কলকাতা রবিবার, ০১ অগাস্ট ২০২১, ০৮:৪২ ( AM )
একুশে ফেব্রুয়ারি ও বাঙালীর আত্ম অধিকারের লড়াই
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১, ০৬:১৬:৩৭ এম
  • / ১৯১ বার খবরটি পড়া হয়েছে

পৃথিবীর বুকে ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে, অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার ইতিহাস সৃষ্টিকারী জাতি কেবলমাত্র বাঙালি। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালির চেতনার প্রতীক। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর, আউয়াল, অহিউল্লাহর রক্তে রাঙানো অমর একুশে বাঙালির পথের দিশা, প্রাণের স্পন্দন।

ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের সংগ্রামের সূচনা ঘটে এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি পায়। বিশ্বের সকল জাতিসত্তার ভাষা রক্ষার দিন হিসেবে জাতিসঙ্ঘ বেছে নিয়েছে বাঙালি জাতির ভাষার জন্য লড়াইয়ের  দিন ২১ ফেব্রুয়ারিকে। জাতিসঙ্ঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ৩০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজ বাংলাদেশের পাশাপাশি ইউনেস্কোর ১৯৫টি সদস্য এবং ৯টি সহযোগী সদস্য রাষ্ট্রের ছয় হাজার ৯০৯টি ভাষাভাষী মানুষ পালন করে এই দিবস। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্য সাধারণ অর্জন। কিন্তু কিভাবে এই ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা জানতে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ৭৪ বছরের পেছনের ইতিহাসে। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে রয়েছে  অনেক সংগ্রামের ইতিহাস।

১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছিল তার আগেই আসলে শুরু হয়েছিল ভাষা নিয়ে বিতর্ক। দেশভাগের আগেই চল্লিশের দশকের শুরুতেই সাহিত্যিকরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। সেসময় বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের মধ্যে বাংলা, ঊর্দু, আরবি ও ইংরেজি এই চারটি ভাষার পক্ষ-বিপক্ষে নানান মত ছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন নিশ্চিত হওয়ার পর ঊর্দু-বাংলা বিতর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেসময়কার গুরুত্বপূর্ণ ‘মিল্লাত’ পত্রিকায় এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, ‘মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য কোন ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে বরণ করার চাইতে বড় দাসত্ব আর কিছু থাকিতে পারে না।’ ধীরে ধীরে অর্থনীতি ও রাজনীতিও সেই বিতর্কের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে দৈনিক আজাদি পত্রিকায় লেখক সাংবাদিক আবদুল হক লিখেছিলেন, ‘ঊর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকটি ঊর্দু-শিক্ষিতই চাকুরীর যোগ্যতা লাভ করবেন, এবং প্রত্যেকটি বাংলা ভাষীই চাকুরীর অনুপযুক্ত হয়ে পড়বেন।’ বাংলাভাষীদের আরও উদ্বেগ ছিল দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের মানুষের সাংস্কৃতিক পার্থক্য নিয়ে। শুধু ধর্ম তাদের মধ্যে কতটুক যোগসূত্র স্থাপন করতে পারবে তা নিয়ে ভাবনা ছিল অনেকের। ১৯৪৭ সালে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমেদ ঊর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেছিলেন। তখন ভাষা নিয়ে বিতর্ক আবারও জেগে উঠেছিলো। ততদিনে মুসলিম বাঙালীদের আত্ম-অন্বেষণ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রথম মুদ্রা, ডাকটিকেট, ট্রেনের টিকেট, পোস্টকার্ড ইত্যাদি থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে ঊর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এই ঘোষণায় পর ঢাকায় ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনের বাঙালী কর্মকর্তারা সরকারি কাজে বাংলা ভাষার প্রয়োগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছিলেন। পাকিস্তান গঠনের সময় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী, পরবর্তীতে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৪৮ সালে আইন পরিষদের অধিবেশনে বলেছিলেন, ভাষা সম্পর্কিত বিতর্ক শুরু হওয়ার আগেই এসব ছাপা হয়ে গেছে। যদিও তার এই বক্তব্য সবাই গ্রহণ করেনি। সেসময় বুদ্ধিজীবীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে মাতৃভাষার পরিবর্তে ঊর্দু চাপিয়ে দিলে বাংলাভাষী পরবর্তী প্রজন্ম অশিক্ষিত হয়ে পড়বে, বাংলা ভাষার সত্ত্বা ঝুঁকিতে পরবে। স্বাধীনভাবে মাতৃভাষার চর্চার ক্ষেত্রে এটিকে বড় আঘাত বলে মনে করা হয়েছে। এসব বিষয়ে বাঙালির মনে ক্ষোভের অনুভূতি তখন থেকেই দানা বাঁধতে থাকে। সেই সালেই শেষের দিকে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। সেই সময়কার একটি ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের নূরুল হক ভূঁইয়া, তৎকালীন সংসদ সদস্য সামসুল হক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের প্রতিষ্ঠাতা অলি আহাদ, পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ তোয়াহা সহ অনেকেই এর সদস্য ছিলেন যারা শুরুতে গোপনে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাভাষীরা ঊর্দুভাষীদের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। তারপরও ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে রেসকোর্স ময়দানে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ এক সমাবেশে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে ‘ঊর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’।

সেই সমাবেশেই উপস্থিত অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ওঠেন। এই ঘোষণাকে বলা যেতে পারে নতুন রাষ্ট্র সম্পর্কে বাঙালীর স্বপ্নভঙ্গের সূচনা। জিন্নাহ ঊর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে শুরু থেকে অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ঊর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পেছনে বাঙালীদের ওপর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভুত্ব কায়েম করা ও শোষণের অভিসন্ধি বলে মনে করা হয়েছিল। বাঙালীদের মনে পাকিস্তানের প্রতি অবিশ্বাসের ভিত তৈরি হয়েছিল। ভাষা ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য আরও জোরালোভাবে প্রতীয়মান হচ্ছিল। ধর্ম নয় বরং বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধারনা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। অন্যদিকে তখনকার ঊর্দুভাষীরা বাঙালীর সংস্কৃতিকে ‘হিন্দুয়ানী’ বলে মনে করাটা বাংলা ভাষার প্রতি তাদের বিতৃষ্ণার আরেকটি কারণ। জিন্নাহ’র মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে নানা রকম প্রস্তাব, পাল্টা প্রস্তাব চলতে থাকে। দেশভাগের পর থেকে ১৯৫২ সালের শুরু পর্যন্ত বাঙালীরা জোরালোভাবে রাষ্ট্রভাষা ঊর্দু সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধ মনোভাব ব্যক্ত করে গেছেন। প্রতিক্রিয়া হিসেবে থেমে থেমে আন্দোলন চলেছে। তবে এই আন্দোলনে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অগ্নি স্ফুলিঙ্গের জন্ম হয় যখন ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের অ্যাসেম্বলিতে ঊর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পূর্ব-বঙ্গের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় সফরে এসে খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টনে এক সমাবেশে জিন্নাহ’র কথাই পুনরাবৃত্তি করেন। সেসময়ও একইভাবে জোরালো প্রতিবাদে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান ওঠে। বলা হয়ে থাকে রাজনৈতিক কারণে নেওয়া খাজা নাজিমুদ্দিনের অবস্থান ও তার বক্তব্য ভাষা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তার ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মনে বঞ্চনার অনুভূতি আরও জোরালো হয়ে জেগে ওঠে। খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে পরদিন থেকে পূর্ব-পাকিস্তানে শুরু হয় স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল। যাতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ভাসানীর নেতৃত্বে সম্মেলনে অংশ নেন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং পেশাজীবী সম্প্রদায়ের মানুষজন। ২১শে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়েছিল। ধর্মঘট প্রতিহত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিলো। যা লঙ্ঘন করেই জন্ম হয়েছিল শহিদ দিবসের। ভাষা আন্দোলনে কতজন শহিদ হয়েছিলেন সে বিষয়ে সঠিক সংখ্যা এখনো পাওয়া যায় না। সেদিন এবং পরদিন পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং শফিউর ছাড়াও আরও অনেকে শহিদ হয়েছিলেন বলে ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন বইয়ে উঠে এসেছে। এই হত্যাকাণ্ড মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দমিয়ে দেয়নি। এই আন্দোলনেই পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল যে দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের অধিবাসীদের মনে এক হওয়ার অনুভূতি সম্ভবত জাগ্রত হবে না। তবে এই ঘটনার পরও দুই বছরের বেশি সময় পরে, ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান সংসদ বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে প্রস্তাব গ্রহণ করে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি কার্যকর হতে লেগেছিল আরও দুই বছর। মাতৃভাষা নিয়ে এই আন্দোলনেই বীজ বপন হয়েছিল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের।

আর্কাইভ

এই মুহূর্তে

ইস্তফার পর তৃতীয়বার পোস্ট এডিট, দাড়ি টানলেন ‘দলবদলের’ জল্পনায়
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১
গাড়িতে ভুয়ো মানবাধিকার কমিশনের স্টিকার, গ্রেফতার ৩
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১
বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে নির্যাতনের শিকার মহিলা
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১
বিজেপি শাসিত তিন রাজ্যই সংক্রমনের শীর্ষে, জানাল আইসিএমআর
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১
তুমি আছো বলে মন কষাকষি…
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১
সিবিআই তদন্তকে সন্দেহ করা অযৌক্তিক, উন্নাও কান্ডে সাফ জবাব আদালতের
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১
জাগো বাংলায় কলম ধরার জন্য অজন্তাকে শো-কজ সিপিএমের
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১
বন্ধু চল
রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১
বিষ মদ খেয়ে মারা গিয়েছিল ১৭৩ জন, দোষী সাব্যস্ত খোঁড়া বাদশা
শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
বনগাঁয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সাংগঠিক সভায় গরহাজির তিন বিধায়ক, অস্বস্তিতে বিজেপি
শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
গোরস্থানে আক্রান্ত পুলিশ
শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
শুরু হল ‘উৎসশ্রী’ প্রকল্পের পথ চলা, দেখে নিন আবেদনের খুঁটিনাটি
শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
বিক্ষুব্ধ বাবুলকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তৃণমূল
শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
অনলাইন গেমে বরবাদ ৪০ হাজার টাকা, মায়ের বকা খেয়ে আত্মঘাতী কিশোর
শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
ফেসবুক পোস্টে ‘অভিমানী’ বাবুল গৌরীপ্রসন্ন, হেমন্তেই ভরসা
শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
© R.P. Techvision India Pvt Ltd, All rights reserved.
Developed By KolkataTV Team