হাল ফিরতে চলেছে স্যার স্টুয়ার্ট হগ মার্কেট বা নিউ মার্কেটের। জটিল এই স্থাপত্যের সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ শুরু করলো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ ও স্থাপত্য বিভাগের বিশেষজ্ঞরা।
বাংলার অন্যতম আকর্ষণ শহর কলকাতা শুধু বাঙালির কাছে নয়, তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশিদের কাছেও অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আর সেই কেন্দ্রবিন্দুর অন্যতম হল ধর্মতলার এস এস হগ মার্কেট বা নিউ মার্কেট। ইংরেজ আমলে দেশি-বিদেশি দ্রব্যের পসরা সাজিয়ে ব্রিটিশ মহিলা-পুরুষদের চাহিদা মেটাতে এখানেই চলত বিকিকিনি। দেশ-বিদেশের নামকরা বস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থার হরেক রকম জামা কাপড় থেকে শুরু করে এ দেশের নামকরা অস্ত্রসম্ভার। বিদেশের নানান ধরনের বিখ্যাত ও সুস্বাদু কেক পেস্ট্রি কুকিজ বিস্কুট থেকে শুরু করে, কালিম্পং বা ব্যান্ডেল চিজের সম্ভার। দেশি বিদেশি ফল চকোলেট এমনকি নানান ধরনের মাংস মাছ পাওয়া যায় এই এস এস হক মার্কেটে।
আরও পড়ুন: বিশ্ব সাইক্লিং ডে: অন্য কলকাতাকে দেখার আশায়
শুধু নানান ধরনের দ্রব্য সামগ্রীর বিকিকিনিই নয়, সুবিশাল এই মার্কেটের স্থাপত্যশৈলীও দেশ বিদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। কালের প্রবাহে ক্রমে গ্রাস করতে শুরু করেছে মায়াময়ী এই নিউমার্কেটকে। ভেঙে পড়েছে নানান ধরনের শিল্পকলা ছাদের প্যারাপেট থেকে শুরু করে দেওয়ালের অংশ, দেওয়ালের গা থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। কিন্তু কালের নিয়মে ও সংস্কারের অভাবে সুন্দরী মায়াবী নিউমার্কেটের ভগ্নদশার কারনে এখন বৃষ্টির সময় ছাদের ফাটল থেকে জল পড়তে শুরু করেছে। যারা নিয়মিত নিউমার্কেট আসেন বা ভিন রাজ্য থেকে বা অন্য দেশ থেকে এই শহরে আসেন তাঁরা একবার হলেও নিউমার্কেটে আসেন স্মৃতি রোমন্থনের পাশাপাশি তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিষ সংগ্রহের নেশায়। তাঁরাও আজ নিউমার্কেটের স্বাস্থ্য সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। তাই এই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে এই মার্কেটের সংস্কারের কাজে উদ্যোগী হয়েছে কলকাতা পুরসভা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও নির্মাণ বিভাগের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হয়েছে এক্সপার্ট কমিটি। আগামী একশো কুড়ি দিন ধরে নিউমার্কেটের পুঙ্খানুপুঙ্খ ক্ষতস্থান পর্যবেক্ষণ করে ক্ষতস্থানগুলি চিহ্নিতকরনের পাশাপাশি কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় এর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করা যায় তারই রূপরেখা তৈরি করে রিপোর্ট জমা দেবে কলকাতা পুরসভায়। ইতিমধ্যেই নিউ মার্কেটের বিভিন্ন অংশের ছবি তোলা এবং কি ধরনের ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করেছে এই এক্সপার্ট কমিটি। ছাদের ওপরের অংশ থেকে শুরু করে ছাদের ভেতরের অংশের ফাটল, লোহার খাঁচা ও কড়িবর্গা বর্তমান অবস্থা সহ একাধিক বিষয় নিয়ে প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরির কাজ চলছে এখন। আগামী ১২০ দিনের মধ্যে এই বিশেষজ্ঞ কমিটির দেওয়া রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরেই কলকাতা পৌরসভার পক্ষ থেকে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করা হবে বলে ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন কলকাতা পুরসভার বর্তমান প্রশাসক মণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ও বাজার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আমিরুদ্দিন ববি।
১৮৭৪ সালের ১ জানুয়ারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্থপতি- ‘রিচার্ড রোসকেল বায়েনের’ নেতৃত্বে, সেসময়কার বিখ্যাত নির্মাণকারী সংস্থা-‘ম্যাকিনটোশ বার্ন’ এই বিল্ডিংটির নির্মাণকার্য সম্পন্ন করে। সেই সময় কলকাতা পুরসভার প্রশাসক পদে ছিলেন ‘স্যার স্টুয়ার্ট হগ’ সাহেব। তাই সে সময় তাঁর নামেই এই মার্কেটের নাম রাখা হয় স্যার স্টুয়ার্ট হগ মার্কেট। বাংলা তথা বাঙালিরা একে ‘হগ সাহেবের বাজার’ বলেই চেনে। বিগত দিনে তিনবার এই বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। প্রথমবার আগুন লাগে ১৩ ডিসেম্বর ১৯৮৫ সালে, দ্বিতীয়বার আগুন লাগে ২০ জুলাই ২০১১ সালে, তৃতীয়বার আগুন লাগে ১৮ মে ২০১৫ সালে।
আরও পড়ুন: বৃষ্টি ভেজা ‘সেক্সি’ উষ্ণতা
এস এস হগ মার্কেটের মালিকানা রয়েছে কলকাতা পুরসভার হাতে। এই মার্কেটে রয়েছে দু’হাজারের কিছু বেশি বিপণন কেন্দ্র। এস এস হগ মার্কেট বা নিউ মার্কেট শুধুমাত্র একটি মার্কেট নয়, শুধুমাত্র ব্রিটিশ স্থাপত্যের নিদর্শন নয়। এই মার্কেট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সহ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নানান ঘটনার সাক্ষ্য বহনকারী নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেশ-বিদেশের অগুনতি প্রেমিক প্রেমিকার প্রেম নিবেদনের স্থান এবং সাক্ষী এই নিউমার্কেট। এই মার্কেটের ইট কাঠ পাথরের গায়ে আটকে আছে নানান ইতিহাসের কথা, নানান ঘটনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মর্মব্যথা।
আগামী দিনে কত দ্রুত ভগ্নপ্রায় অবস্থা সারিয়ে, নতুন সাজে সেজে ওঠে এস এস হগ মার্কেট এখন সেদিকেই তাকিয়ে বিশ্বের মানুষজন।