আমাদের দেশের স্বাধীনতার পরে এসেছে চীনের স্বাধীনতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ধ্বংশ হয়ে গিয়েছিল জাপান, এই সেদিন ৭১ এ স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ আজ তারা আমাদের থেকে এগিয়ে। আমাদের ত্রিবর্ণ পতাকা পতপত করে উড়ছে, লাল কেল্লা থেকে ভাষণ দিচ্ছেন মোদিজি। গতকাল রাষ্ট্রপতির ভাষণে চন্দ্রযান থেকে জি টোয়েন্টির প্রসঙ্গ এল। সে থাক আমরা বরং মোদিজী কী বললেন তা নিয়েই কটা কথা বলি। বলতে উঠেই প্রথমে তিনি বললেন যুবকদের কথা, তারাই নাকি দেশের ভবিষ্যৎ। একবারও বললেন না তাঁর বছরে দু কোটি চাকরি দেবার মিথ্যে প্রতিশ্রুতির কথা, বললেন না যে রেকর্ড তৈরি হয়েছে বেকারত্বে, স্বাধীনতার পরে বেকারত্বের এই হার দেখা যায় নি। বললেন মণিপুরের কথা, বললেন না যে রাজ্য সরকারের প্রধান রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী ইম্ফলের বাইরে বের হতে পারছেন না, বললেন না যে গতকালও সেখানে জাতিদাঙ্গার উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বললেন না যে ডাবল ইঞ্জিন সরকার ব্যর্থ। বললেন ভারতবর্ষ আজ গ্রামে, ছোট শহরে, শুধু দিল্লি, মুম্বাই এ সীমাবদ্ধ নয়, গ্রামের, ছোট শহরের যুবক যুবতীরা একথা শুনলে হাসবেন, কারণ আজও দেশের ৭/৮ টা বড়বড় শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে আধুনিক জীবন যাত্রার যাবতীয় উপাদান। গ্রাম বা ছোট শহর আজও সেসব মেট্রোপলিটান থেকে সহস্র যোজন পিছিয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ, বিদ্যুৎ সবেতেই পিছিয়ে আমাদের গ্রামীণ ভারতবর্ষ। বললেন বিশ্বের কোনও রেটিং এজেন্সি তে তাঁদের কোনও বিশ্বাস নেই, বাইরের দেশের, আমেরিকা ইউরোপের এই সব রেটিং এজেন্সি আসলে মিথ্যে কথা বলছে, সেসব রেটিং এজেন্সি তে বলা হচ্ছে আওরা হাঙ্গার ইন্ডেক্স, ক্ষুধা সূচকে অনেক পিছিয়ে, আমাদের গণতন্ত্র ক্রমশ স্বৈরতন্ত্র হয়ে উঠছে, আমাদের সংখ্যালঘুরা নিজেদের বিপন্ন মনে করছেন, আমাদের আদিবাসীদের জল জঙ্গলের অধিকার চলে যাচ্ছে। এসব নাকি বিদেশী কিছু দেশের চক্রান্ত। কিন্তু সেই বিদেশী দেশের জোটে এবারে তিনি সভাপতিত্ব করছেন, তা তিনি বিরাটভাবে বর্ণনা করেছেন, সেটা নাকি দেশের গৌরব।
২০ টা দেশের এক গোষ্ঠিতে পালা করে একজন সভাপতি হবে, আজ ভারত তো কাল আমেরিকা তো পরশু সৌদি আরব, উনি এটার অধ্যে বিরাট গৌরব খুঁজে পাচ্ছেন কিন্তু ক্ষুধা সূচকে পৃথিবীতে পিছিয়ে পড়াটা ওনার কাছে এক বিরাট ষড়যন্ত্র। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেছেন, করোনা কালে দেশের বিরাট উন্নতি হয়েছে, আবার ডাহা মিথ্যে বললেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী, এই সময়ে আমাদের অর্থনীতি পিছিয়েছে, আপনারা বলতেই পারেন যে করোনার মধ্যে তো সব দেশের অর্থনীতিই পিছিয়েছে, আমাদের দেশও পিছিয়েছে, এ তো স্বাভাবিক। দুটো কথা, তিনি যদি বলতেন আমাদের দেশ পিছিয়েছে তাহলে তো সেটা সত্যি বলা হত, তিনি তা বলছেন না। অন্য তথ্যটা হল, হ্যাঁ আমাদের দেশ পিছিয়েছে কিন্তু আমাদের দেশের দুই গোষ্ঠির, আম্বানি আর আদানির সম্পদ বেড়েছে দেড়শ গুণের বেশি। মানে দেশের আয় কমলো, দেশের মানুষের মাথা পিছু আয় কমলো আর আম্বানি আদানির সম্পদ বাড়লো! কেমন করে বাড়লো? কার সাহায্যে বাড়লো? মোদিজী সেকথা লালকেল্লার মঞ্চ থেকে বললেন না। তিনি কৃষকদের ইউরিয়া সারে বেশি খরচের কথা বললেন, বললেন না ওনার সেই প্রতিশ্রুতির কথা যেখানে ২০২২ এর অধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার কথা বলেছিলেন উনি নিজেই। বললেন সুলভে ওষুধ দেবার কথা, চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা, বললেন না একবারও যে ২০১৪ থেকে ৩৮% বেড়েছে চিকিৎসার খরচ আর ওষুধের দাম বেড়েছে ৫৩%, স্বাস্থ ব্যবস্থা গরীব লোকেদের স্বপ্নেরও বাইরে চলে গেছে সে কথা বললেন না। তিনি বললেন মূল্যবৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে, বললেন না সেই পদক্ষেপ টা ঠিক কী? একবারও বললেন না যে জুন ,মাসে ৪.৮৭ শতাংশ থেকে বেড়ে জুলাই আসের মূল্যবৃদ্ধি পৌঁছে গেছে ৭.৪৪ শতাংশে, একবারও বললেন না যে এই এক বছরে কেবল তরিতরকারির দাম বেড়েছে ৩৭%, মানে গত বছরে যে সবজি ১০০ টাকায় কিনতেন, তার দাম এখন ১৩৭ টাকা। কিন্তু মানুষের আয় বাড়ছে না, বাজার অনুযায়ী কমছে। খাদ্যসামগ্রীর দাম ৪.৫৫% থেকে বেড়ে ১১.৫১ শতাংশ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এসব চেপে গেলেন। বললেন বন্দে ভারত ট্রেনের কথা যে ট্রেন উনি চালু করছেন প্রায় প্রতিদিন, সেগুলোই অগ্রাধিকার পাচ্ছে, দ্রুতগতিতে যাবে সেসব ট্রেন, সাধারণ ট্রেনের থেকে বন্দে ভারত ট্রেনের টিকিটের দাম ৩৯ % বেশী, কাদের জন্য সরকার চালাচ্ছেন তিনি? সেনা সীমান্ত্রক্ষা বাহিনীর কথা বললেন, কিন্তু আজ অবদি ওনারই নিযুক্ত কাশ্মীরের রাজ্যপাল সৎপাল মালিকের অভিযোগের জবাব দিলেন না, বললেন কেন ঐ জওয়ানদের প্লেনের বদলে বিপদজনক পথে নিয়ে আসা হল, কেন তাদের সুরক্ষার বিষয়টাতে এত ফাঁক থেকে গ্যালো এবং বললেন না যে দূর্গজটনার পরে তিনি কেন সৎপাল মালিককে মুখ বন্ধ করে থাকতে বললেন। লালকেল্লার মঞ্চকে বেছে নিলেন বিরোধীদের আক্রমণ করার জন্য, সরাসরিই বললেন পরিবারবাদের কথা, উগ্রপন্থার কথা বললেন কিন্তু উল্লেখও করলেন না যে এই উগ্রবাদ আআদের দেশের দুজন প্রধানমন্ত্রীর প্রাণ নিয়েছে, যাদেরকে উনি পরিবারবাদী বলে চিহ্নিত করছেন। আজ তিনি পসমিন্দা উসলয়ানের কথা বললেন, তাদের এগিয়ে যাবার পথে সাহায্যের কথা বললেন, বললেন না যে এই পসমিন্দা মুসলমান রমণী বিলকিস বানোকে গণধর্ষণ করার অভিযোগে শাস্তি প্রাপ্তদের জেল থেকে ছেড়ে মালা পরানো, মিষ্টি খাওয়ানো হল কেন? বললেন না যে গাড়িতে গরু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে কেন? বললেন না যে তাঁর জামানায় দরিদ্র সংখ্যালঘু মানুষজন নিজেদেরকে বিপন্ন মনে করছেন কেন? ভাইপো ভাতিজাবাদের বিরুদ্ধে কথা বললেন কিন্তু সংসদে রাহুল গান্ধী জানতে চেয়েছিলেন, আদানি আর আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক কী? না তার উত্তর তিনি দেন নি, সি এ জি রিপোর্টে সড়ক নির্মাণ, স্বাস্থ প্রকল্প, পেনশন প্রকল্প আর জন আরোগ্য প্রকল্পে যে ঢালাও দূর্নীতির কথা বলা হয়েছে, সেই দূর্নীতির দায় কাদের? দেখা যাচ্ছে একটা মোবাইল নম্বরে ৭.৩৯ লক্ষ মানুষের নাম নথিভুক্ত করানো হয়েছে, সেই ৭.৩৯ লক্ষ মানুষের বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা কারা মেরে দিল? এরকম আরও কত আছে? না, এসব নিয়ে মোদিজী একটা কথাও বলেন নি। উনি ডাহা মিথ্যে কথা বললেন ভাষণের শেষে, ২০১৪ তে যে প্রতিশ্রিতি তিনি দিয়েছিলেন তা পূরণ করার জন্যেই নাকি মানুষ তাকে ২০১৯ এ ভোট দিয়েছিল? কোথায় গ্যালো প্রতি বছরে ২ কোটি মানুষের চাকরি? কোথায় গ্যালো ১৫ লাখের গল্প? কোথায় গ্যালো কালা ধন ওয়াপস আনার প্রতিজ্ঞা? ত্রিবর্ণ পতাকা উড়ছে, মোদিজী সমানে মিথ্যের পর মিথ্যে বলেই চলেছেন। হ্যাঁ তিনি নতুন দেশদ্রোহের আইন এনেছেন তিনি ইডি আর সিবি আই এর ভয় দেখাচ্ছেন প্রত্যেক কে, আমাদের সম্পাদক এখনও ইডির হেপাজতে, কেবল ঘাড় নিচু করলেই তিনি ছাড়া পাবেন আমরা জানি। কোনও স্বাধীন স্বর, ভিন্ন মতামত কে থাকতে দেবেনা এই নরেন্দ্র মোদীর সরকার। আজ এই সরকারের যে স্বৈরতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক চেহারা মানুষের সামনে এসেছে, তা নতুন কিছু নয়। ভারতবর্ষের আত্মার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবেই অসাম্প্রদায়িক, ভাইচারা, গণতান্ত্রিক, বহুস্বরের প্রতীক ছিলেন জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, আর এস এস – বিজেপি সেই ভিন্নস্বরের জবাব দিয়েছেইতালিয়ান বেরেত্তা পিস্তলের গুলি দিয়ে। সেদিন তাদের কাছে ছিল এক উগ্র হিন্দু, জঙ্গি জাতীয়তাবাদী, সাম্প্রদায়িক সংগঠন, আজ হাতে এসেছে এক সরকার। তাই যে কোনও বিরুদ্ধ মত আজ হয় জেলে, নাহলে ইডি, সিবি আই, ইনকাম ট্যাক্সের চোরাগোপ্তা আক্রমণের সামনে অসহায়। সেই কর্মকান্ডের সবথেকে বড় কর্মসূচী হল সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা। যে শিল্পপতিরা এই জামানাতেই বিলিওনিয়ার, ট্রিলিওনিয়ার হয়ে উঠেছে, বিশ্বের ধনী তালিকায় অনায়াসে নিজেদের নিয়ে গেছে, তাদের সাহায্যেই একে একে কিনে নেওয়া হচ্ছে সংবাদ মাধ্যম। সাংবাদিক মাথা ঝোঁকাবে না?
সংবাদপত্রের মালিককেই কিনে নাও, চ্যানেলটাই কিনে নাও। এই ফাসিস্ট চেহারা আজ সবার সামনে। ৯০% পঙ্গু অধ্যাপক জেলে, অতি বৃদ্ধ জেসুইট ফাদার জেলেই পচে মরেছে, সাংবাদিক জেলে, সমাজকর্মী জেলে, প্যারোলে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ধর্ষক রাম রাহিম বাবা, খালাস পেয়ে যাচ্ছে গণধর্ষণে অভিযুক্ত অপরাধীরা। এবং এ খবর প্রকাশ করলে, এই দুরাচারী রাজত্বের সমালোচনা করলে রাজরোষ নেমে আসছে, এবার সেই রোষ আবার নেমে এসেছে কলকাতা টিভির ওপর। এর আগে একবার নয়, বহুবার একইভাবে আটকানোর চেষ্টা হয়েছে, চ্যানেল বন্ধ করে দেবার হুমকি দেওয়া হয়েছে, হয় মাথা নত করো, হাত মেলাও, হয়ে ওঠো হিজ মাস্টারস ভয়েজ, নাহলে জেলে পাঠাবো, সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স দেবো না, চ্যানেলেই পৌঁছে যাবে রাষ্ট্রীয় ডালকুত্তার দল। বক্তব্য একটাই বশ্যতা স্বীকার করো, মাথা টা নামাও। আমরা সাফ জানিয়েছি, শিরদাঁড়া বিক্রি নেই, মাথা নোয়াবো না, বলে দিয়েছি ভয় পাচ্ছি না, কারণ আমরা জানি এই দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকেরা আসলে ভয় দেখাতে চায়, এরা কাগুজে বাঘ। জাতির পিতার হত্যাকারীদের সংবিধান আদালত ইত্যাদিতে বিশ্বাস থাকার কথাতো নয়। কিন্তু আমরাও আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছি, নো পাসারন, পার পাবে না, আমরা লড়ব, শেষতক লড়বো। সঙ্গে চাইছি গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষজন কে, সঙ্গে পেতে চাই এখনও বেঁচে থাকা স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম, সংবাদকর্মীদের সঙ্গে নিতে চাই সে সমস্ত রাজনৈতিক কর্মী, দলকে যাঁরা এখনও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস রাখেন, দেশের সংবিধানে প্রতি যাঁদের আস্থা আছে। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার সঙ্গে গলা মিলিয়েই বলছি, হাম দেখেঙ্গে, হাম দেখেঙ্গে।
আমরা দেখবো, মনে রেখো, আমরা দেখেই ছাড়বো,
আমরা সব দেখবো
অনিবার্য সেই আগামী ভবিষ্যৎ, যা আমাদের,
সেই দিন ও আমরা দেখবো
আমরা দেখবো, মনে রেখো আমরা দেখেই ছাড়বো,
আমরা সব দেখবো
যখন তোমাদের সব অত্যাচার সব ফতোয়া তুলোর মত উড়ে যাবে
আম আদমির পায়ের চাপে এই পৃথিবী থর থর করে কাঁপবে
আকাশের থেকে বাজ পড়বে তোমাদের মাথায় ওহে শাসকের দল
আমরা দেখবো, মনে রেখো আমরা দেখেই ছাড়বো,
আমরা সব দেখবো
যখন মহাকালের সেই দুনিয়া থেকে
নিজেদের ভগবান মনে করা মানুষগুলো উবে যাবে কপ্পুরের মত
যখন মানুষ দখল নেবে তার হৃত সাম্রাজ্য কল কারখানা জল জমিন
সব মুকুট ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে
সব সিংহাসন ভেঙে দেওয়া হবে
আমরা দেখবো, মনে রেখো আমরা দেখেই ছাড়বো,
আমরা সব দেখবো
নাম থাকবে কেবল তাঁর, যিনি আছেন অথবা নেই
যিনি দ্রষ্টা এবং দৃষ্টি,
আমিই সত্য এই আওয়াজ উঠবে দিকে দিগন্তরে
যে সত্য তুমি, যে সত্য আমি
ক্ষমতা দখল করবেই অমৃতের পুত্ররা
সেই আমি সেই তুমি, আমরা।
আমরা দেখবো, মনে রেখো আমরা দেখেই ছাড়বো,
আমরা সব দেখবো।