ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে, ফাঁদ বসাইছে ফান্দি রে ভাই পুঁটি মাছো দিয়া, ওরে মাছের লোভে বোকা বগা পড়ে উড়াল দিয়া রে, ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে। পুরনো গান। মানে পুঁটি মাছ দিয়ে ফাঁদ পাতা হয়েছিল, সেই মাছ খেতে এসে ফাঁদে পড়ে বক কাঁদছে। হয়, এমনটা হয়। রাজনীতিতে তো আকছার হয়। নাথিং ইজ ট্রু ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার অ্যান্ড পলিটিক্স। কংগ্রেসি সরকারের গুলিতে মৃত শহীদ বেদির পাশে দাঁড়িয়ে অধীর সেলিম আব্বাস জুটিকে আমরা তো দেখেছি, বক্তৃতাও শুনেছি। রাজনীতিতে চিরকালীন শত্রু বলে কিছুই হয় না, বিশেষ করে ওই ফান্দে পড়লে। বিজেপির এখন সেই দশা। নৌকা ডুবছে টের পেয়েই রিপেয়ারিং-এর কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। কুস্তিগিরদের যৌন নির্যাতনের বিষয়টা বড্ড বাজে হ্যান্ডল হয়েছে, হ্যাঁ এটা বুঝেছে বিজেপি, টের পেয়েছে কবে? ওই যেদিন হরিদ্বারের জলে পদক ভাসানোর কথা হল, সেদিনই। সকাল থেকে প্ল্যান বি, প্ল্যান সি, প্ল্যান ডি, হাজার ফোনাফুনি, এবং ছুপা রুস্তমদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলা হয়েছে সামলান, সামলান। সেদিকে কাজ চলছে। ওধারে মণিপুর জ্বলছে, মুখ্যমন্ত্রীকে ছেড়েই দিন, জেড প্লাস ক্যাটাগরি সুরক্ষা নিয়েও ছোটা মোটা ভাই মণিপুরের বহু এলাকায় যেতেই পারলেন না। ওখানেও সামাল সামাল রব, সম্ভবত মুখ্যমন্ত্রীকেই বলি দিতে হবে, কারণ কুকি উপজাতি মানুষদের বেশিরভাগই খ্রিস্টান, তাঁদের চার্চ ভাঙা হয়েছে, তাঁরা বাড়িছাড়া হয়েছেন আর পাশেই খ্রিস্টান অধ্যুষিত মিজোরাম, ক’মাস পরেই সেখানে ভোট। এখনই সামলাতে না পারলে মিজোরাম হাত থেকে যাবে।
ওদিকে রাজস্থানে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া, তাঁকে নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠক, কিন্তু কোনও রফাসূত্র এখনও নেই। ছত্তিশগড়ে রমণ সিংয়ের চোখ মুখ্যমন্ত্রিত্বের আসনের দিকে, সেখানেও সমস্যা। মধ্যপ্রদেশে মামাজি আর মহারাজার লড়াই। মানুষে বলছে মধ্যপ্রদেশে বিজেপি তিন প্রকার, শিবরাজ, রাজ আর নারাজ। রাজ ঘরানার জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, শিবরাজ সিং চৌহান-এর মধ্যে ঘমাসান লড়াই চলছে। এবং তেলঙ্গানায় শ্যাম রাখি না কূল রাখি, এই চিন্তায় বিজেপি অস্থির। কংগ্রেস থেকে আনা রাজ্য সভাপতির বিরুদ্ধে বাগী দলের পুরনো নেতা কর্মকর্তারা। খানিক দিলু ঘোষ আর শুভেন্দুর লড়াইয়ের মতো। এবং ওখানে একটা রিজিওনাল দলকে পেতেই হবে, না হলে সাকুল্যে ৭-৮ কি ৯টা আসনের বেশি পাওয়া যাবে না, এটা বিজেপি জানে।। এবার সমস্যা হল চন্দ্রবাবু নাইডু তো রাজি, যিনি এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন বহু আগে, তিনি এখন তাঁর অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্যই বিজেপির হাত ধরতে রাজি, কিন্তু ওনার হাত ধরলে বিজেপির দুটো সমস্যা হবেই। প্রথম কথা হল উনি পৃথক তেলঙ্গানা রাজ্যের বিরোধিতা করেছেন শুরু থেকেই, কাজেই ওনার হাত ধরে তেলঙ্গানায় কতটা লাভ হবে তা জানা নেই। দ্বিতীয় সমস্যা হল, বিজেপি চন্দ্রবাবু নাইডুর হাত ধরলে, ওয়াই এস আর রেড্ডি রেগেমেগে যদি কংগ্রেসি জোটে চলে যায়, তাহলে ভারি বিপদ। আবার এতটা কথা এগিয়ে এখন চন্দ্রবাবু নাইডুকে ফিরিয়ে দিলে চন্দ্রবাবু কংগ্রেসের হাত যে ধরবেন না, অন্তত বিজেপি বিরোধী শিবিরে যে যোগ দেবেন না, তারই বা গ্যারান্টি কোথায়? দলবদল, কথা বদলে অভ্যস্ত এই ধুরন্ধর নেতা জল মাপছেন, হয়তো ২৩ তারিখ পাটনায় গিয়ে হাজির হবেন, কিচ্ছু বলা যায় না। সব মিলিয়ে অবস্থা গোলমেলে। এবং গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ২০২৪ এর নির্বাচন। সামনে চার রাজ্যে হার মানেই যে লোকসভার ভোটেও এরকমই ভোট দেবেন মানুষ, তা হয়তো নয়। কিন্তু মোদিজির ক্যারিশমা আর অমিত শাহের চাণক্যগিরিতে গ্যামাক্সিন ছেটানো হবে, প্রশ্ন উঠতে শুরু করেই দিয়েছে, সে প্রশ্ন তখন ঝড় হয়ে উঠবে। মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায় স্লোগান নিয়ে তামাশা হবে। এখানে সেখানে বাগী নেতারা মুখ খুলবেন। এবং এই চার রাজ্যেই হারলে ২০২৪-এ বিজেপি ২৭২-এর ম্যাজিক ফিগার তো ছেড়েই দিন, ২৩০-২৪০ এর মধ্যে থেকে যেতে হবে। জোড়া তালি দিয়ে সরকার তৈরি হলেও, সে নড়বড়ে সরকারের সিংহাসনে বসে সুখ পাবেন না মোদিজি। এই যে দুধুভাতু মন্ত্রিসভা চালানো, উনিই রেলমন্ত্রী, উনিই বিদেশমন্ত্রী, উনিই স্বাস্থ্যমন্ত্রী, এই মন্ত্রী মন্ত্রী খেলাটা বন্ধ হবে। ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স লেলিয়ে দেওয়ার খেলাটাও জমবে না। হিন্দুত্ব আবার চলে যাবে পিছনের সারিতে। এবং এটাই সেই ক্যাচ টোয়েন্টি টু সিচুয়েশন যেখানে ফান্দে পড়িয়া বিজেপি কান্দে।
২০১৪-তে ২৮২টা আসন পাওয়ার পরেই শুরু হয়েছিল, ২০১৯ এর পরে তো মোদিজি অমিত শাহ বা বিজেপি কর্তারা হাবেভাবে হয় এনডিএ শরিকদের সরাসরিই জানিয়ে দিয়েছিলেন, আমাদের নির্দেশেই চলতে হবে, না হলে কেটে পড়ুন এবং বিজেপি খুব সন্তর্পণে ছোট শরিক দলগুলোকে ভেঙে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে নেওয়া শুরু করে দেয় ওই ২০১৭-২০১৮ থেকেই। টিডিপি থেকে বিজেডি, ডিএমকে থেকে অকালি দল, শিবসেনা, শেষমেশ নীতীশ কুমারের জেডিইউ-ও এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। এবং যখন বেরিয়েছে, তখন তাদের সঙ্গে মিটমাট করে নেওয়ার কোনও চেষ্টাও হয়নি। কিন্তু এখন ছবি পাল্টেছে, শিবসেনা থেকে বেরিয়ে আসা একজনকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব দিয়ে নিজের দলের নেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ এখন উপমুখ্যমন্ত্রী, কেবল তাই নয় মাত্র কিছুদিন আগে মহারাষ্ট্রে দলের বৈঠকে দেবেন্দ্র ফড়নবিশের ঘনিষ্ঠ একজন নেতা শিন্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়েছিলেন, অমিত শাহ তাঁকে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। মেসেজ লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার, শরিক দলের বিরুদ্ধে আপাতত কোনও কথা নয়।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন, মোদি শাহ সামলাতে পারবেন?
এবং এখানেই শেষ নয়, এবার পুরনো ছেড়ে যাওয়া শরিক দলগুলোকেও টার্গেট করা হচ্ছে, সেই পুরানা রিস্তাকে আবার নতুন করে জুড়ে নেওয়ার চেষ্টাও চলছে। দূত গেছে অকালি দলের কাছে, যদি অন্যরকম কিছু না হয় তাহলে ক’দিনের মধ্যেই সেই ঘোষণা হবে। কথ চলছে চিরাগ পাসোয়ানের সঙ্গেও। এবং আসরে নেমেই পড়েছেন হারদানাহাল্লি দদ্দেগৌড়া দেবেগৌড়া। জ্যোতি বসু এঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন প্রধানমন্ত্রিত্ব পদের জন্য, পাকেচক্রে ইনি প্রধানমন্ত্রী হয়েওছিলেন। অমন নড়বড়ে প্রধানমন্ত্রী আমরা তার আগে বা পরে দেখিনি, সেই তিনি আপাতত দক্ষিণে, অন্তত কর্নাটকে বিজেপির ভরসা। বিজেপি বুঝেই গিয়েছে গতবারের ২৮-এ ২৫ সম্ভব নয়, কাজেই এই দেবেগৌড়ার দলকে জুড়ে ভোক্কালিগাদের সমর্থন পেলে মুখরক্ষা হবে। কিন্তু সময় বুঝে মানে ঝোপ বুঝে কোপ মারার চেষ্টা করছেন এই দক্ষিণী নেতা, আপাতত একজনই সাংসদ আছে ওঁদের মানে জেডিএস-এর, চেয়েছেন ৪টে আসন। বিজেপি নিমরাজি হয়ে তিনটে দিতে রাজি, কিন্তু এখনও কথা চলছে। মজার কথা হল এই ক’দিন আগেই এই দেবেগৌড়া আর জেডিএস নিয়ে মোদিজি কী বলেছিলেন দেখুন। ভিডিও- https://youtu.be/dix9odUNdDE (১.০৭ – ২.০৫) https://www.youtube.com/live/f6QSSXYt0LQ?feature=share (২০.৩৫ – ২১.০০ ) প্রত্যেকটা ভাষণে যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হল, জেডিএস এক প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, এক ডাইনাস্ট রুল্ড পার্টি, বাবা, ছেলে, ভাই, বউ, আত্মীয়স্বজন নিয়েই এই দল চলে। এঁরা কর্নাটক বা কর্নাটকের মানুষের ভবিষ্যৎ নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েই চিন্তিত। মাসখানেক পরেই সেই মোদিজি এবং দেবেগৌড়া পাশাপাশি বসে ফটো তোলাচ্ছেন, ওই যে, ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে।
কেরলে বিজেপি কিছু ছোট দলের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছে। তামিলনাড়ুতেও এআইডিএমকে ছাড়াও কিছু ছোট দলকে সঙ্গে নিয়েছে। দক্ষিণ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ উত্তরে বিজেপির আসন কমবে, বেশিরভাগ রাজ্যেই বিজেপি এতগুলো আসন জিতেছিল, যার থেকে বেশি আসন জেতাই সম্ভব নয়। গুজরাত, রাজস্থান, এমপি, এসব জায়গায় ২০১৯-এ ক্লিন সুইপ ছিল। কিন্তু এবারে সেই ভাঁড়ারে টান পড়েছে। বাংলায় ১৮টা আসন, বাদই দিন, এই পঞ্চায়েত ভোটের রেজাল্ট বের হওয়ার পরেই বুঝবেন ৪-৫টা আসন পেলেও অনেক পাওয়া হবে। বিহারে অবস্থা আরও খারাপ, সেখানে রাজনৈতিক জোট ছেড়েই দিন, সামাজিক যে জোট তৈরি হয়েছে, তাতে, যাদব, কুড়মি, দলিত, মুসলমানদের এক ভোটব্যাঙ্ক এখন বিজেপির বিরুদ্ধে, যা রাজ্যের ৭৩ শতাংশ মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করে, কাজেই ওখানেও খুব খারাপ অবস্থা। মহারাষ্ট্রেও তথৈবচ, শিন্ডে বেশি আসন চাইলে জোট কীভাবে বাঁচানো হবে সেই চিন্তাই কুরে খাচ্ছে মহারাষ্ট্র রাজ্য বিজেপিকে।
কাজেই এই বিরাট ক্ষতি বিজেপিকে সামলাতে হলে দক্ষিণে মিরাকল করতে হবে, না হলে ঝোলা নিয়ে হাঁটা দিতে হবে আমাদের ফকিরকে। সেই মিরাকল কি সম্ভব? অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, কেরালা ইত্যাদি নিয়ে ১৩৩টা আসন আছে, এর মধ্যে ৩০টা আসন পেয়েছিল বিজেপি, সেই ৩০-এর ২৫টাই এসেছিল কর্নাটক থেকে। সেখানেই বিপর্যয়, কাজেই সংখ্যার হিসেবে বিজেপি তল খুঁজে পাচ্ছে না। ফাঁদে পড়েছে, সেই ফান্দে পড়িয়াই বগা কাঁদছে।