‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, ভুলো মাৎ, ভুলো মাৎ’। হ্যাঁ, ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা হল, দেশ ভাগ হল। কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন স্লোগান দিয়েছিল ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় ভুলো মাৎ, ভুলো মাৎ’। সে তাঁরা যাই বলুন, শেষমেশ তাঁরাও বুঝেছিলেন যে, স্বাধীনতা এসেছিল, রাজনৈতিক স্বাধীনতার শর্ত মেনে আমাদের সংবিধান রচনা হয়েছিল, আমাদের জাতীয় সংগীত, আমাদের জাতীয় পতাকা এবং দেশজোড়া সাধারণ নির্বাচন, মানুষ নির্বাচন করেছিল তার প্রতিনিধিকে, আইনসভার সদস্যদের।
আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে-
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?
আমরা যা খুশি তাই করি, তবু তাঁর খুশিতেই চরি,
আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে-
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?
রাজা সবারে দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান,
মোদের খাটো ক’রে রাখে নি কেউ কোনো অসত্যে-
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?
আমরা চলব আপন মতে, শেষে মিলব তাঁরি পথে,
মোরা মরব না কেউ বিফলতার বিষম আবর্তে-
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?
অনেক ত্রুটি ছিল, বহুদিন নিচু জাতের বলে চিহ্নিত মানুষদের নির্বাচন বুথের ধারে কাছে আসতে দেওয়া হয়নি, তারপর সে বাধা কেটেছে, আজ নিম্ন বর্ণের মানুষজন নিজেদের হকের লড়াই লড়ছেন উঁচু জাতের সব বাধাকে অতিক্রম করেই। আজ তাঁদের ভোটের পার্সেন্টেজ কোনদিকে গেলে কোন দল জিতে যাবে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে টিভির প্রাইম টাইমে। ভোটার কার্ড হয়েছে। এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন ত্রুটি নিয়েও আমাদের স্বাধীনতা তো স্বাধীনতাই ছিল, কেউ তো আঙুল তোলেনি। এবার উঠল, ফ্রিডম হাউস থেকে, এবছরে তাদের রিপোর্টে জানানো হল, ভারত এখন একটা আধা স্বাধীন দেশ, পার্শিয়াল ফ্রি। কে ভাই ফ্রিডম হাউস? এরা কারা? বিদেশের লোকজন যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে? খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, ১৯৪১ সালে, গোটা পৃথিবীই যখন স্বাধীনতার জন্য লড়ছে, নাজি, ফাসিস্ট হিটলার, মুসোলিনির বিরুদ্ধে, ঠিক তখন আমেরিকার কিছু বুদ্ধিজীবি মানুষ, লেখক, অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক জগতের মানুষজন একজায়গায় বসলেন, বললেন, আজ নয় কাল তো স্বাধীনতা আসবেই, হিটলার, মুসোলিনি ঠাঁই পাবে ইতিহাসের কালো অধ্যায়ে, কিন্তু এই যে প্রবণতা, তাকে আমরা চিহ্নিত করব, পৃথিবীজুড়ে যেখানেই গণতন্ত্র বিপন্ন হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে, মানুষের স্বাধীনতা চলে যাবে, আমরা সেই মুহুর্তেই তাকে চিহ্নিত করব, বলবো যে ওই দেশটায় স্বাধীনতা নেই, গণতন্ত্র নেই, মানবাধিকার লুন্ঠিত হয়েছে। সেই ১৯৪১ সাল থেকে তাঁরা নিয়ম করে এই কাজ করে যাচ্ছেন, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে, বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে, তাঁরা এক তালিকা বার করেন, যা বলে দেয়, বিশ্বের কোন দেশ স্বাধীন, কোন দেশ পরাধীন, কোন দেশ স্বাধীনতা হারাচ্ছে, কোন দেশ স্বাধীনতা ফিরে পাচ্ছে। কেবল তালিকাই নয়, তার পুঙ্খানিপুঙ্খ আলোচনাও থাকে তাদের ওয়েবসাইটে, ওয়েবসাইটটি হল ‘ফ্রিডমহাউস ডট ওআরজি’। সেই ফ্রিডম হাউসের তালিকায় এই প্রথম, হ্যাঁ এই প্রথম আমাদের দেশ পূর্ণ স্বাধীন থেকে আংশিক স্বাধীনের তালিকায় ঢুকে পড়েছে, আমাদের দেশ আর পূর্ণ স্বাধীন দেশের তালিকায় নেই। এমন নয় যে আমরা পূর্ণ স্বাধীন দেশগুলোর অন্যতম ছিলাম, এমনও নয়, কিন্তু, আমরা পূর্ণ স্বাধীন দেশগুলোর তালিকার নীচেই ছিলাম। উপরে ছিল ফিনল্যান্ড, সুইডেন ১০০-তে ১০০, নিউজিল্যান্ড ৯৯, ফ্রান্স, জার্মানি, ইউনাইটেড কিংডম, স্পেন ইত্যাদিরা ছিল উপরে। আমাদের মার্কস ছিল ৭৭-৭৮-৭৩ ইত্যাদি জায়গায়। আমাদের দেশে মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো বরাবরই সঙ্কুচিত, কাজেই নম্বর কম। দেশে খাপ পঞ্চায়েত থাকবে, অনার কিলিং থাকবে, পিলিশের এনকাউন্টার থাকবে, দলিত, আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার থাকবে আর নম্বর বেড়ে যাবে তা তো হয় না, অতএব আমরা ওই ৭৭-৭৮ ইত্যাদিতে ঘোরাফেরা করতাম। ২০২০-তে সেটা ৭১-এ এসে ঠেকেছিল, মানে স্বাধীন দেশের এক্কেবারে নীচে, ২০২১-এ তার থেকে ৪ পয়েন্ট কমে আমরা ফ্রিডম হাউস স্কেলে ৬৭, মানে আংশিক স্বাধীন দেশ হয়েছিলাম, এবারে আমরা ৬২-তে দাঁড়িয়ে আছি, মানে ক্রমশ আমরা আরো নীচে নামছি। স্বাধীনতা কমতে শুরু করা একটা প্রবণতা, সেটাই মনে করিয়ে দিল এই ফ্রিডম হাউস রিপোর্ট।
আসুন দেখে নিই, কেন কমলো আমাদের মার্কস, এবং তারও আগে জানিয়ে রাখি, ফ্রিডম হাউস কোনও ডিস্পিউটেড টেরিটরিকে কোনও দেশের সঙ্গে জোড়ে না, মানে ধরুন কাশ্মীর, ইন্ডিয়ান অকুপায়েড কাশ্মীরকে ওরা ইন্ডিয়ার সাথে জুড়ে দেয়নি, মানে কাশ্মীরের জন্য আমাদের মার্কস কমে গেল এমনটা নয়, ইন্ডিয়ান অকুপায়েড কাশ্মীর বলে তাদের তালিকায় যে ভুখন্ডের কথা আছে, তা পেয়েছে মাত্র ২৭, মানে তা পরাধীন, অন্যদিকে পাকিস্থান অকুপায়েড কাশ্মীরের হালও এক, তাদের মার্কস ২৬, মানে তারাও পরাধীন। কাশ্মীরকে বাদ দিয়েও ভারতীয় ভুখন্ডের স্বাধীনতা আজ আংশিক, কেন? ফ্রিডম হাউস দুটো বিশেষ বিষয়ের উপর তাদের মার্কস দেয়- (এক) রাজনৈতিক অধিকার, (দুই) মানবাধিকার বা সিভিল লিবার্টিজ, রাজনৈতিক অধিকারের জন্য থাকে ৪০ মার্ক্স, মানবাধিকার বা নাগরিক অধিকারের জন্য থাকে ৬০ মার্কস। এখন এই রাজনৈতিক অধিকার বলতে তারা কী বোঝাচ্ছে? নির্বাচিত হবার অধিকার, সার্বজনিন ভোটাধিকার, বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনের ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদির দায়বদ্ধতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র, নির্বাচিত সরকারের কাজ করার ক্ষমতা, সরকারের দুর্নীতি ইত্যাদি। তো এই ভাগে ৪০-এ আমার দেশ পেয়েছে ৩১, ভালো পারফরম্যান্স, নম্বর কেটেছে কোথায়? প্রশ্ন ছিল আমাদের দেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী, মতের মানুষ কি সমান ভাবে নির্বাচন লড়তে পারে? এইখানে আমাদের নম্বর কাটা গিয়েছে, দেশের ১৭-১৮ শতাংশ মানুষ মুসলিম সংখ্যালঘু, কিন্তু সাংসদের বিচারে তারা মাত্র ৫ শতাংশ। সিডিউল কাস্ট বা ট্রাইবের ক্ষেত্রেও সেই সমস্যা আছে, নম্বর কাটা গিয়েছে সরকারি ব্যবস্থার দুর্নীতির জন্য, কিন্তু মোটের উপর আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ঠিকঠাক আছে বলেই জানাচ্ছে এই রিপোর্ট।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | এক রঙ্গ তামাশার মধ্যেই নরেন্দ্র মোদির স্বৈরাচারী চেহারা আমাদের সামনে
এবার নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার, সিভিল রাইটস। সেখানে ৬০-এ আমরা মাত্র ৩১। কেন হল? কারণ প্রথম প্রশ্নেই আমরা কুপোকাৎ। দেশের সংবাদ মাধ্যম কি স্বাধীন? প্রশ্ন উঠলেই ভাসবে অর্ণব গোস্বামী নামে এই মোদিভক্তের মুখ, যিনি দেশের জওয়ান মারা গেলে ভোট বাড়ার হিসেব করেন, এবং নিজের পরিচয় দেন জাতীয়তাবাদী বলে। আমরা নয় বিশ্বের সবাই জানে, আমাদের দেশের সিংহভাগ সংবাদ মাধ্যম শুধু নয়, তার মালিক শুদ্ধু বিক্রি হয়ে গিয়েছে। বেড়াল ল্যাজ নাড়াচ্ছে না, ল্যাজই বেড়ালকে নাড়াচ্ছে। পরের প্রশ্ন, দেশের প্রত্যেকে তাদের বিশ্বাস, ধর্ম বিশ্বাসের কথা প্রকাশ্যে বলতে পারে? কেবল ফ্রিজে গরুর মাংস আছে নয়, থাকতে পারে, এই সন্দেহে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে জ্যান্ত মানুষ একলাখ আহমেদকে, এর পরে এই প্রশ্নের উত্তর কী দেবেন? মুসলমান ছেলে হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করলে থানায় যেতে হবে, লাভ জিহাদ কানুন এসেছে, এবার নাকি সমস্ত রাজ্যে তা লাগু করা হবে, তাহলে এই রিপোর্ট তৈরি হবার পরে, ভাবুন আগামী বছরে আমরা কোথায় থাকব? পরের প্রশ্ন, পড়াশুনোর ক্ষেত্রেও কি এই ধরণের হস্তক্ষেপ আছে? পরিস্কার বলা হচ্ছে, মুঘল শাসন হচ্ছে বিদেশি শাসন, যে মুঘলরা ভারত থেকে এক কেজি সোনাও পাঠায়নি সমরকন্দ বা তাসকন্দে, যে মুঘল সম্রাট ‘দীন এ ইলাহি’র মতো সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের কথা বলেছিলেন, ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে সে ইতিহাস, বলা হচ্ছে শ্রীলঙ্কা ভারতের মধ্যের প্রবাল সীমারেখা আসলে শ্রীরামচন্দ্রের তৈরি ব্রিজ, বলা হচ্ছে একথা, পড়ানো শুরু হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ঘ্যাঁচ করে গণেশের মাথাটা কেটে ফেলার পর, তাকে সারিয়ে তোলার জন্য প্ল্যাস্টিক সার্জারি দিয়ে হাতির মাথা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম প্ল্যাস্টিক সার্জারি। কেউ জিজ্ঞেস করছে না যে হাতির মাথা জোড়ার দরকার কী ছিল? আসল মাথাটাই তো জোড়া যেত! শুনবে কে? অতএব নম্বর কাটা গিয়েছে। জমায়েত হবার, সমাবেশ করার অধিকার আছে? পরের প্রশ্ন। আবার নাম্বার কাটা, কারণ শাহিনবাগের সামনে বিজেপি নেতা গুন্ডাদের সেই হুমকি তো বিশ্ব দেখেছে, কৃষকদের সমাবেশের উপর জলকামানের বর্ষাধারা তো দেখেছে মানুষজন, দেখেছে রাস্তায় সরকারি পয়সায় পেরেক পোঁতা। অতএব নম্বর কাটা গিয়েছে। যারা মানবাধিকারের কথা বলেন, তাদের অধিকার আছে তো? পরের প্রশ্ন। জেলে থাকা মানবাধিকার কর্মীদের জন্য, পৃথিবীজোড়া গুণিজ্ঞানী মানুষজন চিঠি লিখেছেন রাষ্ট্রপতিকে, বাঙ্গালুরুর অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর দফতর তুলে দেওয়া হয়েছে, অতএব এখানে আমরা পিছিয়ে পড়েছি।
এর পরের প্রশ্ন আবার সাংঘাতিক, বিচারব্যবস্থা কি নিরপেক্ষ? চিফ জাস্টিস, যিনি কিনা তাঁর শেষ ক বছরে একের পর এক সরকারের পক্ষে শুধু রায় দিলেন তাই নয়, নির্লজ্জভাবে তাকে সংসদে মনোনীত করা হল, এদেশে অর্ণব গোস্বামীরা জামিন পায়, ধর্ষণ খুনে অভিযুক্ত আশারাম বাপু জামিন পায়, রাম রহিম জামিন পায় উমর খালিদ, শার্জিল ইমামেরারা জেলে থাকে, বিচারব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা, বিশিষ্ট মানুষজন। এইভাবে নম্বর কাটা গিয়েছে, আমাদের নাগরিক অধিকার ক্রমশঃ সংকুচিত হচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে। আমরা স্বাধীন দেশ থেকে আংশিক স্বাধীন দেশের তালিকাভুক্ত হলাম, এই বিষয়টা ছোট নয়, এর গোড়ায় রয়েছে আরএসএস–বিজেপির পরিকল্পনা, তাকে রুখতে হবে, নাহলে আগামী দিনে সত্যিই আবার আমাদের স্লোগান দিতে হবে, ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, ভুলো মাৎ, ভুলো মাৎ’।
দেখুন আরও খবর:

