নয়াদিল্লি: মায়ের ইচ্ছা ছিল বিষয়টি গোপনেই রাখা, আঁচলের তলায় লুকিয়ে রাখা। কিন্তু, ছেলের আর তর সইল না। সালটা ১৯৭৩। মে মাস। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় রাজনীতিতে একচ্ছত্র অধিশ্বরী। দলত্যাগ বিরোধী আইনের একটি সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে এলেন। সঙ্গে সঙ্গে ঘৃতাহুতি পড়ল দেশজুড়ে। আয়ারাম গয়ারামের দল রে রে করে উঠল। শুরু হল ইন্দিরা বনাম বিরোধীদের লড়াই।
২ বছর ধরে বিষয়টি ঝুলে থাকার পর দেশে নামল জরুরি অবস্থা। সেখানেই সমাধিস্থ হল দলত্যাগ বিরোধী আইন। এর বেশ কয়েকবছর পর ইন্দিরা-পুত্র রাজীব গান্ধী নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিলেন কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে দলত্যাগ বিরোধী আইন আসবে। মুখের কথা নয়, ১৯৮৫-তে ক্ষমতায় আসার ২ মাসের মধ্যে সংবিধান সংশোধনীতে তা আইনে পরিণত করে ছেড়েছিলেন রাজীব। সংসদের দুই কক্ষেই বিরোধীদের দুরমুশ করা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল সেই বিল।
আরও পড়ুন: ফের রাহুলের ‘ব্রহ্মাস্ত্র’, লাদাখের মানুষের জমি কেড়েছে চিন, মানতে চান না মোদি
সেদিনই ‘আইনমাফিক’ বন্ধ হল হুটহাট করে সুবিধাবাদী দলত্যাগের ঝোঁক। কিন্তু আজও কি তা সম্পূর্ণ হয়েছে? দলত্যাগ কি আজ হয় না, কিংবা হলেও কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই যে রোজ পতাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে আখছার, সেখানে কোন আইনে তা ঠেকানো হচ্ছে!
পিছিয়ে যাওয়া যাক আরও কয়েক বছর আগের রাজনৈতিক ইতিহাসে। ১৯৬৭ সাল। হরিয়ানার রাজনীতিতে চলছে বিরাট ডামাডোল। প্রায় প্রতিদিন মুখ এক, বদলে যাচ্ছে টুপি। শরীর এক, রং বদলাচ্ছে কোটের। যার ফলে ভেঙে দেওয়া হল হরিয়ানা বিধানসভা। পরের বছর ভোটে নির্দল সদস্য হিসেবে জিতলেন গয়া লাল নামে এক ব্যক্তি। জেতার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভিড়লেন কংগ্রেসে। তারপর দিন পনেরোর মধ্যে তিনি তিনবার দল পরিবর্তন করেন। প্রথমে যুক্তফ্রন্ট, তারপর ফের ঘর ওয়াপসি কংগ্রেসে। তার ৯ ঘণ্টার মধ্যে ফের যুক্তফ্রন্টে যোগ দেন গয়া লাল। কংগ্রেসের তৎকালীন এক নেতা গয়া লালকে নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনের সময় বলেন, ‘গয়া রাম এখন আয়া রাম হয়ে গিয়েছেন।’ আর তখন থেকেই কথাটা প্রবাদের মতো বেঁচে রয়েছে ভারতীয় রাজনীতিতে।
সেই সময়ের হিসেবে রাজীব গান্ধীর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইন বিশাল লাভজনক কিছু ছিল না। কিন্ত, এই আইনে আখেরে কংগ্রেসই ফায়দা তুলেছিল, আবার কংগ্রেসেরই ভরা তরী ডুবেছিল নরসিমা রাওয়ের জমানায়। ১৯৬৭ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৭০০ দলত্যাগের ঘটনার রেকর্ড আছে। যার মধ্যে ১৯০০ জন অন্য দল ভেঙে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। গদির লোভে দলবদলু মুখ্যমন্ত্রীর ১৫ জনের মধ্যে ১০ জনই কংগ্রেসের।
দলবদলের আইনের মূল বিষয় হচ্ছে, আইনসভার কোনও সদস্য যদি স্বেচ্ছায় তাঁর দল থেকে পদত্যাগ করেন। আইনসভার ভিতরে ভোটাভুটির ক্ষেত্রে দলের জারি করা হুইপ অমান্য করা। তাঁর দল যদি তাঁকে তাড়িয়ে দেয়, তাহলে তিনি অন্য দলে যেতেই পারেন। এনিয়েই ১৯৮৫ সালে ৫২-তম সংবিধান সংশোধনে এই আইন পাশ হয়। সংসদের কোনও এক সদস্যকে দলত্যাগ করা ব্যক্তির প্রতি অভিযোগ আনতে হবে। তবে উপরের তিনটি শর্ত মানলে তিনি এই আইনের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।