ওয়েব ডেস্ক: আরও জটিল রূপ নিল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইরানের (Iran) দাবি, হরমুজ প্রণালী (Strait of Harmouz Closed) দিয়ে কোনও জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এই ঘোষণা করার পরই বিশ্ব বাজারে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত ক্রুড তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই ৫০ কিলোমিটার চওড়া সরু জলপথ দিয়েই যাতায়াত করে। অর্থাৎ, প্রতি পাঁচ ব্যারেলের এক ব্যারেল তেল আসে হরমুজ ঘুরে।
সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার ও ইরান—মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলির রফতানির মূল পথ এই প্রণালী। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ তেল যায় এশিয়ার বাজারে, বিশেষত ভারত, চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। ফলে হরমুজ বন্ধ মানেই সরাসরি জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উর্ধ্বগতি।
আরও পড়ুন: সিরিয়ার পতনেই কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ? ইরান–আমেরিকা সংঘাতে ফের ভাইরাল বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণী
ভারতের উপরে কতটা চাপ?
ভারতের তেল আমদানির বড় অংশই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হরমুজ প্রণালী নির্ভর। কেপলার (Kpler)-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৫০ শতাংশই এসেছে এই রুট দিয়ে, যেখানে গত বছরের শেষ দিকে তা ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক আমদানি পৌঁছেছিল ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেলে।
সরকারি সূত্রের খবর, বর্তমানে ভারতের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত মিলিয়ে প্রায় ৭৪ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো তেল রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ হলে বিকল্প জোগান নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
কী কী বিকল্প রয়েছে?
১. সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন (লোহিত সাগর পর্যন্ত)
২. সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আবু ধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন
৩. রাশিয়া থেকে পুনরায় বেশি পরিমাণে তেল আমদানি
৪. আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা (নাইজেরিয়া, আঙ্গোলা)
৫. লাতিন আমেরিকা (ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা)
তবে প্রতিটি বিকল্পেরই সীমাবদ্ধতা আছে। পাইপলাইনের পরিবহন ক্ষমতা সীমিত। রাশিয়া থেকে বেশি তেল কিনলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক চাপের বিষয়টি সামনে আসতে পারে। আবার আমেরিকা বা লাতিন আমেরিকা থেকে তেল আনতে হলে পরিবহন খরচ অনেকটাই বাড়বে।
দেশের অন্দরে কী প্রভাব?
যদি আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুডের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে—
কারণ, জ্বালানির দাম বাড়লে সরবরাহ চক্রের প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়ে যায়।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা
বর্তমানে ভারত-আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে অতীতে মার্কিন চাপের মুখে পড়তে হয়েছে নয়াদিল্লিকে। ফলে এই সঙ্কটে ভারতকে অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকলে তার অভিঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—বিশ্ব অর্থনীতি থেকে ভারতের ঘরোয়া বাজার, সর্বত্রই তার প্রভাব পড়বে। এখন নজর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে—এই অচলাবস্থা কত দ্রুত কাটে, সেটাই নির্ধারণ করবে বিশ্ববাজারের ভবিষ্যৎ।