১৯ জুন ছিল রাহুল গান্ধীর জন্মদিন, ১৯৭০ সালে ১৯ জুন। এখন জন্মদিনে এইচবিডি, মানে হ্যাপি বার্থডে আর মারা গেলে আরআইপি, মানে রেস্ট ইন পিস। এ হল আপাতত টুইটার, ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষা। সময় কোথায় পুরোটা লেখার, তাই সংক্ষেপে এইচবিডি, অনেক পেয়েছেন রাহুল গান্ধী, চেক করে দেখলাম মল্লিকার্জুন খাড়্গে থেকে শচীন পাইলট, ডি কে শিবকুমার থেকে সিদ্দারামাইয়া, কংগ্রেসের ছোট বড় নেতারা ওই এইচবিডি জানিয়েছেন। চোখে পড়ার মতো অনুপস্থিত শশী থারুর আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। তো বোন ভাইকে টুইট করে হ্যাপি বার্থডে তো বলবে না, কিন্তু শশী থারুর? এবং এই শুভেচ্ছা জানানোর তালিকায় নীতীশ কুমারও আছেন। না, গত কয়েক বছরে উনি রাহুল গান্ধীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, এমনটা জানা নেই। এবং এই তালিকায় আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হ্যাঁ, উনি টুইট করে ২০২৩ সালের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তো ২০২২-এর ১৯ জুন ওঁর টুইটার অ্যাকাউন্ট খুলে দেখলাম উনি ১২ জুন সোনিয়া গান্ধী, যিনি তখন কোভিডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছিলেন, তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন। রাজীব-সোনিয়ার সঙ্গে মমতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক যদি জানা থাকে তাহলে এটা খুব স্বাভাবিক। এরপরের টুইট ২১ জুনে, তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বিরোধীদের প্রার্থী যশবন্ত সিনহাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মধ্যিখানে চুপ করে চলে গেছে ১৯ জুন, উনি টুইট করেননি। চলে গেলাম ২০২১-এ, জুন ১৯-এ তিনি দুটো টুইট করেছেন, প্রথমটা গোসাবার বিধায়ক জয়ন্ত নস্করের মৃত্যু, পরেরটা মিলখা সিংয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে। মানে ২০২১-এ রাহুল গান্ধীকে এইচবিডি জানানো? না ছিল না। কাজেই সোশ্যাল মিডিয়াতে এই সামান্য শুভেচ্ছার পিছনে যে রাজনীতি আছে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবেগী মানুষ, কিন্তু এখন তাঁর রাজনীতি জুড়ে আবেগের থেকে অনেক অনেক বেশি যুক্তি, প্রয়োজন, হিসেব নিকেশ থাকে, আছে। কাজেই এই টুইটও এমনি এমনি নয়, যেমন নয় নীতীশ কুমারের শুভেচ্ছা বার্তা। এই শুভেচ্ছা বার্তার সঙ্গে ২০২৪-এর নির্বাচন, বিরোধী জোটের যে গাঢ় সম্পর্ক আছে তা বলা বাহুল্য। সেই সম্পর্কটা একটু খতিয়ে দেখা যাক।
উত্তরপ্রদেশ আর গুজরাত মিলিয়ে ১০৬টা সাংসদ আসন। বিজেপি নিশ্চিন্তে ৯০-৯৪ রান নিয়েই ব্যাটিংয়ে নামবে। ঠিক যেরকম বিরোধীরা কেরলের ২০ আর তামিলনাড়ুর ৩৯, মোট ৫৯টা আসন নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামবে। বাকি সমস্ত রাজ্যে অঙ্ক এক থাকবে না, কিন্তু সেটা বলাই তো যথেষ্ট নয়, বিজেপির কাছে সমস্যা হল যা তাদের ছিল সেখানে তাদের ক্ষয় নিশ্চিত। তারাও জানে, তাই তাদের আপাতত চোখ কোন কোন হারা আসন তারা জিততে পারে, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া। মুশকিল হল তেমন রাজ্য কোথায়? তেমন আসন কোথায়? কিন্তু অন্তত পাঁচটা রাজ্য আছে যেখানে তাদের ডাবল ডিজিট লস, মানে ১০ বা তারও বেশি আসন হাতছাড়া হতেই পারে। এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যে এ খবর কোনও এক্সক্লুসিভ নিউজ, এটা আমরা সাংবাদিকরা জানি, বিরোধীরা জানেন, বিজেপি আরএসএস বেশি করেই জানে। সেই রাজ্যগুলো কী কী? মহারাষ্ট্র, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটক, আর বাংলা, হ্যাঁ পশ্চিমবঙ্গ। না, রাস্তার ধারে টিয়া পাখি নিয়ে যে জ্যোতিষী বসে থাকে, এখবর তিনি দেননি। আসুন এ খবরের পেছনের অঙ্কটা বুঝে নেওয়া যাক।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মেরুকরণের রাজনীতি, ড্রাগস মাফিয়া এবং মোদিজি
মহারাষ্ট্র, আসন মোট ৪৮, মানে উত্তরপ্রদেশের পরে সবথেকে বড় রাজ্য। খিলাড়িয়ো কা খিলাড়ি শরদ পাওয়ার বিরোধীদের জানিয়েছেন, এ রাজ্য আমার হাতে ছেড়ে দিন, আমি বুঝে নেব। কী ভাবে? ২০১৯-এ বিজেপি পেয়েছিল ২৭.৮৪ শতাংশ ভোট আর ২৩টা আসন। শিবসেনা পেয়েছিল ২৩.৫ শতাংশ ভোট আর ১৮টা আসন। এনসিপি ১৫.৬৬ শতাংশ ভোট আর ৪টে আসন, কংগ্রেস ১৬.৪১ শতাংশ ভোট এবং ১টা আসন। বঞ্চিত বহুজন আগাড়ি, ডঃ ভীমরাও আম্বেদকরের নাতি প্রকাশ আম্বেদকরের নেতৃত্বে এই দল পেয়েছিল ৬.৯২ শতাংশ ভোট, কোনও আসন পায়নি। এরমধ্যে শিবসেনা ভেঙেছে, বড় অংশটাই একনাথ শিন্ডের সঙ্গে থাকলেও এখনও পর্যন্ত বাই-ইলেকশনের ভোট বলছে উদ্ধবের পক্ষেই আছে শিবসেনার বড় অংশের ভোট। শরদ পাওয়ার এবার মহারাষ্ট্র বিকাশ আগাড়ি, মানে ওই উদ্ধবের নেতৃত্বে শিবসেনা, কংগ্রেস, এনসিপি ইত্যাদির জোটের মধ্যে বঞ্চিত বহুজন আগাড়িকেও নিয়ে আসার চেষ্টায় আছেন। তা যদি হয় তাহলে ওই বর্ধিত মহারাষ্ট্র বিকাশ আগাড়ির মোট ভোট শতাংশ দাঁড়াবে ৪৩-৪৪ শতাংশ। এবং সে ক্ষেত্রে বিজেপি একনাথ শিন্ডের আসন ১৫-১৮ পার করাও অসম্ভব। মানে গতবারের বিজেপি-শিবসেনা জোট পেতেছিল ৪১টা আসন, এবারে ২০-২৩টা আসন কমার সম্ভাবনা আছে। এবার বিহারে চলুন। ২০১৯-এ প্রবল মোদি ঝড়ের পরেও বিহারে বিজেপির ভোট কমেছিল ৫.৮২ শতাংশ, তারা পেয়েছিল ২৩.৫৮ শতাংশ ভোট, ১৭টা আসন পেয়েছিল। জেডিইউ, নীতীশ কুমারের দল তখন বিজেপির সঙ্গে, ভোট পেয়েছিল ২১.৮১ শতাংশ, আর আসন ১৬টা। মানে দু’ দলে মিলে ৪০-এর মধ্যে ৩৯টা আসন পেয়েছিল, লালু তেজস্বীর আরজেডি ১৫.৩৬ শতাংশ ভোট পেলেও একটা আসনও পায়নি। কংগ্রেস ৭.৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, একটা আসন জুটেছিল। এরপর সে রাজ্যে মহাজোট হয়েছে। কংগ্রেস, আরজেডি, সিপিএম, সিপিআই, সিপিআইএমএল লিবারেশন ইত্যাদি মিলে, সেই জোট গত বিধানসভার নির্বাচনে নীতীশ বিজেপি জোটের আসন ছিল ১১৯ আর মহাগঠবন্ধনের আসন ছিল ১১০, মানে প্রায় ঘাড়ে ঘাড়ে। ওয়েইসির মিম পেয়েছিল ৫টা আসন আর বিএসপি ১টা আসন, ম্যাজিক ফিগার ১২২ কোনও রকমে জোগাড় করেছিল এনডিএ সরকার।
কিন্তু এরপর নীতীশ বেরিয়ে এসেছেন। তিনি যে কেবল ভোট নিয়ে এসেছেন তাই নয়, কুড়মি সমাজ, ওবিসি সমাজের এক বড় অংশকেও সঙ্গে এনেছেন। কাজেই এবারের মহামহাগঠবন্ধনের ভোট শতাংশ অনায়াসে ৫৩-৫৫ শতাংশও হয়ে যেতে পারে, সেক্ষেত্রে বিজেপির এবারে ৫-৬টা আসনের বেশি পাওয়ার আশা নেই বললেই চলে। মানে আবার ১০টার বেশি আসন কমবে কেবল বিজেপির, শরিক দল তো নেইই। মধ্যপ্রদেশে বিজেপি যদি কমলনাথ সরকারকে না ভেঙে চলতে দিত, তাহলে নিশ্চিত বলা যেত ২০২৪-এ ২৯টায় ২৮ নয়, ২৯টায় ২৯টা আসন পেত বিজেপি। কিন্তু প্রথম ভুল, সরকার ভাঙা, রিসর্ট পলিটিক্স। তারপর দু’ নম্বর সমস্যা কংগ্রেস থেকে যাঁদের বিজেপিতে আনা হল, আজ তারাই বিজেপির সবচেয়ে বড় বোঝা, তাদের টিকিট দিলে দলের প্রাচীনেরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন, না দিলে সিন্ধিয়া। তিন নম্বর হল রাজ্য সরকারের অ্যান্টি ইনকমব্যান্সি। চার নম্বর হল নরেন্দ্র মোদির ১০ বছরের অ্যান্টি ইনকমব্যান্সি। সব মিলিয়ে এবারে আবার একটা পুলওয়ামা, বালাকোটের হাওয়া না থাকলে বিজেপির পক্ষে ১২-১৪ টা আসনের বেশি পাওয়া অসম্ভব। সেক্ষেত্রে আবার ১৪টার মতো আসন হাত থেকে বেরিয়ে যাবে। এবার কর্নাটক। কংগ্রেস সরকার তৈরি হওয়ার পরেই পাঁচ গ্যারান্টি চালু, ২০০ ইউনিট বিজলি, বাসে মহিলাদের ফ্রি জার্নি, বেকারদের ৩০০০ করে টাকা, মহিলাদের হাতে ২০০০ টাকা আর ১০ কেজি চাল-গম চালু হয়ে গেছে। জেডিএস যে বিরাট মুসলিম ভোট পেত, তা তারা হারিয়েছে এবং চট করে তা জেডিএস-এর দিকে ফিরবে না বরং মুসলমান ভোট আরও বেশি করে যাবে কংগ্রেসের দিকে। বিজেপি যদি জেডিএস-এর সঙ্গে জোট করেও তাহলেও তাদের বিরুদ্ধে যাবে ওই ডাইনাস্ট পলিটিক্স, বংশানুক্রমিক রাজনীতির বিষয় এবং জেডিএস সরকারের সময়ের দুর্নীতির ইস্যু। সব মিলিয়ে এখানেও ওই পুলওয়ামা বালাকোট না হলে ২৮-এ ২৫ তো বাদই দিলাম ৭টা আসন জুটলেও ঢের বেশি হবে। মানে আবার ১৭-১৮টা আসনের ক্ষতি। এবার বাংলায়, ঠিক এই মুহূর্তে ভোট হলে বিজেপি গোটা ১৪ আসন, কংগ্রেস গোটা ৩ আসন আর ২৫টা আসন তৃণমূলের দিকে যাবে। না, বামেরা এবারেও বাংলায় কোনও আসন পাবে বলে মনে হয় না, আসনের নামই খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু যদি কংগ্রেস আর তৃণমূল জোট হয়? তাহলে বিজেপি ৬-৭টার বেশি আসন পাবে না, কং-তৃণমূল জোট ৩৫-৩৬টা আসন পাবেই। কিন্তু একথা শুনেই হাসবেন অনেক কংগ্রেস নেতা, হাসবেন আপাতত হাত ধরা সিপিএম নেতা। তাদের মনে করিয়ে দিই, রাস্তার টিয়া পাখি বলেনি এ সম্ভাবনার কথা, এ সম্ভাবনার দিকেই নির্দেশ করছে ওই জন্মদিনের শুভেচ্ছা, ক্যানিংয়ের বক্তৃতা, যেখানে মমতা সাফ বলেছেন, সমর্থন তো দেব, কিন্তু এ রাজ্যেও সমর্থন চাই। তিনিও জানেন আপাতত আসলি বিপদ বিজেপি, রাহুল গান্ধীও জানেন সে কথা, অধীর চৌধুরী না জানলেও দেশের রাজনীতির কোনও ইতর বিশেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দেশের রাজনীতি এক বোঝাপড়ার দিকে এগোচ্ছে, বিজেপিকে সরানোর জন্য বোঝাপড়া, সেখানে অনেক ম্যাজিক দেখা যাবে। এর পরের আলোচনা ২৩ তারিখ নিয়ে, আলোচনা করব কী হতে চলেছে সেখানে? আপাতত এখানেই শেষ করছি অনুষ্ঠান।