবর্ষকে কেউ চিনত না, কেউ পাত্তা দিত না। ভারতবর্ষ মানেই ছিল দারিদ্র, ক্ষুধা, অনাহার, বেকারত্ব, ২০১৪-র পর সে ছবি পালটে গেছে, বিশ্ব এখন নাকি ভারতবর্ষকে এক শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই দেখে, এ ধারণা কোনও তথ্য প্রমাণ দিয়ে তিনি বলেন না, কেবল বলেই যান, বহুবার বলেছেন, এবারেও বললেন। তাঁর বলায় নাটকীয়তা ছিল, গলা তুলে নামিয়ে হাত নাড়িয়ে তিনি অনেক কথাই বললেন, কিন্তু রাহুল গান্ধীর একটা কথাও জোর দিয়ে অস্বীকার করলেন না, এবং এই প্রথম বহু সময় ধরে বক্তৃতার বিভিন্ন অংশে আসলে রাহুল গান্ধীকেই নিশানায় রাখলেন। তার মানে পাপ্পু পলিটিশিয়ান বন গয়া, পাপ্পুকে আর ইগনোর করা যাচ্ছে না। এবং কবিতা, তিনজন কবির কবিতা তিনি আওড়ালেন, প্রথমজন হলেন কাকা হাথরসি, উত্তরপ্রদেশের হাথরসের বাসিন্দা হাস্যকবি প্রভুলাল গর্গ কাকা হাথরসি নামেই পরিচিত। তাঁর দু’ লাইনের কবিতা পড়লেন, আগা-পিছা দেখকর কিঁউ হোতে গমগীন? জ্যায়সি জিসকি ভাবনা, ওয়সা দেখে সিন। আগে পিছে দেখে দুঃখ পাচ্ছ কেন? যে যেরকম ভাবে, সে সেরকমই দেখতে থাকে, মানে রাহুল গান্ধী যেরকম ভাবেন, সেরকমই দেখছেন। এরপরের কবিতা জিগর মুরাদাবাদীর, উনিও উত্তরপ্রদেশের কবি, ওনারও একটা দু’ লাইনের শায়রি পাঠ করলেন মোদিজি, ইহ কহ কহ কে হম দিল কো বহলা রহে হ্যাঁয়, ওহ অব চল চুকে হ্যাঁয়, ওহ অব অ্যা রহেঁ হ্যাঁয়। নিজেকে নিজেই বোঝাচ্ছি, যে এই তো উনি রওনা দিয়েছেন, এই তো উনি এলেন বলে। আবার উদ্দেশ্য রাহুল গান্ধী, যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হল, রাহুল অ্যান্ড কোম্পানি নিজেদেরকেই বুঝিয়ে চলেছেন যে এইবার সেই সুদিন আসছে, যা কোনওদিনও আসবে না। এরপরের কবি বামপন্থী লিবারেল ইন্টেলেকচুয়াল বলেই পরিচিত, দুষ্মন্ত কুমার, মোদিজি আওড়ালেন, তুমহারে পাঁও কে নিচে কোই জমিন নঁহি, কমাল ইয়হ হ্যায় কি ফির ভি তুমহে য়ঁকিন নঁহি। তোমার পায়ের তলায় জমি নেই, কিন্তু মজার কথা হল সেটাও তুমি জানো না। আবার রাহুলকে উদ্দেশ্য করেই এই কবিতা।
মোদিজি দুষ্মন্ত কুমারের এই লাইন দুটো আওড়ালেন বটে কিন্তু সম্ভবত জানেনই না এরপরের চারটে লাইন। ম্যাঁয় বেপনাহ আন্ধেরো কো সুবহ ক্যায়সে কহুঁ? ম্যাঁয় ইন নজারোঁকা অন্ধা তমাশবিন নঁহি। তেরি জুবান হ্যায় ঝুটি জমহুরিয়ত কি তরহ, তু এক জলিল সি গালি সে বেহতরিন নহিঁ। আমি এই ঘোর অন্ধকার কে সকাল কী করে বলব? আমি তো এই নির্লজ্জ তামাশার দর্শক নই। তোমার যত কথা সবই এক মিথ্যে গণতন্ত্রের মতো, তুমি এক নোংরা শব্দের চেয়ে ভালো তো কিছু নও। হ্যাঁ এটাও ওই দুষ্মন্ত কুমারেরই লেখা। যাই হোক অন্তত মুখে মারিতং জগৎ নরেন্দ্র মোদিজি এই প্রথম জবাবি ভাষণে নিজের ধার হারালেন, বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীকে ইগনোর করতে পারলেন না, আরও বড় কথা হল আদানিকে নিয়ে একটা শব্দ না বলার ফলে দেশবাসীর মনে এক সন্দেহ তো তৈরি হলই, দেশের মানুষ বেশ বুঝতে পারল, ডাল মে কুছ তো কালা হ্যায়। কাকা হাথরসি তো কেবল মোদিজি পড়েননি, আমরাও পড়েছি, তাই আজ কাকা হাথরসির চারটে লাইন দিয়েই শেষ করব।
মন ময়লা তন উজরা ভাষণ লচ্ছেদার
উপর সত্যাচার হ্যায়, ভিতর ভ্রষ্ঠাচার
ঝুটোঁ কে ঘর পণ্ডিত বাঁটে কথা সত্য ভগবান কি
জয় বোলো বেইমান কি
লোকতন্ত্র কে পেড় পর কৌয়া করে কিলোল
টেপ রেকর্ডার মে ভরে চমগাদড়, (চমগাদড় মানে চামচিকে,
টেপ রেকর্ডার মে ভরে চমগাদড় কে বোল
নিত্য নয়ি যোজনা বনতি জন-জন কে কল্যাণ কী
জয় বোলো বেইমান কি।