পার্শ্বচরিত্র কিনা অক্ষত রেখে দিলেন বিশ্বজয়ের তাজ

0
25

গৌতম ভট্টাচার্য: ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্র আপলোড করছি। আন্দাজ করছি শশী থারুরের এক্সে পোস্ট এল বলে। অবিরাম চাপ আর সংশয়ের মুখে তাঁর ভূমিপুত্র সঞ্জু স্যামসনের জন্য ভারত জুড়ে ওকালতি করে গিয়েছেন থারুর। আজ তাঁদের দুই মালয়ালির দিন! এই অপরাজিত ৯৭ স্যামসনের কোহলিয়ানা! যখন ফিরছেন গ্যালারি গাইছে ‘বন্দে মাতরম’। কখনও এমন ইডেন দেখিনি।

গোপাল বসু বেঁচে থাকলে নির্ঘাত বলতেন, ছেলেটা তো ইন্ডিয়ান টিমের উত্তম-সৌমিত্র-প্রসেনজিৎ-দেব কিছুই না। অনুপকুমার। যাকে তোরা কেউ পাত্তা দিসনি। হিসেবের মধ্যে রাখিসনি। সেই দ্যাখ ছবিটা টেনে নিয়ে চলে গ্যাল।

ভারতকে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে তুলে দেওয়া বলে শুধু নয়। ইডেনের শ্রেষ্ঠ টিটোয়েন্টি ম্যাচগুলোর মধ্যে পড়বে। যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা শুধু বিগ হিটিং নয়। তাঁদের পেশী ক্ষমতা আর প্রখর ক্রিকেট বুদ্ধির চিপ নিয়েও এসেছিল। গুরুত্বপূর্ণ টস হারায় অপেক্ষাকৃত কঠিন সময়ে তাদের বল করতে হয়। যখন শিশির পড়ছে এবং উইকেট সামান্য ভালো। তবু ব্যাটসম্যান পিছু প্ল্যানিং। স্লোয়ার বলের ক্রমাগত ব্যবহার। এবং ১৯৫ রানের চাপ নিয়ে তারা প্রায় বিশ্বকাপের তাজ আজ কোয়ার্টার ফাইনালেই ছিনিয়ে নিচ্ছিল। সনজু উদ্ধার করলেন বিপন্ন ভারতকে। অনন্ত চাপের মুখে ব্যাটে তিনি। বোলিংয়ে বুমরা। এঁরাই ইডেনের ভারতীয় তাজ।

রোববার দুপুরে ফিরি। দ্বাপর যুগের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে যিনি হল-গ্রিফিথের বিরুদ্ধে লাঞ্চের আগে অসমসাহসী টেস্ট সেঞ্চুরি করে ফেলছিলেন সেই ফারুখ ইঞ্জিনিয়ারের মেসেজ দেখে মনে হল বেশ ভয় পেয়েছেন। লিখলেন দুবাই এয়ারপোর্টের কাছে মেয়ের বাড়িতে বসে দেখছি ছাদের ওপর থেকে ক্রমাগত প্রচন্ড আওয়াজ আর আলোর ঝলকানি। ওরা বলছে কখনও ড্রোন পড়ছে আর কখনও ইরানিয়ান ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে আক্রমণ করে নামাচ্ছে আমিরশাহি এয়ারফোর্স। না থেমে ব্যাপারটা ঘটে চলেছে।

আরও পড়ুন: সঞ্জু-ঝড়ে তছনছ ওয়েস্ট ইন্ডিজ! ইডেন জয় করে বিশ্বকাপ সেমিতে ভারত

দুবাইতে আইসিসির হেডকোয়ার্টার। আইসিসির কিছু কর্তাব্যক্তিকেও দেখা গেল নিরন্তর দুবাইতে ফোন করে করে পরিবারকে বলছেন কিছুতেই বাইরে বেরিও না। গোটা পৃথিবীর মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটমহলেও ধারাবাহিক আশংকা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে না তো ? মুসলিম পৃথিবী যেভাবে জড়িয়ে পড়ছে। করাচির মতো ভিন্ন ভিন্ন মুসলিম শহরে যেমন প্রতিক্রিয়া। তাতে ভারতও কি আগামী ক’দিনে প্রকারান্তরে জড়িয়ে পড়তে পারে? এশিয়ায় যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে এশিয়াতেই বিশ্বকাপ এমন ঘটনা নজিরবিহীন। ইডেনে অঘোষিত বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের পেছনে কালো পর্দার মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল ইরান বনাম ইজরায়েল ও আমেরিকা। বললাম না নজিরবিহীন!

ইডেনেও কি নজিরবিহীন কিছু ঘটবে? ওয়েস্ট ইন্ডিজ চূড়ান্ত কোণঠাসা হতে হতেও অপূর্ব আত্মরক্ষায় যেভাবে ১৯৪ তুলে ফেলেছিল তাতে মাঠে শোকের আগাম আস্তরণ ছড়িয়ে যায়। এমন ম্যাচ যে পা হড়কালেই বাইরে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দারুণ খেলে শুধুই বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের মোর থেকে ফেরত যাবে। আর ভারত কিনা বার্বেডোজের বিশ্বজয়ের তাজ হারাবে ইডেনে। মুম্বই থেকে ইনিংস বিরতিতে এক বন্ধু ফোন করলেন। ইডেন সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড দেখেছেন ? ১৫৮। বুঝলাম স্ট্যাটসেই বক্তব্য আছে। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১৭৩। এর পরেই থাকবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৬১ চেজ।

টিভি নয়। তিনটে ম্যাচই মাঠে বসে দেখা। তাই জানি যে কমন ফ্যাক্টর যিনি ছিলেন আপাতত ভারতীয় ক্রিকেটের অন্দরমহল সম্পর্কে তিক্ত তিনি নির্ঘাত লন্ডনের বাড়িতে বসে ম্যাচ দেখছেন।দুটো ম্যাচে চেজ সম্ভব হয় তাঁর জন্য। আর ইডেনেরটায় রোহিত শর্মা করেছিলেন ১৭ বলে ৪০। দুজনই নেই। অভিষেক শর্মা বিস্বকাপের চাপ না নিতে পেরে দুটো ক্যাচ ছেড়েছেন। দ্বিপাক্ষিকে রান করা আর ফুটন্ত ইডেন গ্যালারির সামনে পরীক্ষা দিয়ে পারফর্ম করা দুই পৃথিবী। টেকনিক নয় এই ম্যাচ অভিষেকের নার্ভ নিয়ে দুঃখজনক প্রশ্ন তুলল।

একমাত্র কেকেআর কোচ অভিষেক নায়ারকে জয় নিয়ে নিশ্চিন্ত দেখিয়েছিল। ইডেন পূর্বাভাসের পর তিনি সফল ক্রিকেট জ্যোতিষী হিসেবে গণ্য হবেন। ব্রেক বলছিলেন ,ভারত জিতবে তো বটেই। এক ওভার বাকি থাকতে না জেতে।

ভারতীয় বোলিং নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল ,রিচি বেনোর কাছে একদা নিজের ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন কলিন কাউড্রি। ছেলের ক্রিকেটীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে কী অভিনবত্ব আমদানি করা যায় তার খোঁজে। ক্রিস কাউড্রি পরবর্তীকালে বাবার ধারেকাছে না যেতে পারলেও স্বল্পকালীন ভিত্তিতে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হয়েছিলেন। গ্ল্যামারগনের হয়েও ভাল খেলেছেন। বেনোর পরামর্শের কথা কিন্তু তিনি একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। বলেছেন ,উঠতি ক্রিকেটাররা মনে রেখো এটা মডেল টিপস।

বেনো বলেছিলেন , ক্রিস প্রত্যেকটা কাউন্টি সিজনে যখন আসবে একটা নতুন অস্ত্র নিয়ে আসবে। মনে রাখবে আগের বার কী কী করেছ সবকটা টিম দেখে নিয়েছে।

ডেটা এনালিসিসের আধুনিক যুগে বেনোর পরামর্শের দাম পুরোনো দিনের মুদির দোকানের মতো। ক্রিকেট প্রস্তুতিতে প্লাবন এনে দিয়েছে ডেটা এনালিসিস। এত নিখুঁত ভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ এখন বিশ্লেষিত হয় যে প্লেয়ারকে একটা সিজনে দু’তিনবার করে নিজের চিন্তন বদলাতে হয়। স্কিলে পরিমার্জন আনতে হয়। দুটো ম্যাচ খেলে উঠেই সে সময় সময় আবিষ্কার করে আটকে গিয়েছে। অপোনেন্ট ধরে ফেলেছে। কত নমুনা চাই ? বাবর আজম। সূর্যকুমার যাদব। অভিষেক শর্মা। আর লেটেস্ট কেস ছিল বরুণ চক্রবর্তী।

কলকাতা যেমন গৌতম গম্ভীরের। তেমন বরুণ চক্রবর্তীর। এ মাঠের কেকেআর তাঁকে প্রতিষ্ঠা ছাড়াও ডিজিটাল যুগের ভগবৎ চন্দ্রশেখরের মর্যাদা দিয়েছে। যার ওপর স্বীকৃতির অশোকস্তম্ভ ছাপ দিয়েছে ভারত। ভারতের হয়ে ৪২ ম্যাচে তাঁর গড় ১৫। ইকনমি সাতের ওপর। ওটা আড়াই মাস আগে অনেক সম্ভ্রান্ত ছিল। এই আড়াই মাসে কুড়িটা ছক্কা হয়েছে তাঁর বলে। তার চেয়েও ভয়ের এই ২০ -র ১৫টা মারা হয়েছে ফ্রন্টফুটে। সুইপ না করে। স্টেপ আউট না করে। দক্ষিণ আফ্রিকানরা তাদের আইটি স্পেশালিস্টের ইনপুট অনুযায়ী তাঁকে অফস্পিনার হিসেবে খেলা শুরু করে। ধরে নেয় প্রত্যেকটা বল গুগলি। আর সেই অনুযায়ী আড়া খেলে। চব্বিশের বিশ্বকাপ পরবর্তী সময়ে এত ভাল বল করেছেন এবং তার পর থেকে নাগাড়ে করেই যাচ্ছেন যে পাওয়ার প্লে-র শেষ ওভারটা তিনি করবেন এটাই ছিল দস্তুর। এদিন উইকেট পড়ছে না। পঞ্চম ওভারে বুমরার বলে সহজ ক্যাচ পড়ল দেখেও বরুণকে তাঁর ফেভারিট সারফেসে আনা হল না।

এসেও মার খেলেন। প্রথম ওভারে উইকেট তুললে কী হবে। একমাত্র ডেটা বিশ্লেষণেও যাঁকে আটকানো যাচ্ছেনা তিনি জসপ্রিত বুমরা। বলার সময় এসেছে যে লাল ও সাদা বল মিলে তিনি ভারতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ।

ম্যাচটা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দিনের শেষে হারিয়ে দিলেন তার অধিনায়ক। সে হোপের মতো ২০১৬ সেমি ফাইনালে স্লো খেলেছিলেন অজিঙ্ক রাহানে। দুটোই যার যার টিমের জন্য আত্মঘাতী ইনিংস।স্কোরবোর্ড খুলে দেখুন।

এখন অবশ্য গলা খুলে বন্দেমাতরম গাইবার সময়। স্কোরবোর্ড তোমায় কাল দেখে নেবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here