এমনটা আগে লোকে বলতেন, লাল কৃষ্ণ আদবানি প্রায়ই বলতেন, ‘পার্টি উইথ এ ডিফারেন্স’। হ্যাঁ, একটা সময়ে এটাই ছিল বিজেপি সম্পর্কে বহু মানুষের ধারণা। একা মূরলীধর লেনে এসে নিজেই চেয়ার সাফ করে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতেন তপন শিকদার; আজ নয়, সেই জনসঙ্ঘের সময় থেকে, বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী খান তিনেক পাঞ্জাবী নিয়ে রাজভবনে গিয়েছিলেন যখন তাঁকে হিমাচল প্রদেশের গভর্নর করা হয়েছিল। আজ সবটাই পালটে গিয়েছে। দিল্লিতে বসে এ বাংলার এক্কেবারে পেটোয়া লোক যিনি সবকিছু, হ্যাঁ, সবকিছু যোগাড় করে দিতে পারেন, তাঁর চোখেই বাংলাকে দেখছেন বিএল সন্তোষ। দলের সংগঠন রইল কী গেল, থাকল না ভোগে গেল – তা নিয়ে চিন্তিতই নন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, উনি তাঁর অনুগামী, লয়াল নেতাদের বলছেন, সংগঠন গিয়েছে তেল নিতে, ‘আমি টিকিটটা এনসিওর করব’। হ্যাঁ, এরকমটা শোনা যাচ্ছে। প্রমাণ? ওনার কাছের অনেকেই সংগঠনে নেই, সজল, ন্যাড়া বাগচি নেই তো কোনওরকম সাংগঠনিক দায়িত্বে। কিন্তু শোনা যাচ্ছে ওনার ওই টিকিট দেওয়ার আশ্বাসেই আপাতত দলে বিদ্রোহ নেই। আপাতত টিকিট বিতরণ কোন ফরমুলায় হয়, সেটা নিয়েই ব্যস্ত বা বলা ভাল সেদিকেই সব্বার মনোযোগ আমাদের বঙ্গ বিজেপিতে। আর ঠিক সেইখানেই বিরাট কেলো! গত দু’দিন ধরে ফিসফিস, টিকিট কাটা যাচ্ছে কার কার? কোন কোন নেতা এবারে কেবল প্রচারেই থাকবেন, টিকিট পাবেন না? তালিকা বেশ বড়, কিন্তু তারই মধ্যে ক’টা নাম নিয়ে উত্তেজনা চরমে, সেটাই বিষয় আজকে, বঙ্গ বিজেপির অন্দরমহলে ধুন্ধুমার, তাপস রায়, রাজু ব্যানার্জি, সঞ্জয় সিংকে টিকিট দেওয়া হচ্ছে না।
বহু চেষ্টা চরিত্রের পরে শেষমেষ রাজ্য কমিটির ঘোষণা হয়েছিল। থাম্বরুল যাঁরা নির্বাচনে লড়বেন তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকবেন না, যাঁরা বিধানসভাতে লড়বেন না, প্রচারের কাজ করবেন যেমন লকেট চ্যাটার্জি, শশী অগ্নিহোত্রী, সৌমিত্র খাঁয়েদের সাধারণ সম্পাদক করা হল, কারণ বিজেপিতে সভাপতির পরে সাধারণ সম্পাদক পদই হল গুরুত্বপূর্ণ। এবারে ক’দিন আগেই পশ্চিমবঙ্গকে ৪৩টা সাংগঠনিক জেলাতে ভাগ করে জেলা ইনচার্জদের নাম ঘোষণা করা হল। বিরাট তালিকা, সেই তালিকাতে তাপস রায় আছেন দক্ষিণ কলকাতার দায়িত্বে, মানে মমতা ব্যানার্জির ভবানীপুরে বিজেপির লড়াই এ সংগঠনের দায়িত্বে তাপস রায়। ওদিকে রাজু ব্যানার্জিকে দেওয়া হয়েছে মেদিনীপুরে, মানে সম্ভবত দিলীপ ঘোষ লড়বেন খড়গপুরে, সেই প্রেস্টিজাস লড়াইয়ের সংগঠনের দায়িত্বে থাকবেন রাজু ব্যানার্জি। কলকাতা নর্থ সাবার্বান ডিস্ট্রিক্টের দায়িত্বে আছেন সঞ্জয় সিং, মানে কলকাতা উত্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ছ’টা আসনে সংগঠনের দায়িত্বে থাকবেন উনি। দলের মধ্যে চর্চা, তাহলে কি ওনাদের টিকিট দেওয়া হবে না? বরাহনগরেই যদি দাঁড়ান তাপস রায়, তাহলে সেটাও তো কেক-ওয়াক হবে না, তৃণমূল আসন দখলে রাখার জন্য আর তাপস রায়কে জুৎসই জবাব দেওয়ার জন্য জান লড়িয়ে দেবে। তো নিজের আসন সামলে তাপস রায় ভাবানীপুর সমেত দক্ষিণ কলকাতার ছ’টা আসন কখন, কীভাবে দেখবেন? একই কথা রাজু ব্যানার্জি বা সঞ্জয় সিংয়ের ক্ষেত্রেও বলা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: Aajke | অনিকেত না দেবাশিস? হ্যাঁ, এইখানে এসে ঠেকল আরজি কর ধর্ষণ, হত্যা
তার মানে কি ওনাদের এবারে, অন্তত এবারে ওই সাংগঠনিক কাজেই রেখে দেওয়া হচ্ছে? কারণ এই ৪৩টা সাংগঠনিক জেলার মাথার একটাতেও নেই শঙ্কর ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পল বা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের নাম, মানে তাঁরা নিশ্চিত করেই নির্বাচনে লড়ছেন। আজ দুপুর থেকে এই আলোচনা চলেছে, আর তার সঙ্গে জুড়েছে বিতর্কের আরেকটা অংশ। আগেই অঞ্চল ইনচার্জের নাম ঘোষণা হয়েছিল, আর সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এই জেলা ইনচার্জদের রিপোর্ট করতে হবে অনেক জুনিয়র নেতাদের কাছে, সেটাই বা কেন? হ্যাঁ, যখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারখানা নির্বাচনী সভা শেষ হয়ে গেল, তখন বিজেপির মধ্যে এখনও সংগঠন আর তার দায়িত্ব নিয়ে মন কষাকষি চলছে তো চলছেই। সবাইকে সামলে দলকে খাড়া করতে নাজেহাল বঙ্গ বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তৃণমূল দল যখন তাঁদের যুবরাজকে নিয়ে মাঠে নেমে গিয়েছে, একের পর এক জনসভা করছে, তখন বিজেপি তার সাংগঠনিক কাঠামোর বিস্তর গন্ডগোল নিয়ে দলের ভেতরে ঝগড়াতেই ব্যস্ত? এই সাংগঠনিক চেহারা নিয়ে তৃণমূলের মোকাবিলা করতে পারবে বিজেপি?
একটা সময়ে মনে হত, বিজেপি সংগঠনে খানিক সমস্যা থাকলেও নির্বাচনের আগে তারা চাগিয়ে ওঠে, তাদের আইটি সেল অ্যাকটিভ হয়ে যায়। যে দল এবারে বাংলার গদি পেতে চাইছে, ঠিক এই মুহূর্তে তাদের অবস্থা দেখুন, এসআইআর নিয়ে বিব্রত। ক্ষুব্ধ মানুষ, এমনকি বিজেপি ভোটার ব্যাঙ্কের প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে নেই। আই-প্যাক অফিসে ইডি হানাকে কাজে লাগিয়ে মমতা, তৃণমূল র্যাঙ্ক অ্যান্ড ফাইলকে এক্কেবারে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। যুবরাজ আইটি সেলের সমাবেশ করে ফেললেন, সভার পর সভা করছেন, আর দলের মধ্যের কোন্দল থামাতেই ব্যস্ত বঙ্গ বিজেপি সভাপতি। তারই মধ্যে দলের বেশ কিছু নেতাদের প্রশ্ন, ‘তাহলে কি এবার আমার টিকিট থাকছে না?’ হ্যাঁ, এরকম এক ধুঁকতে থাকা চেহারা নিয়ে ২০২১-এর ৭৭ ধরে রাখা সম্ভব? এক বিজেপি নেতা প্রশ্ন শুনে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
দেখুন আরও খবর: