নয়াদিল্লি: ঘূর্ণিঝড় ‘বিপর্যয়’ দেশের অর্থনীতি ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রে ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে আনতে চলেছে? আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস থেকে এমনটাই আঁচ করছেন অর্থনীতিবিদরা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ থাকতে পারে ১৫০-১৬০ কিমি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাতে ব্যাপক আকার না নিতে পারে, সে কারণে বহু মানুষ ও গবাদি পশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর ফলে দৈনিক মজুরিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
অন্যদিকে, সমুদ্রবন্দর দিয়ে ব্যবসা করা রিলায়েন্স এবং আদানিদের মতো বৃহৎ পুঁজির কোম্পানিগুলি কয়েকদিনের জন্য কাজ বন্ধ রেখেছে। যে কোনও ঘূর্ণিঝড়ই পরিকাঠামো ক্ষেত্রে প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। তাতে দেশের গড় জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির বৃদ্ধি ধাক্কা খায়। সে কারণে বিপর্যয়ের তাণ্ডব দেশীয় অর্থনীতিতে কত বড় ঝাপটা দেয় তা নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন: Calcutta Highcourt | পুর নিয়োগ দুর্নীতিতে সিবিআই ইডির তদন্তে সায় আদালতের
‘বিপর্যয়’ মোকাবিলায় গুজরাতের ভূমিপুত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ দফায় দফায় খোঁজ নিয়ে চলেছেন। আগামিকাল, ১৫ জুন গুজরাতের আরব সাগর উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে বিপর্যয়। জীবনহানি এড়াতে সরকার যখন ব্যস্ত, তখন অর্থ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবলমাত্র প্রাণ ও ঘরবাড়ির ক্ষতি করে তা নয়। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা জাতীয় অর্থনীতি ও পরিকাঠামোকেও মুখ থুবড়ে পড়তে হয়।
দেশের অর্থনীতি বিষয়ক পরামর্শদাতা সংস্থা এএসজি রেটিং সার্ভিসের কর্তা স্বরূপ গুপ্তা বলেন, ভারতসহ এশীয় দেশগুলিকে চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাব সম্পর্কে আরও বেশি প্রস্তুতি নিয়ে থাকা উচিত। হাজার হাজার মানুষ ও গবাদি পশুকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আরও হচ্ছে। এতে মৎস্যজীবী, বন্দর কর্মী, অপরিশোধিত তেল সরবরাহের কাজে নিযুক্ত কর্মীরা বেরোজগার হয়ে রয়েছে। এতে দৈনিক মজুরির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হচ্ছে। বাণিজ্য কোম্পানিগুলির কাজ বন্ধ রয়েছে। আমদানি-রফতানি বন্ধ। এর উপর বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতির পর সরকারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সব মিলিয়ে বিশাল পরিমাণ আর্থিক লোকসান হতে চলেছে এক ঘূর্ণিঝড়ে।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ গুজরাত বন্দর থেকে ডিজেলসহ অন্যান্য তেলজাত সামগ্রীর ওঠানামা বন্ধ করে দিয়েছে। এই বন্দরের দৈনন্দিন উৎপাদন ক্ষমতা হল ৭ লক্ষ ৪ হাজার ব্যারেল। এখান থেকেই ইউরোপে ডিজেল রফতানি হয়। রাশিয়ার উপর ইউরোপীয় দেশগুলির অবরোধ জারির পর তারা অনেকটাই এই তেল আমদানির উপর নির্ভরশীল।
রিলায়েন্সের প্রতিপক্ষ আদানি গ্রুপও এই অঞ্চলে কাজকারবার বন্ধ করে রেখেছে। ওয়াড়িনাড়, সিক্কা, কান্দলা, ওখা, বেদি, নওলখি বন্দরে আপাতত কাজ পুরোপুরি বন্ধ। ভারতের সবথেকে বড় বাণিজ্য বন্দর হল মুন্দ্রা।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে ওড়িশায় ফেনি ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ক্ষতি হয়েছিল ৯৩৩৬.২৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে আছড়ে পড়া ঘূর্ণিঝড় আমফানে রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি হিসাব অনুযায়ী ক্ষতি হয়েছিল ১.১৬ লক্ষ কোটি টাকা। এছাড়া কোভিড মহামারীর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহারা হয়েছেন। যে ক্ষতি এখনও পূরণ করা যায়নি। তার এক বছর পরেই ঘূর্ণিঝড় ইয়াস দেশের পূর্ব প্রান্তে পশ্চিমবঙ্গে আছড়ে পড়ে। প্রায় ২.৭৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড মিলিয়ে যে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭-৮ বিলিয়ন ডলার।
প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও এরকম এক-একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পরোক্ষ আর্থিক প্রভাব পড়ে অনেক ক্ষেত্রে। যেমন ব্যাপক পরিমাণে শস্য নষ্ট হওয়ায় খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায়। এছাড়াও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরবর্তীকালে স্বাস্থ্য পরিষেবা যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে পড়ে। জল, বিদ্যুৎ, সড়ক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যা মেরামত করতে প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে সরকার। সর্বোপরি প্রচুর সুজলা-সুফলা জমি রাতারাতি পতিত হয়ে যায় সমুদ্রের জল ঢুকে। বছরের পর বছর ধরে সেখানে আর ফসল ফলে না। সুতরাং, একটা ঘূর্ণিঝড় হল প্রকৃতির সেই ধ্বংসলীলা, যা কয়েক ঘণ্টায় ভেঙে দিয়ে যায় একটা দেশের শিরদাঁড়া।