বহু প্রতিক্ষিত মন্ত্রীসভার সম্প্রসারণ হয়ে গেলো, ৭ জনের প্রমোশন হল, ৩৬ জন নতুন মন্ত্রী হলেন, ১২ জনের মন্ত্রীত্ব গেলো। বহুদিন ধরে মন্ত্রীসভার রদবদল হবে শোনা যাচ্ছিল, নানান গুজব ভাসছিল। তো শেষমেষ সেই পরিবর্তন এলো, নরেন্দ্র মোদির নতুন মন্ত্রিসভা এখন ৭৭ জনের। ছোট্ট, কার্যকরী মন্ত্রিসভা ইত্যাদির বাওয়াল বন্ধ। আর অনেকদিন পরে কিছুটা হলেও এটা এনডিএ মন্ত্রীসভা, কারণ শরিকদল ছাঁটতে ছাঁটতে, মহারাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির সবেধন সাংসদ রামদাস অটাওলে ছাড়া, আর কোনও শরিক দলের মন্ত্রী ছিল না, এবার জেডিইউ এল, এলজেপির ভেঙে যাওয়া অংশ এল, উত্তরপ্রদেশের অপনা দল এল। শরিক দল ছিল অনেক, তারমধ্যে এআইডিএমকে নিজেদের ঝগড়ায় ব্যস্ত, আকালি দল বেরিয়ে গেছে, পিডিপি এখন দুশমন, গুপকর গ্যাংয়ের অংশ, তেলেগু দেশম বহু আগেই বেরিয়ে গেছে, সব মিলিয়ে ২০১৯ এর সরকার ছিল বিজেপিরই সরকার।
কিন্তু এবার আবার অন্তত কিছু শরিক দল এল, এটা মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের একটা দিক, অন্যদিক হল গড় বয়স কমেছে, হ্যাঁ নতুন কিছু তরুণ মুখ আসায় গড় বয়স কমে এখন ৫৮, আগে ছিল ৬১, মানে মন্ত্রিসভাকে তরুণ করার প্রচেষ্টা চলছে। আর বাদ পড়েছেন ঘ্যামা ঘ্যামা কয়েকজন মন্ত্রী, বাবুল সুপ্রিয় বা দেবশ্রী চৌধুরির মত, সিকি আধুলি মন্ত্রীও বাদ পড়েছে। বাদ পড়েছেন ডঃ হর্ষ বর্ধন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, বাদ পড়েছেন আইন ও তথ্য প্রযুক্তি দফতরের নামজাদা মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ, শ্রমমন্ত্রী সন্তোষ গঙ্গোয়ার, নাম কাটা গেছে প্রকাশ জাভড়েকরের, তিনি ছিলেন পরিবেশ মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রী বা হিউম্যান রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট মন্ত্রী নিশঙ্ক পোখরিয়াল, রসায়ন ও সার মন্ত্রী সদানন্দ গৌড়া, মানে বেশ কিছু নাম, বেশ কিছু দফতরের মন্ত্রীর নাম কাটা গেছে, যে সব দফতরের কাজকর্ম নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ছিল, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সেসব ব্যর্থতার খবর চাইলেও চেপে রাখা যাচ্ছিল না, স্বাস্থ্য দফতর ব্যর্থ, তথ্য প্রযুক্তি যে ভাবে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় ট্যুইটার, ফেসবুক ইত্যাদি নিয়ে নেমেছিল, তাতে নাক কাটা যাচ্ছিল সরকারের, সেই কারণেই নাকি তাঁদের গদি কেড়ে নেওয়া হল, অন্তত প্রতিষ্ঠিত মেন স্ট্রিম মিডিয়ায় এই সম্প্রসারণকে ঘিরে যে কয়েকটা কথা, বলা ভাল যে প্রচার চালানো হচ্ছে, তা হল (এক) অযোগ্য মন্ত্রীদের পারফমেন্স অনুযায়ী সরিয়ে দেওয়া হল। (দুই ) মন্ত্রিসভাকে গতিশীল করার জন্য গড় বয়স কমানো হল, এবার টিম মোদি দেশের কাজের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে।
সরকারের ধামাধরা মিডিয়া, গোদী মিডিয়া গতকাল থেকে তোতাপাখির মত এই কথা বলে যাচ্ছে। মিথ্যে, ডাহা মিথ্যে বলে যাচ্ছে। আসুন দেখা যাক সত্যিটা কী? সেটা বোঝার আগে নরেন্দ্র মোদিকে বোঝা দরকার, ৫২ সাল থেকে এরকম প্রধানমন্ত্রী ভারতবর্ষ দেখেনি, যিনি কোনও মন্ত্রীকে, কোনও দফতরকে এক দিনের জন্যেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেননি। সুষমা স্বরাজ বিদেশমন্ত্রী ছিলেন, মনে আছে? একবার বাংলাদেশ যেতে পেরেছিলেন। কোনও আন্তর্জাতিক বৈঠক, অন্য রাষ্ট্রপ্রধান বা অন্য দেশের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তাঁকে দেখা যায়নি, কারণ সে দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিলেন স্বয়ং মোদিজি। অর্থ দফতর, নির্মলা সীতারমণের কথা বাদই দিন, উনি তো বকলমেরও বকলম। অরুণ জেটলি, বিজেপির প্রবীণ নেতা, গুরুত্বপূর্ণ নেতা, দেশের অর্থমন্ত্রী, টিভিতে ভাষণ শুনে ডিমনিটাইজেশনের খবর পেয়েছিলেন, সার্জিকাল স্ট্রাইক মনে আছে? পরদিন সকালে অর্ণব কী জানিয়েছিলেন? জানিয়েছিলেন, সারা রাত ওয়ার রুমে জেগে বসেছিলেন আমাদের চওকিদার, নরেন্দ্র মোদি, রাজনাথ সিং নয়। কার্গিলে, দ্রাসে আর্মি ড্রেস পরে কাকে পরিদর্শনে যেতে দেখেছেন, সে নৌটঙ্কির কুশীলব রাজনাথ সিং নন, নরেন্দ্র মোদি, কৃষি বিল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কৃষক নেতাদের সঙ্গে, বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন, এ বিলের পরিমার্জন সম্ভব, বাতিল করা যাবে না, কোন এমন দফতর আছে যা নিজে থেকে কাজ করেছে, দফতর তো ছেড়ে দিন, দিল্লির কোন দফতরের কোন আমলা আছেন, যিনি পিএমও থেকে আসা নির্দেশ নিয়ে একটা কথা বলাতে পেরেছেন? একজনও নেই। হ্যাঁ ইউনিয়ন মন্ত্রী সভায় একটাই পোস্ট আছে, একটাই, বাকি সব ল্যাম্প পোস্ট।
পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা জানারও চেষ্টা করেছিলেন? লকডাউনের আগে? শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন? ওই দফতরের মন্ত্রী আমলারা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে, যে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের জীবনে বিপর্যয় আনবে এই সিদ্ধান্ত? বলা তো দূরের কথা, বলার কথা মনেও আনেন নি। অতিমারী নিয়ে কবার সাধারণ মানুষের সামনে এসেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী? ভ্যাকসিনেশন পলিসি কে ঘোষণা করেছিলেন? পুণেতে ভ্যাকসিন কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে ছবি তুলিয়েছিলেন কি স্বাস্থ্যমন্ত্রী? না, সব জায়গায় সেই এক এবং অদ্বিতীয় চায়ওলা, চৌকিদার, পরধান সেভক। এটাই নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর মন্ত্রিসভা, হীরক রাজার দেশের যাদুকর, আমি। আমিই সব। মারবো, রাখবো, ধরবো, খেতে দেবো কেবল আমি। এরপর যখন কেউ বলেন, বা যখন প্রচার করা হয়, মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ছাঁটাই করা হল, তখন তা এক প্রকান্ড ঠাট্টা, এক বিরাট মিথ্যে।
যদি পারফরমেন্সেরই কথা ওঠে, তাহলে আসুন তাকিয়ে দেখা যাক অর্থমন্ত্রকের দিকে, জিডিপি হাইরাইজ বিল্ডিং থেকে ফেলে দেওয়া বলের মত, পড়ছে তো পড়ছেন। ২০১৬ থেকে পড়ছে, মূল্যবৃদ্ধি, টাকার দাম তলানিতে, এটা পারফরম্যান্স? প্রতিরক্ষা, চীন নিয়ে যা চলছে তার থেকে নক্কারজনক কিছুই হয় না, ক’দিন আগে সেই গালওয়াল বর্ডারে চীনা ফৌজ দ্বিগুণ সৈন্য নিয়ে পালন করলো, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১০০ বছর, ছবি সবার সামনে। ঘর মে ঘুস কর মারনেওয়ালা ৫৬ ইঞ্চি, এখন বাচ্চাদের স্কুলের স্কেলেও ছোট হবে। বিদেশমন্ত্রী, কি অসাধারণ পারফরম্যান্স। একজন পড়শিকেও সমর্থনে পাওয়া যাবে না, চীন সখ্যতা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের সঙ্গে। এই উপমহাদেশে আমরা একলা। সঙ্গে ছিল আফগানিস্থান, আমেরিকা চলে যাবার পরে তা আর ক’দিনের মধ্যেই আসবে তালিবানদের দখলে, এবং ছবিটাই পালটে যাবে, মাথায় রাখুন পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ওপরেই আফগানিস্থান, ট্রাম্পের সঙ্গে দহরম মহরমের ফল? চোখের সামনে, চাপ বাড়ছে মানবাধিকার নিয়ে, কাশ্মীর নিয়ে। শুনতে হবে, শুনতে হচ্ছে। ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প, সে দফতরের অবস্থার কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো, প্যান্ডেমিকে চাপা পড়ে আছে, শেষ হলে কঙ্কালটা পুরোপুরি দেখা যাবে। অতএব, না পারফরম্যান্স, মানে দফতরের কাজের ভিত্তিতে এই রদবদল হয়নি, এটা পরিস্কার, এটা গোয়েবলসের প্রচার চলছে, আসল তথ্যটাকে ঢাকা দেবার জন্য। তাহলে আসল সত্যটা কী? আসুন সেটাও দেখে নেওয়া যাক। সত্যিটা হল, দেশ নয়, দেশের মানুষ নয়, বিকাশ বা উন্নয়ন নয়, আরএসএস, বিজেপি এবং মোদিজি বোঝেন কেবল ক্ষমতা, গদি। প্রতিটা নির্বাচনেই তাঁকে, তাঁদেরকে জিততে হবে। এই মন্ত্রী সভা রদবদল, সম্প্রসারণ, পুরোটাই সেই নির্বাচনের দিকে তাকিয়েই করা। নিজেরা ৩০৩ পাবার পর, বিজেপি ভুলেই গিয়েছিল এনডিএ’র কথা, ওহ কিস ক্ষেত কা মূলি হ্যায়? কিন্তু আর মাত্র আড়াই বছর, একটার পর একটা রাজ্য সরকার চলে যাচ্ছে, বাংলা দখলে এলো না শুধু নয়, দুর্দশার একশেষ, দল টিঁকিয়ে রাখাই ভার, ওদিকে তামিলনাড়ু, কেরলেতেও একই হাল। তাহলে? একটা জিনিস খুব পরিস্কার ওনাদের কাছে, মোদিজির কাছে। কেবল হিন্দু ভোটে, উচ্চবর্ণের ভোটে জয় আসবে না, এটা পরিস্কার। মনে আছে ভি পি সিংহের সময়, কমন্ডুল নিয়ে নামে বিজেপি, রামমন্দির আর রথযাত্রা। অন্যদিকে ভি পি সিং আনেন মণ্ডলের রাজনীতি, ওবিসি’র রাজনীতি, সংরক্ষণের রাজনীতি। বিজেপি তখন উচ্চবর্ণ হিন্দু , কিছু আদিবাসী আর বানিয়াদের দল। অন্যদিকে দেশজুড়ে ওবিসি, আদার ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস, তপসিলি জাতি, আদিবাসী আর মুসলমানদের জমায়েত। বিজেপি সেই উচ্চবর্ণ হিন্দু, বানিয়াদের সঙ্গে ওবিসি, তপসিলি জাতিদের যোগ করতে চাইছে, সারা দেশ জুড়ে এই কাজ করার জন্যই এই রদবদল, প্রতিটা রাজ্যে আলাদা হিসেব।
তামিলনাডুতে বেশি আসন আসবে না, কিন্তু তিনটে আসন টার্গেট, রাজ্যের বিজেপি সভাপতি হলেন মন্ত্রী, কেরলে কিছুই হবে না, অতএব ওদিকে তাকাননি মোদিজি, কর্ণাটকে লিঙ্গায়েতদের তিন জন, ভোক্কালিঙ্গাদের একজন, নজর কোন দিকে বুঝুন, গুজরাটে দু’জন পাতিদার মন্ত্রী হল, পাতিদাররা হল গুজরাটে সবথেকে ক্ষমতাবান জাতি, মাথায় রাখুন ২০২২ এ গুজরাটে ভোট, একগুচ্ছ পাতিদার নেতা কিছুদিন আগেই আপে যোগ দিয়েছে, মোদিজি পালটা ঘুঁটির চাল দিলেন। ওধারে পঞ্জাবে তেমন কিছু হবে না, আকালিদের সঙ্গে জোট নেই তাই হরদীপ পুরি, যদি একটা সাংসদ মেলে। উত্তরাখন্ডের নির্বাচনও ২০২০, নিশঙ্ক পোখরিয়ালকে তুলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অজয় ভাটকে মন্ত্রী করা হল, মহারাষ্ট্রে মোদিজি চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, শিবসেনাকে দলে ফেরানোর, এখন সে আশা ছেড়েছেন অতএব নারায়ণ রাণে সমেত চার জনকে মন্ত্রী, মহারাষ্ট্রে একলাই লড়ার প্রস্তুতি। বিহারে নীতীশ কুমারকে ছাড়লে হবে না, তার সঙ্গে অতি দলিতদের চাই, সঙ্গে নিলেন পশুপতি পারস, এলজেপি ভাঙিয়ে চলে এসেছেন, পাসোয়ান ভোট পাবেন। বিজু জনতা দল বা নবীন পট্টনায়ককে চটাতে চান না, তাই জয় পন্ডা বাদ, কিন্তু ওড়িশা পেল রেলমন্ত্রী, মধ্যপ্রদেশের ব্যালেন্সের খেলায় মন্ত্রী হলেন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। উত্তর প্রদেশ নিয়ে মাথাব্যাথা কমছে না, অবাক হব না, যদি ক’দিন পরেই আরও এক আধটা মন্ত্রী ওখান থেকে আসে, আপাতত সাতজন, তারমধ্যে মাত্র একজন উচ্চবর্ণ, বাকি সবই ওবিসি বা অতি দলিত, উত্তর প্রদেশের কুরমি ভোটারদের জন্য অপনা দলের অনুপ্রিয়া প্যাটেলকে মন্ত্রী করা হল, মোদিজির ক্যাবিনেটে আপাতত ২৭ জন ওবিসি, ১২ জন তপসিলি, ৮ জন উপজাতিভুক্ত মন্ত্রী, উদ্দেশ্য পরিস্কার, উন্নয়ন, নয় দেশ নয়, দেশের মানুষ নয় লক্ষ্য ২০২৪, আবার গদি চাই।
এবার দেখুন বাংলার দিকে। এবারে হাফ, পরের বারে সাফ ইত্যাদি বলার পর মোদি – শাহ বুঝে গেছেন, যে কোনও জিগির তুলে, যে কোনও ভাবে গোটা ৪/৫/৬ টা আসন বাংলা থেকে পেতেই হবে, তার বেশি জুটবে না। তাই টার্গেট উত্তরবঙ্গ, টার্গেট, মতুয়া ভোট, টার্গেট বাঁকুড়া। যারা ক’দিন আগেই আলাদা উত্তরবঙ্গ রাজ্যের কথা বলছিল, তাঁদের দু’জনেই মন্ত্রী, তপসিলি জাতির ভোট, মতুয়া ভোট মাথায় রেখে শান্তনু ঠাকুর আর বাঁকুড়ার সুভাষ সরকার। মেসেজ খুব পরিস্কার। যেখানে হেরেছি, সেখানে ভেবে লাভ নেই, আসানসোল হেরেছে, বাবুল সুপ্রিয় নিজেই হেরেছেন, কাজেই ঘাড়ধাক্কা, হুগলি গেছে, কাজেই লকেটের নাম কাটা, রায়গঞ্জ গেছে, কাজেই দেবশ্রী চৌধুরি পদত্যাগ করো। মন্ত্রী হিসেবে পারফরম্যান্স নয়, ২০২৪ এ আসন কোথা থেকে আসবে, কারা দেবে ভোট, সেই হিসেব নিকেশ করার পরেই মন্ত্রীসভার রদবদল হল, নরেন্দ্র মোদির পাখির চোখ, ২০২৪ নির্বাচন।