32.8 C
Kolkata

Fourth Pillar | মুক্তিযুদ্ধে সেদিনের বিশ্বাসঘাতকেরা আজ বাংলাদেশ রাজনীতির মাঝমাঠে

Must Read

ভোট শেষ, মূল প্রতিদ্বন্দী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তথা প্রাক্তন শাসকদল বিএনপির প্রধান তারেক রহমান, দ্বিতীয় জন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কট্টরপন্থী ইসলামি সংগঠন জামাতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান, মাঠে আছে প্রয়াত প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুসেন মহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি, গোটা চারেক বামপন্থী দল আর ‘চরমোনাইর পীর’ নামে খ্যাত সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের ইসলামি আন্দোলন, আছেন বেশ কিছু নির্দিওল প্রার্থীও। কিন্তু মূল লড়াই বিএনপি জোট আর জামাতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটে, যে জোটে রয়েছে নাহিদ ইসলাম-সহ জুলাই আন্দোলনের নেতাদের এক অংশের তৈরি নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপি। মানে খুব পরিস্কার, হাওয়া বলছে বিএনপি এগিয়ে, এনসিপি-র ওই ছাত্রনেতাদের কয়েকজন নিশ্চয়ই জিতবেন, কিন্তু তাঁদের কাঁধে ভর দিয়েই আপাতত মাঝমাঠের প্লেয়ার জামাত। হ্যাঁ, সেদিনকার রাজাকার, আল বদর, আল শামস-এর আজকের উত্তরাধিকারী জামাত উঠে আসছে। আমাদের দেশের ১৯৭৭-এর ছবি, ঠিক এইভাবেই কমিউনিস্ট সোশ্যালিস্ট, গণতন্ত্রীদের কাঁধে ভর দিয়ে সেদিন স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বাসঘাতক আরএসএস, হিন্দু মহাসভার উত্তরাধিকারীরা বিজেপির মুখোশে মাঝমাঠে এসেছিলেন, তারপরের ইতিহাস সবার জানা। ১৯৭৭-এ কতজন জানতেন বাবরি মসজিদের কথা? কতজন মনে করতেন ‘হিন্দু খতরে মে হ্যাঁয়’? কতজন মনে করতেন সেই কোট আনকোট ওরা এসে কেড়ে নিয়ে যাবে আপনার মঙ্গলসূত্র? কতজন মনে করতেন যে, হিন্দু তীর্থযাত্রার দু’পাশে কোথাও মুসলমানদের একটা দোকানও থাকা উচিত নয়? ক’জন মনে করতেন ঘোষণা করে ফতোয়া দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে সমস্ত মাংসের দোকান, সমস্ত আমিষ রেস্তঁরা, যখন আসবে নবরাত্রি? কতজন মনে করতেন মাইকে আজান দেওয়া বন্ধ না করলে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলতে হবে মসজিদ? কতজন মনে করতেন মুসলমান মানেই দেশদ্রোহী? শতাংশের হিসেবে এক শতাংশ মানুষও এই ধারনাগুলো মাথাতেও আনেননি। কিন্তু আজ দেখুন সেগুলোই ডমিন্যান্ট ফ্যাক্টর, সেগুলোই আজ মগজের দখল নিয়েছে।

বাংলাদেশে ছবিটা খানিক আলাদা। হাসিনার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়তে হবে বলেই এক জোট তৈরি হল, শুরু থেকেই সেখানে একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল এই জামাত, দেশজোড়া মোল্লাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পুরোহিত এই জামাত। তারা আপাতত মাঝমাঠে, আর এই অভাগা সংসদীয় গণতন্ত্রের এক মজা হল একে ব্যবহার করে হিটলার এসেছিল, একেই ব্যবহার করে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর স্বৈরাচারের ডালপালা মেলেছিলেন, একেই ব্যবহার করেই আজ মোদি–শাহের স্বৈরতন্ত্র দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো আর প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাদের ধারে নিয়ে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলা ভাষার, মাতৃভূমির, জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ, জিতেছিল বাঙালি, জিতেছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, জিতেছিল মানবতা। হেরেছিল কারা? পাকিস্তান? সে তো ৭১-এই সেটলড, বাংলাদেশ তো আর নতুন করে পাকিস্তান হবে না। আসলে সেদিন হেরেছিল সেই ঘাতক দালাল রাজাকারেরা, যারা বাংলা ভাষা, মাতৃভাষার দাবীকে উপেক্ষা করেছিল, হেরেছিল তারা যারা এক মৌলবাদকে সামনে রেখে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে সরব ছিল, হেরেছিল তারা যারা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তারা সেদিন হেরেছিল, কিন্তু শেষ হয়ে গিয়েছিল কি? একেবারেই নয়, তারা শেষ হলে জাতির পিতাকে হত্যা করল কারা? গণতন্ত্রকে সামরিক ছাউনিতে নিয়ে গেল কারা? তারা শেষ হয়নি, বরং তারা বার বার তাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে ফিরে ফিরে আসে, দখল নিতে চায় এই অর্জিত স্বাধীনতার। বাংলাদেশের যে কোনও আন্দোলনে, সামাজিক রাজনৈতিক যে কোনও কর্মকান্ডে এই দুই ধারা আছে, হেরেছে, শেষ হয়ে যায়নি। ঠিক আমাদের দেশের আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, জনসঙ্ঘ, বিজেপির মতোই এক এমন বিপদজনক দর্শন নিয়ে তারাও কাজ করেই চলেছে।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজি বলেছিলেন, এক কোটির চাকরি দেবো, পেয়েছেন মাত্র ৯৫ জন

কাজেই আপনার একচোখ যদি ভাতের লড়াই এর দিকে হয়, তাহলে আরেক চোখকে রাখতেই হবে এই জামাত শিবির রাজাকার হেফাজতের দিকে, আমাদের দেশে আমাদেরও রাখাই উচিত ওই আরএসএস আর তার শাখা সংগঠনের দিকে। বেশ কিছুদিন আগে এক গায়ক বন্ধু ফোন করে জানায়, সে যাচ্ছে মানবাধিকার সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে, গল্প করতে করতেই জানায় আর কে কে যাচ্ছে, খটকা লাগায় চেক করে দেখি আরএসএস-এর এক শাখা সংগঠন এখন মানবাধিকারের ব্যানার নিয়ে রাস্তায়। ওই যে একটা চোখ এই দিকেই রাখতে হবে। আমরা ভুলেছিলাম বলেই সেদিন ৭৫-এর জরুরি অবস্থার বিরোধিতার প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে আজ দেশের ক্ষমতায়। ভাত কাপড়ের লড়াইয়ের কথা বলেই ফ্রান্সের ফার রাইটরা আর একটু হলে ক্ষমতায় আসতে চলেছিল। ভাত কাপড়ের লড়াই, চাকরির দাবী, বেশি মাইনের দাবী নিয়ে সমাজতন্ত্রের কথা বলে মুসোলিনি ক্ষমতায় এসেছিল, নাৎসি পার্টি ক্ষমতা দখল করেছিল। কাজেই যেখানে ওই মৌলবাদী স্বৈরাচারের অস্তিত্ব আছে, সেখানে যেকোনও আন্দোলনে আগে তাদের এলিমিনেট করেই, তাদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চালিয়েই ওই আন্দোলনকে নিয়ে এগোনোও যায় না হলে পস্তাতে হয়। সেদিন না বুঝেছিলেন দেশের সমাজতন্ত্রীরা, না বুঝেছিলেন বামেরা, তাঁরা অটল, আদবানির হাত ধরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মৌলবাদি স্বৈরাচারকে জায়গা করে দিয়েছিলেন, এ তো ইতিহাস, অস্বীকার করার তো কোনও জায়গাই নেই। কাজেই ভাত-কাপড়-চাকরি আর বাসস্থানের লড়াই তো হবেই, কিন্তু স্থায়ী শত্রুদেরকে সেই আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন না করতে পারলে আন্দোলন হাইজ্যাক হবে, হবেই। শেখ হাসিনা স্বৈরাচারী কি না? তাঁর দেশের মানুষ সেই রায় দেবেন, তাঁর দেশের মানুষ নির্বাচনে তাঁকে হারিয়ে দেবেন, বা গণ আন্দোলনের ফলে তাঁকে সরে যেতে হবে যেমনটা এর আগেও হয়েছে, কিন্তু তা তো হল না। হল না তো হল না, একটা অবাধ নির্বাচন তো হল। কিন্তু তার পরেও এবার সংবিধান বদলের স্লোগান। ৭২-এর সংবিধান ধুয়ে দাও মুছে দাও। কারা লাভবান হচ্ছে এই স্লোগানে? কাদের মাথা থেকে বেরোল এই স্লোগান? ভাবতে হবে, ভাবতে হবে।

বাংলাদেশের গত কয়েকবছরের রাজনৈতিক পরিসরে গণতন্ত্রের উপর আঘাত এসেছে বার বার, গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছিল হাসিনার সরকার, এ নিয়ে দ্বিমত নেই, আওয়ামি লিগের তো ভাবা উচিত ছিল, ছাত্র লিগের গুন্ডারাই কি দেশ চালাবে? কিন্তু এক বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে যদি এক রাজনৈতিক স্বৈরাচার আর আল বদর, রাজাকার, হেফাজত, জামাত আর মৌলবাদের উত্থানের মধ্যে আমাকে একটাকে বাছতেই হয়, তাহলে আমি নির্দ্বিধায় বেছে নেব নিয়মতান্ত্রিক স্বৈরাচারকে, ঠিক যেভাবে আজ বেছে নিয়েছে ফ্রান্সের মানুষ, মাক্রঁকে তো একেবারে হারিয়ে দেয়নি, মধ্য আর বাম জোট ভোট পেয়েছে, আমাদের দেশে কংগ্রেস বা তৃণমূলকে বেছে নিয়েছে, বিজেপিকে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে দেয়নি, এগুলোই হল সেই বোধ, ‘লেসার এভিল গ্রেটার এভিল’ বাছার সাধারণ থিওরি। সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপি বা আওয়ামি লিগকে হারানো যায়, এক জোট ভেঙে আরেক জোট তৈরি করাই যায়, আন্দোলন করাই যায়, কিন্তু অন্য পক্ষ রাজাকার হেফাজত জামাত আল বদর আল শামস মগজের দখল নেয় সে বড় ভয়ঙ্কর, আর সেই শুরুর দিন থেকে যে কথা বলে আসছি সেটাই আজ সামনে, মাঝ মাঠে এসে হাজির তারা যাদের গায়ে মার্চের গণহত্যার ছোপ ছোপ রক্ত। নির্বাচন শেষ, লড়াই কি শেষ? বাংলাদেশের মানুষ রবি ঠাকুর, নজরুল, জীবনানন্দ, জাসিমুদ্দিন, আল মাহমুদ, শামসুর রহমানের দেশের মানুষ কি আত্মসমর্পণ করবে জামাতের কাছে? লড়াই থামিয়ে দেবে? যে বোধ যে চেতনা থেকে ২১-এর লড়াই লড়েছিল বাঙালি, তা ভুলে যাবে? বিপ্লব হয় জন্ম দেয় এক নতুন সমাজের, এক উন্নততর সমাজের, না হলে বিপ্লবের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় এক প্রতিবিপ্লব, যার চেহারা ইতিহাস বলে দেয় খুব কুৎসিত, সেই প্রতিবিপ্লব ইতিহাসের চাকাকে উলটো দিকে ঘোরাতে থাকে। সে বড় কঠিন সময়, ৭৭-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরে যে পদ্ধতিতে আরএসএস–বিজেপি ক্ষমতায় এসে সংবিধানকেই বিপন্ন করে তুলেছে আজ তার প্রতিধ্বনী শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশে।

ঠিক এই নির্বাচনের আগে কথা বলেছিলাম বেশ কিছু পরিচিত মানুষজনের সঙ্গে। তাঁদের বক্তব্য জুলাই বিপ্লবের আদত মূলধন ‘পকেটমারি’ হয়ে গেছে আর বিপ্লবের মূল শক্তি বিভিন্ন দলের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে হারিয়ে যাচ্ছে। তাহলে নির্বাচনের পরে বাংলাদেশ এখন কোন পথে? বাংলাদেশ এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে। এক গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা আজ অর্থনৈতিক পতন, আইনশৃঙ্খলার বিপর্যয় আর খণ্ডিত রাজনৈতিক বাস্তবতার নিচে চাপা পড়েছে। বাংলাদেশ এক কেন্দ্রীভূত স্বৈরতন্ত্র থেকে বেরিয়ে এক বিকেন্দ্রীভূত নৈরাজ্যের মধ্যে পড়েছে। গণতন্ত্রের স্বপ্ন সাংবিধানিক বিতর্কে আটকে গিয়েছে, মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি নতুন ধরনের সহিংসতায় হারিয়ে গিয়েছে, আর দুর্নীতি দমনের চেষ্টা নিরাপত্তার অভাবে হোঁচট খাচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট একে অন্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে, যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সাধারণ মানুষ এবং আন্দোলনকারী, যারা পরিবর্তনের জন্য অনেক ত্যাগস্বীকার করেছিলেন, তারা আজ হতাশ। তাদের মনে হচ্ছে, বিপ্লবকে “বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে”। কিন্তু শেষমেষ এক নির্বাচন তো হল, এবার নতুন সরকার তৈরি হবে, দেশ আবার তাদের নিজেদের শর্তে নিজেদের মতো করে চলবে, কিন্তু যে বিপদ আজ সবচেয়ে আগে মাথায় রাখতেই হবে, তা হল মাঝমাঠের এই নতুন প্লেয়ার জামাত আর তার বাহিনী। বাংলাদেশের জন্মই এক ভাষার আন্দোলনের গর্ভ থেকে, সেখানে সাম্প্রদায়িকতার কোনও জায়গা নেই, থাকা সম্ভব নয়, সেই উত্তরাধিকারই দিশা দিক বাংলাদেশকে।

দেখুন আরও খবর:

Latest News

সৌদি আরবে ঘটল ভয়াবহ ঘটনা

ওয়েব ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির আবহেই সৌদি আরবে (Saudi Arabia) ঘটল ভয়াবহ হেলিকপ্টার (Helicopter) দুর্ঘটনা। পূর্বাঞ্চলের রাস তানুরা...

More Articles Like This