১৬ অগাস্ট ২০২২, আমরা দেখেছিলাম আইটি রেড, কলকাতা টিভির অফিস, এডিটর কৌস্তুভ রায়ের বাড়ি, আমার বাড়িতে মিলিটারি বুটের শব্দ আর উদ্যত একে ফর্টি সেভেন। চলেছিল ৪৮ ঘণ্টা ধরে। বিবিসির দফতরে রেড, থুড়ি সার্ভে শেষ হল ৪০ ঘণ্টার মাথায়। টেকনিক্যালি কলকাতা টিভির রেকর্ড ভাঙতে পারল না বিবিসি। ব্রিটিশ নাগরিকদের গ্যাঁটের পয়সায় চলে বিবিসি, বিবিসির দফতরে এ ধরনের হানা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেওয়ার কথা, অন্তত ব্রিটেনে, সেখানকার রাজনৈতিক মহলে, সেখানের সরকারের তরফে। ঠিক সেদিনই ফলাও করে জানানো হল আপাতত টাটা কোম্পানির হাতে থাকা এয়ার ইন্ডিয়া এক লপ্তে ৪৭০টা বিমান কেনার বরাতের ঘোষণা করল, কেনা হবে ইউ কে আর আমেরিকার কাছ থেকে। এই মন্দার বাজারে একলপ্তে ৪৭০টা বিমান কেনা, মানে এই সময়ের মধ্যে বৃহত্তম বরাত পেল এয়ারবাস আর বোয়িং। বিবিসি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেননি, মিঃ প্রাইম মিনিস্টার ঋষি সুনক বা রাষ্ট্রপতি বাইডেন বা ফরাসি রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁ, কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই এই বরাত পাওয়ার পরে উচ্ছ্বসিত, তাঁদের দেশে মন্দার বাজারে এই খবর এক খুশির হাওয়া। দু’ দিন পরে আবার ঘোষণা, আরও ৩৭০টা বিমান কেনা হবে আগামী তিন বছরে।
বাজারের হিংস্র উল্লাস এভাবেই গণতন্ত্রকে ঘিরে ধরে, গণতন্ত্রের রাহুগ্রাস উল্লাসের ছবির তলায় ফিকে পড়ে যায়। আপনি জেন্ডার ইকুয়ালিটি নিয়ে সেমিনার করুন, আপনি পরিবেশ বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখার জন্য আন্দোলন করুন, আপনি এলজিবিটি আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান, বাজারকে বাজারের মতো কাজ করতে দিন। আর বাজার? বাজার মানে ১৫-১৮-২০ শতাংশ মানুষ, তাদেরই বিকাশ, তাদের উন্নতি, তাদের জিলে লে জিলে লে জীবন। অন্যধারে তার জ্বলেনি আলো অন্ধকারে, পেটভরা খিদে নিয়েই ঘুম ঘুম তারা ঝিকিমিকি চাঁদ। তাদের কথা বলা যাবে না, তাদের প্রতিদিনের জীবনে গণতন্ত্রের গঙ্গাযাত্রার ছবি দেখানো যাবে না, শোনানো যাবে না উগ্র সংখ্যাগুরু উন্মাদনার তলায় ভীতসন্ত্রস্ত সংখ্যালঘু মানুষদের কান্না। উল্লেখও করা যাবে না দেশের গরিষ্ঠাংশ মানুষের রোজকার জীবনের অপমান আর হতাশার গল্প। যদি করেন, যদি দেখান, যদি বলেন তাহলে আপনার ঘাড়ের পেছনে হাজির হবে সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স, ইডি আরও কতকিছু। বিবিসি গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসি পাতা? কে এই দিব্যি দিয়েছে? বিবিসি ট্যাক্স ফাঁকি দিতে পারে না? পারে, আলবাত পারে। কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স রেড-এর সময়টা দেখুন। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে তারা ‘দ্য মোদি কোয়েশচেন’ নামে দু’ পর্বের এক ডকুমেন্টারি বের করেছে। হ্যাঁ মোদি–শাহকে সুপ্রিম কোর্টও ক্লিন চিট দিয়েছে, কোন জমানায়? যে জমানায় বিচারক অবসর নেবার সাত কি দশ দিন, বড়জোর একমাস পরে পেয়ে যাচ্ছেন রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য পদ, রাজ্যপালের নিশ্চিন্ত জীবন। কেন? তাঁরা খুব কার্যকরী? খুব দক্ষ? এই যে রঞ্জন গগৈ, তিনি রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হওয়া ইস্তক সংসদের কোনও অধিবেশনে একটা কথাও বলেছেন? কোনও প্রশ্ন করেছেন? কোনও আলোচনাতে অংশ নিয়েছেন? আ বিগ নো, এন ও নো। তাহলে তাঁকে কোন কারণে এই পদ দেওয়া হল? নিশ্চয়ই কোনও কারণ তো আছে। কাজেই কোথায় কে ক্লিন চিট পেল তা না দেখে কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল, সেই প্রশ্নই করেছে এই তথ্যচিত্র। ব্যস, মেরেছ কলসির কানা, তাই এবার আইটি হানা।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar: আড়ালে আবডালে নয়, প্রকাশ্যেই হিন্দুরাষ্ট্রের দাবি
মুম্বই, দিল্লির দফতরে ৪০ ঘণ্টা ধরে জেরা আর তল্লাশির মুখে পড়ল সাংবাদিকরা। আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা জানি যে, ঢুকেই তাদের মোবাইল কেড়ে নিয়েছে আইটি টিম, দফতরের প্রত্যেক কোণে দাঁড়িয়ে পড়েছে একে ফর্টি সেভেন হাতে সিআরপিএফ। আমরা জানি ভেতরে কোনও ক্যামেরা অ্যালাও করা হয়নি, আমরা জানি যে অসুস্থতার কারণেও কাউকে ছাড়া হয়নি, ফোন করতে দেওয়া হয়নি। আমরা জানি যে তাদের ল্যাপটপ কমপিউটার খুলিয়ে তাতে অজস্র কি-ওয়ার্ড, যেমন জিএসটি, ব্ল্যাক মানি, ডিকটেটর, কমিউনাল রায়ট ইত্যাদি শব্দ পুরে তার রেজাল্ট দেখা হয়েছে, এসব আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, বলতেই পারি যে তাঁরা ঢূকেই সিসিটিভি কানেকশন কেটে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর? আমার ঘরে ৪৮ ঘণ্টা তাণ্ডবের পর কেটে গেছে ৬ মাস। ফলাফল? আমার কী দোষ ছিল? কেন আমাকে ওইভাবে হ্যারাস করা হল, তার কোনও জবাব? নেই। আসলে এই প্রত্যেকটা রেড হল ইন্টিমিডেশন, ভয় দেখানো, জুজুর ভয়। বিরাট বাহিনী, সিআরপিএফ, গাড়ি, হই হই ব্যাপার। ভেবে দেখুন এই ৩০০ জন ইনকাম ট্যাক্সের অফিসার, সিআরপিএফ নিয়ে ৩ দিনের এই রেড-এর খরচা কত? তাঁদের বেশিরভাগের যাতায়াত প্লেনে, তাঁদের থাকা, খাওয়া, গাড়ি, সব মিলিয়ে খুব কম করে এই ক’দিনে মাথা পিছু ২০ হাজার, মানে ৬০-৭০ লক্ষ টাকা খরচ। ওনাদের মাইনে, এই রেড চলাকালীন অন্যান্য ভাতা ইত্যাদি এরমধ্যে ধরাই নেই। কার টাকা? আমার, আপনার, দেশের মানুষের। কোন কাজে লাগানো হল? দেশের মানুষকে ভয় দেখাতে ব্যবহার হল, কাল বিবিসি বিজেপির দিকে ঝুঁকে গেলেই বিজ্ঞাপন ক্যাশে আসছে না চেকে? কেউ প্রশ্ন করবে না, উলটে আরও অনেক কিছু আসবে, কেবল বশ্যতা স্বীকার করে নাও।
ইনকাম ট্যাক্সের অফিসার, তাদের রেড তো এই কথাই বলে গেল, তাই না? বাঘ আর কুকুরের সঙ্গে কথা হচ্ছিল এক রাতে। আমি রোজ মাংস আর ভাত খাই, তুই? না ভাই ভাত কাকে বলে জানি না, তবে শিকার পেলে মাংস খাই, না পেলে ঝরনার জল। তাহলে মাথার ওপর ছাদ, অসুখ করলে দওয়া, দারু। চলে আয়। তাহলে চলেই আসি কী বল? হ্যাঁ চলে আয়। আচ্ছা একটা কথা বল, তোর গলায় ওটা কীসের দাগ? এটা? এটা তো বেল্টের, দিনের বেলায় আমার গলায় বেল্ট পরিয়ে বেঁধে রাখে তো, তারই দাগ। বেঁধে রাখে? বলিস কী? মানে তোকে সকাল থেকে সন্ধে বেঁধে রাখা হয়? না ভাই, পারব না, স্বাধীনতা খুইয়ে মাংস ভাত খাবার ইচ্ছে আমাদের নেই। হ্যাঁ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় একদা তড়িপার হোম মিনিস্টার, আমরা কেউই গলায় বেল্ট পরতে রাজি নই, আমাদের টিকাউ শিরদাঁড়া বিকাউ নয়। দিগ্বিজয় সিং ২৬ জুলাই ২০২২-এ সংসদে প্রশ্ন করেছিলেন, গত পাঁচ বছর ধরে আইটি ডিপার্টমেন্ট কত জায়গায় রেড চালিয়েছে। তার ভিত্তিতে কতগুলো মামলা দায়ের হয়েছে, কতজন শাস্তি পেয়েছে? উত্তর এল অর্থদফতর থেকে। অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরি জানালেন, ২০১৭–১৮তে ৫৮২, ২০১৮–১৯-এ ৯৬৬, ২০১৯–২০তে ৯৮৪, ২০২০–২১-এ ৫৬৯, ২০২১–২২-এ ৬৮৬টা জায়গায় রেড হয়েছে। তার মানে এই পাঁচ বছরে মোট ৩৭৮৭টা জায়গায় রেড হয়েছে। ২০১৭–১৮তে ৫৬০টা মামলা দায়ের হয়েছিল, ২৩ জন সাজা পেয়েছে, ৩ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, বাকি মামলা পেন্ডিং। ২০১৮–১৯এ মামলা ৭৭১, শাস্তি শূন্য, ছাড় পেয়েছেন ৫ জন বাকি মামলা পেন্ডিং। ২০১৯–২০তে মামলা ৩৬৫, শাস্তি পেয়েছে ২ জন, ছাড় পেয়েছে ১০ জন, বাকি মামলা পেন্ডিং। ২০২০–২১এ মামলা ১৪৫, শাস্তি শূন্য, ছাড় শূন্য, সবটা পেন্ডিং। ২০২১–২২এ মামলা ১১৫, শাস্তি হয়েছে ৪ জনের, কেউ ছাড় পায়নি, বাকি পেন্ডিং। মানে ৩৭৮৭টা রেড-এ মোট মামলা হয়েছে ১৯৫৬টা আর এখনও পর্যন্ত শাস্তি পেয়েছে ২৯ জন। কী অসাধারণ সাফল্য তাই না?
আরও পড়ুন: Fourth Pillar: মেরেছ কলসির কানা, তাই এবার আয়কর হানা
আসলে সফলতার জন্য, দোষীদের ধরে শাস্তি দেওয়ার জন্য তো এই রেড নয়, এই রেড হল ভয় দেখানোর জন্য। কিন্তু জনাব কান খুলে শুনে রাখুন, ৪৮ ঘণ্টা রেড-এর পরেও আমরা মাথা নোয়াইনি, কম্প্রোমাইজ করিনি, বিবিসির কাছ থেকেও সেটা আশা করা ভুলই হবে, বিবিসির বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক অনেক ওপরে। কে বলেছেন? শুনুন কে বলেছেন (মোদিজির বাইট) হিপোক্রেসি কি ভি কোই সীমা হোতি হ্যায়। ওদিকে টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে তাকান, সেখানে উন্নয়নের ধ্বজা উড়ছে। দেশজুড়ে টিভি চ্যানেলের বশ্যতা কিনে নিয়েছে মোদি-শাহ, কিনতে পারেনি রবীশ কুমারকে, বাংলায় কলকাতা টিভি, চতুর্থ স্তম্ভকে, কেনা সম্ভব নয় বিবিসিকে। কাজেই তাদের স্তব্ধ করতেই হবে। আপ এর মণীশ সিসোদিয়ার ঘরে রেড, শিবসেনার সঞ্জয় রাউত জেলে, ইডি রোজ ডাকছে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধীকে, বাংলাতে তো বলতে গেলে তাণ্ডব চলছে। সুবিধে কোথায়? বিরোধী দলের কিছু নেতার দুর্নীতি তো ছিল, আছে, সেগুলোকে সামনে রেখে এই রেডগুলো দিয়ে প্রচার হল সমস্ত বিরোধী দলই চোর, প্রত্যেকটা দল চোর, কিন্তু সেই চোরেরাই যখন বিজেপি তে ঢুকে যাচ্ছে, তখন তারা বশিষ্ঠ মুনি, ভরদ্বাজ ঋষি। একই নারদার জন্য ববি হাকিমের কাছে সিবিআই যাচ্ছে, শুভেন্দু অধিকারী গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেশ চলছে আইন দিয়ে নয়, ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স আর ভিজিলেন্স-এর ভয় দেখিয়ে, বিচারক রিটায়ার করার পরে পেয়ে যাচ্ছেন রাজ্যসভার পদ। অর্থাৎ বিজেপি জানে, মোদি–শাহ খুব ভালো করে জানেন, সামনের নির্বাচন কঠিন, খুব কঠিন। অতএব কুত্তা লেলিয়ে দাও, ভয় দেখাও, সেই ভয়ের অঙ্গ হল ৪০ ঘণ্টার এই আইটি রেড। ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া বেড়ালকে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করতে দেখেছেন? বেড়াল নখ দেখাচ্ছে।