চোখের সামনেই দিন বদলায়, চোখের সামনেই রাজা বদলায়, চোখের সামনেই সিংহাসনে আসীন হয় অন্য কেউ। রাজছত্র ভেঙে পড়ে, এক শাসকের বদলে অন্য শাসক এসে হাজির হয়। কিন্তু এসব বড়বড় কিছু হওয়ার আগে ছোট ছোট কিছু জিনিস বদলাতে থাকে, যেমন ঝড়বৃষ্টির আগে পিঁপড়েরা বাসা বদল করে উঁচুতে চলে আসে, আর সেই বদলের দিকে চোখ রাখলেই বড় বড় বদলগুলোকে আঁচ করা যায়। গর হাওয়া কি রুখ কো সমঝো, ফির তুম বুলন্দিয়ো কো ছু পাওগে। হাওয়া কোনদিকে বইছে সেটা বুঝতে পারলেই সেই কাম্য উচ্চতাকে নাকি ছুঁয়ে ফেলা যায়। আর এই রাজনৈতিক হাওয়ার দিকে কারা তাকিয়ে থাকে? শাসক বদল হলে কমবেশি কিছু প্রভাব তো মানুষের উপরে পড়েই, অর্থনীতিতে বদল আসে, সমাজেও তার ছায়া পড়ে। কিন্তু সেসব তো বদলের পরের কথা। রাজনৈতিক হাওয়া কোনদিকে বইছে তা জানতে উৎসুক কারা? প্রথম দল হল রাজনীতিবিদেরা নিজেরাই, এঁদেরই এক বিরাট অংশ হলেন হাওয়া মোরগ। বিহারে ছিলেন রামবিলাস পাসোয়ান, তিনি নাকি মাস আষ্টেক আগে থেকেই বুঝতে পারতেন হাওয়া এবার কোনদিকে বইছে। তিনি বামের সমর্থনে সরকারে মন্ত্রী হয়েছেন, কংগ্রেসের সমর্থনে সরকারে মন্ত্রী হয়েছেন, বিজেপি সরকারে মন্ত্রী হয়েছেন। ওঁকে নিয়ে ঠাট্টা করা হয় যে উনি আমেরিকাতে গেলে ওবামা বা ট্রাম্প মন্ত্রিসভার সদস্য হয়ে যেতেন অনায়াসে। তো কেবল রামবিলাস পাসোয়ানই নয়, বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা আছেন, যাঁরা হাওয়া মোরগ। এরপরের স্তরে আছেন আমলারা। এনাদের ঘ্রাণশক্তি প্রবল, খবরের মানে ইনফর্মেশন সোর্সও তাগড়া। এঁরা সর্বত্র আছেন এবং এঁদের মধ্যে যোগাযোগ দারুণ। কর্নাটকের এক আইপিএস অফিসার ফোন তুলে উত্তরপ্রদেশের এক আইপিএস অফিসারের সঙ্গে অনায়াসে আলাপ আলোচনা করতেই পারেন। এবং তাই এঁরা গন্ধ পান।
তিন নম্বরে আছেন ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা, এঁরা জানেন, বোঝেন কারা জিততে চলেছে, সেই জয় শিওর নাকি জয়ের সঙ্গে কিন্তু-পরন্তু লেগে আছে। এই তথ্য জানার জন্য এঁরা মাইনে দিয়ে লোক রাখেন, সারা বছর সেই সব লোকজন তথ্য যোগাতে থাকেন, এই নেতা, সেই নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। সব মিলিয়ে কোনও ব্যবসায়ী তো আফটার অল হেরো ঘোড়ার ওপর বাজি ধরবেন না। আর চতুর্থ স্তরে আছেন কিছু সাংবাদিকরা, যাঁরা এই ক্ষমতার হাতবদলে নিজেদের স্বার্থ পূরণ করেন, ক্ষমতার ফেরবদলে এক কলম বাংলা না লিখতে পারা সাংবাদিকের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হয়। এই সাংবাদিকেরা একটা নির্বাচন গেলেই অন্যটার হিসেব শুরু করেন, কারণ কে জিতবে তার ওপর নির্ভর করে এঁদের বিরিয়ানি-পোলাও, বিদেশযাত্রা। তো সবমিলিয়ে এই চার স্তরের মানুষ অনেকটাই বুঝতে পারেন, আগামী নির্বাচনে কী হতে চলেছে। কাজেই নির্বাচনের আগে এই চার শ্রেণির মানুষজনের দিকে একটু নজর রাখুন, আপনিও একটা আন্দাজ পেলেও পেতে পারেন। কিন্তু নির্বাচনের এখনও ৮-৯ মাস দেরি আছে কাজেই আপাতত ভরসা বিভিন্ন চ্যানেলের সমীক্ষা আর মিডিয়া, রাজনৈতিক জগতের সামান্য হলচল। রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, তেলঙ্গানা নিয়ে গোটা তিনেক সার্ভে হয়েছে আর দেশ জুড়ে এখনই নির্বাচন হলে কী হবে, তা নিয়েও দুটো সমীক্ষা হয়েছে, মহারাষ্ট্র নিয়ে গোটা তিনেক সমীক্ষা হয়েছে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজি এখন পাপ্পুকে ভয় পাচ্ছেন
এই সবক’টা সমীক্ষার দিকে তাকালে এটা তো অনায়াসেই বলে দেওয়া যায় যে বিজেপি বা এনডিএ কমছে, অন্যদিকে কংগ্রেস এবং ইন্ডিয়া জোট বাড়ছে। এই গ্রাফ ওঠা আর নামার মধ্যে একটা তথ্য খুব পরিষ্কার যে ইন্ডিয়া জোট একটা রাইজিং ফোর্স, এনডিএ জোট ডিকেয়িং ফোর্স, ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। কিন্তু কতখানি উঠছে? কতখানি ক্ষইছে? সেটার ওপরেই তো নির্ভর করছে ক্ষমতার হাতবদল। ধরুন ইন্ডিয়া জোট অনেকটাই বাড়ল, কিন্তু ম্যাজিক ফিগার পার করতে পারল না, ওদিকে বিজেপি ২৩০-২৪০ পেল, শরিক দলও কেবল নয়, ওয়াইএসআরসিপি, বিজু জনতা দল ইত্যাদির ওপর ভর দিয়ে সরকার তৈরি করল। তাহলেও কিন্তু শাসনে বিরাট বদল হবে, সে সরকার এরকম হুট বলতে ঝুট বিল পাশ করাতে পারবে না, ইডি আর সিবিআই দিয়ে শাসন চালাতে পারবে না। আবার বিজেপি একাই ২৭০-২৮০ পেল, তাহলে যে সরকার তৈরি হবে তা কিন্তু মোদি–শাহের সরকারই হবে। কাজেই রাইজিং ফোর্স তো বটে কিন্তু ইন্ডিয়া জোট কতটা রাইজ করবে সেটা দেখার। আপাতত সমীক্ষার কিছু ইন্টারেস্টিং পয়েন্টগুলো দেখে নেওয়া যাক। বিজেপির এবার কড়া নজর আছে তিন রাজ্যের দিকে, যেখানে তারা অন্তত মনে করছে তারা আগের ফলাফল ধরে রাখবে, বা তাদের আগের ফলাফল ধরে রাখতেই হবে। সেই তিন রাজ্য হল বিহার, মহারাষ্ট্র আর বাংলা। দুটো জাতীয় সমীক্ষাই বলছে বিহারের জোট বিজেপিকে বড় ধাক্কা দেবে, মহারাষ্ট্রে শিবসেনা বা এনসিপি ভেঙে কোনও লাভ হচ্ছে না আর বাংলাতে জোট না হলেও বিজেপি ৯ পার করতে পারছে না। আর যদি কংগ্রেস তৃণমূল কংগ্রেস জোট হয় তাহলে বিজেপি ৩-৪ এ গিয়ে ঠেকবে। তার মানে এই তিন রাজ্যে বিজেপি তাদের ক্ষয় আটকাতে পারছে না। এরপর আছে কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ ছত্তিশগড় আর রাজস্থান। রাজ্যের সমীক্ষা বলছে মধ্যপ্রদেশ আর ছত্তিশগড় বিজেপির হাত থেকে গেছে আর রাজস্থানে কাঁটে কা টক্কর। কিন্তু গতবারের হিসেবে এই তিন রাজ্যে বিজেপি সুইপ করেছিল। এবার সাকুল্যে ১২টা আসন পেলেও বড় অ্যাচিভমেন্ট হবে। আর কর্নাটকেও লোকসভার নির্বাচনে এই মুহূর্তে যা অবস্থা তাতে হঠাৎ করে মানুষের মত বদলে যাবে তেমন তো মনে হচ্ছে না। গুজরাতে আপ, কংগ্রেস জোট হলে গোটা দুই তিন আসন বিজেপি হারাতে পারে। দিল্লিতে আপ-কংগ্রেস জোট হলে এখানেও বিজেপি সাতে বড়জোর তিন, পঞ্জাবে বিজেপি একটাও আসন পাবে না। হিমাচলপ্রদেশের আসন একটা তো কমবে, উত্তরপ্রদেশে ৮০-তে কত? আগেরবারের ৬৫? ঝাড়খণ্ডে কমবে। গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অসম জুড়ে ২৫টা আসনের ২০টা বিজেপি পেলেও বিজেপি একলা ওই ২৩০ পার করা অসম্ভব। এবং এটা কিন্তু এই মুহূর্তের অবস্থা।
সমীক্ষাতে কখনও পার্সেন্টেজ বেশি দেখিয়ে, সিট বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে বটে কিন্তু সবক’টা সমীক্ষা কমবেশি এই দিকেই ইঙ্গিত করছে। সবক’টা সমীক্ষাতেই বলা হচ্ছে দক্ষিণের দ্বার বিজেপির কাছে এখনও ক্লোজড, বন্ধ। কেরল, তামিলনাডু, অন্ধ্র, তেলঙ্গানাতে বিজেপি কোথায়? গোয়ায় দুটো আসন? খ্রিস্টান অধ্যুষিত দুটো আসনে এবারে মণিপুরের ২৫০ চার্চ ভাঙার প্রশ্ন সামনে আসছে, বিজেপির কাছে জবাবও নেই। জম্মু-কাশ্মীর হারিয়েছে তার রাজ্যের স্ট্যাটাস, নির্বাচনে তার প্রভাব পড়বে না? গুলাম নবি আজাদকে দিয়ে একটা খেলার চেষ্টা চালানো হয়েছিল, সেটাও মাঠে মারা গেছে, ওঁর নতুন দলের নেতারা দল বেঁধে আবার ফিরেছেন কংগ্রেসে। খেয়াল করুন মধ্যপ্রদেশে এমনকী বিজেপি ছেড়ে নেতারা কংগ্রেসে আসছেন, মহারাষ্ট্রে নতুন জোটসঙ্গী মহারাষ্ট্র বিকাশ আগাড়িতে যোগ দিচ্ছেন, মণিপুরে কুকিদের দল এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে গেল, মিজোরামে এমএনএফ অন্য সুরে গাইছে। সবমিলিয়ে নিশ্চিত বলা যায় যে বিজেপির কাছে এটা আচ্ছে দিন নয়। কিন্তু সমস্যাটা আরও বড়। আগে যে চার স্তরের মানুষজনের কথা বললাম, এঁদের প্রত্যেকেই কিন্তু এই হিসেবের দিকেই নজর রেখে চলেছেন, ওই রাজনীতিবিদেররা, ওই আমলারা, ওই ব্যবসায়ীরা আর মিডিয়ার ধান্দাবাজ মানুষজনেরা। এঁরা কিন্তু এই হিসেবটা বুঝেই আর তিন-চার মাসের মধ্যেই নড়াচড়া শুরু করবেন, আপাতত নজর রাখছেন। কাজেই বিজেপির কাছে কিন্তু ৮-৯ মাস সময় নেই, পারসেপশন গেম শুরু হয়ে গিয়েছে। তিন-চার মাসের মধ্যে বিজেপিকে উল্টো হাওয়া বইয়ে দিতেই হবে না হলে ফুটো জাহাজ ছেড়ে ইঁদুরের দল পালে পালে বেরিয়ে আসবে। উল্টো হাওয়া যে বইছে তা দেখতে হলে খবরের কাগজের প্রথম পাতার দিকে নজর রাখুন, টিভির পর্দায় চোখ রাখুন, অরররণব গোস্বামী পর্যন্ত সরকারকে প্রশ্ন করছে, বীরেন সিংকে পদত্যাগ করতে বলছে, ইন্ডিয়া টিভি তার সমীক্ষায় রাহুল দাঁড়ালে আমেঠি থেকে স্মৃতি ইরানি হেরে যাবেন বলে জানিয়ে দিচ্ছে। একদিকে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক বেঙ্গালুরুতে, অন্যদিকে এনডিএ-র বৈঠক দিল্লিতে, যেখানে আছেন স্বয়ং মোদিজি, কিন্তু পরদিন কাগজের প্রথম পাতায় ইন্ডিয়া। সুপ্রিম কোর্টের পরের পর রায় কেমন যেন উল্টো মনে হচ্ছে না? সবটাই কাকতালীয়? হতেই পারে, নাও হতে পারে। কিন্তু এটা ঠিক যে সীতানাথ বন্দ্যো ছাড়াও অনেকেই আকাশের গায়ের থেকে টক টক গন্ধ নেমে আসছে, তাঁরা সেই গন্ধ পাচ্ছেন। রাহুলের সাংসদ পদ ফেরত আসা নিয়ে যে উল্লাস, এমনকী মিডিয়াতেও, তাও তো দেখার মতো। এর আগে কবেই বা অমন ভিড় করে মিডিয়া এসেছিল কংগ্রেস দফতরে, অপেক্ষা করছিল রাহুল গান্ধীর জন্য? তাই বলছি, হ্যাঁ, এই মুহূর্তেও যাবতীয় সমীক্ষাতে সংখ্যা কমলেও সরকার বানাচ্ছে বিজেপিই। কিন্তু হাতে সময় ন’ মাস, আর সেই ন’ মাসের মধ্যেই ক্ষয় রোধ করতে হবে বিজেপিকে, ফুটো মেরামত করতে হবে নরেন্দ্র মোদিকে, না হলে জাহাজ ডুববে, মাথায় রাখুন টাইটানিকও ডুবেছিল।