Fourth Pillar | মোদি সরকারের দেশ বেচে দেওয়ার নতুন ছকবাজিটা বুঝতে হবে

0
29

বড়লোক বাপের বখাটে ছেলে যেমন বাপকেলে সম্পত্তি বেচে টাকার যোগান বাড়ায়, তেমন কাজ আমাদের সরকার আজ নয় বহুদিন ধরেই চালিয়ে যাচ্ছে। কেবল মোদি সরকারই নয়, এর আগে কংগ্রেস সরকারের আমলেই এই কাজ শুরু হয়েছিল, নরসিমহা রাও এর সময়ে, মনমোহন সিংও একই কাজ করেছেন, কিন্তু সেই কাজের সঙ্গে আজকের সম্পদ বেচে দেবার একটা বেসিক ফারাকও আছে। নতুন প্রকল্পের নতুন নামও আছে ‘ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইন’, ডিকশনারি খুলে দেখলাম এর বাংলা বেশ খটমটে, জাতীয় সম্পদ নগদীকরণ। তো মোদ্দা বিষয়টা কী? সরকার বাহাদুরের দাবি এটা হল, দেশের অলস পড়ে থাকা সম্পদ থেকে পুঁজি জোগাড়ের এক সৃজনশীল পথ। হ্যাঁ, এই সৃজনশীল কথাটা ওনারাই জুড়েছেন, মানে বেশ বুদ্ধি করে দেশ বেচে দাও। এই ‘অ্যাসেট মনিটাইজেশন’ মানে টাকা জোগাড় করার ব্যাপারটা, এর মূল ধারণাটা সোজা। সরকারের কাছে এমন অনেক সম্পদ রয়েছে—যেমন রাস্তা, রেললাইন, বিমানবন্দর বা খনি—যেগুলো ইতিমধ্যেই রেডি আর সেখান থেকে আয়ও শুরু হয়েছে। তো সরকার এই সম্পদগুলো যদি কিছু বেসরকারি সংস্থাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লিজ দেয়, সরকার এককালীন মোটা অঙ্কের অর্থ পাবে। এই টাকা দিয়ে আবার নতুন নতুন রাস্তা বা হাসপাতাল তৈরি করা যাবে। আবার সরকার সেগুলোকে লিজ দেবে। মানে আমাদের ট্যাক্সের পয়সাতে দেশের সম্পদ বেচেই যা তৈরি হবে তার বরাত বের হবে, সেখান থেকে ওই বেসরকারি সংস্থাগুলো মুনাফা করবে, আবার সেগুলোই তাদের হাতে চালাতে দেওয়া হবে, মানে আবার মুনাফা। কী মজার তাই না? এবং এটা প্রথমবার নয়, ২০২১ সালে মোদি সরকার ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইন লঞ্চ করেছিল। লক্ষ্য ছিল চার বছরে ৬ লক্ষ কোটি টাকা জোগাড় করা। এবারে ২০২৫ সালের শুরুতে সরকার এর সেকেন্ড ফেজ, এনএমপি ২.০ ঘোষণা করেছে। নতুন পর্যায়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে প্রায় ১৬.৭২ লক্ষ কোটি টাকা। মানে গতবার ছিল ৬ লক্ষ কোটি, এবারে সেটা ১৬ লক্ষ কোটি। এই তাড়াহুড়োই বলে দেয় যে, সরকার বাহাদুর আসলে দেশের পরিকাঠামোর এক বিশাল অংশ বেসরকারি হাতে তুলে দিতে কতটা মরিয়া। তো কী কী বেচা হবে? দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনায় ১২টা সেক্টরকে বাছা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হল সড়কপথ বা হাইওয়ে, মাল্টি-মোডাল লজিস্টিক পার্ক এবং রোপওয়ে। এখান থেকে প্রায় ৪.৪২ লক্ষ কোটি টাকা জোগাড়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যা পুরো পরিকল্পনার ২৬ শতাংশ। মানে আমার আপনার পয়সাতে যে বিশাল বিশাল হাইওয়ে তৈরি হল, এবারে তা চলে যাবে বেসরকারি মালিকদের কাছে। আপনারা অনেকেই দেখেছেন আদানি জ্যাকেট পরা মানুষজন কাজ করছিল, মানে আদানি সাহেব মুনাফা কামিয়েছেন, এবারে আবার সেই মুনাফা কামানোর সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এরপরই রয়েছে বিদ্যুৎ খাত ২.৭৬ লক্ষ কোটি টাকা, বন্দর ২.৬৩ লক্ষ কোটি টাকা, রেলওয়ে ২.৬২ লক্ষ কোটি টাকা, কয়লা, খনি, নাগরিক বিমান চলাচল, তেল, গ্যাসের পাইপলাইন টেলিযোগাযোগ, সব আছে এই তালিকাতে।

সরকার বাহাদুর বলছে, আমরা তো শুধু লিজ দিচ্ছি, বেচে দিচ্ছি না, আবার ৩০-৪০ বছর পরে আমাদের হাতে ফিরে আসবে। কিন্তু অর্থনীতির বহু সমীক্ষা বলছে যখন কোনও সম্পদ ৩০ বা ৪০ বছরের জন্য এক বেসরকারি গোষ্ঠীকে দিয়ে দেওয়া হয়, তখন কার্যত সেই সময়ের জন্য তার উপর সরকারের, মানুষের কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর তারা যে টাকায় লিজ নিয়েছে তার ৭-৯-১০ গুণ টাকা রোজগার করে, লিজ সময়ের শেষে যা পড়ে থাকে, তাকে ছিবড়ে বলে আর সেই সময় আবার সেটাকে তৈরি করার বরাতও তারাই পায়। ‘মনিটাইজেশন’ শব্দটা আসলে বেসরকারিকরণকে আড়াল করার এক ছকবাজি, আর কিছুই নয়। ‘জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের নীলনকশা’। সরকার ধীরে ধীরে জনগণের যৌথ সম্পদ বা ‘পাবলিক কমন্স’-এর ধারণা থেকে সরে এসে সব কিছুকেই পণ্য বা ব্যবসায়িক সম্পদ, বেওসাতে এনে দাঁড় করিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য যে পরিষেবা আগে সস্তা বা বিনামূল্যে ছিল, তা এখন মুনাফাখোর ওই বেসরকারি সংস্থাগুলোর করুণার উপর দাঁড়িয়ে থাকবে, আর তাদের করুণার কথা তো আমরা জানি। ধরুণ আমাদের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি একটা রাস্তা, যেখানে মানুষ বিনা পয়সাতেই যাতায়াত করত, সেখানে টোল বসাবে এই বেসরকারি সংস্থাগুলো মানে সাধারণ জনপথকে টোল রাস্তায় বদলে ফেলা হবে, বা রেলওয়ে স্টেশনে ঢোকার জন্য চড়া ফি চাপানো হবে, কারণ ততদিনে ভেতরে এসি মেশিন বসানো হয়েছে। কিন্তু সমাজের দরিদ্রতম অংশ সেই পরিষেবাগুলো ব্যবহার করতে পারবে না। হ্যাঁ, সেই হাইওয়ে দিয়ে হুশ করে গাড়ি চলে যাবে, ট্রাক যাবে পণ্য নিয়ে, টোল দেবে, আর তার দায় চাপবে আম আদমির উপরে। তৈরি হবে অসমতা, বাড়বে বৈষম্য। মোদি সরকারের এই মনিটাইজেসনের ছকবাজির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটা হল ‘ওনার বন্ধু ফড়ে পুঁজিপতি ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’কে প্রশ্রয় দেওয়া।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | বাংলা এক নতুন রাজনৈতিক বাঁকের মুখে

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, দেশের জল-জমিন আসমানের সব সম্পদ আসলে মুষ্টিমেয় কয়েকটা কর্পোরেট গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণটা মন দিয়ে শুনুন ২০১৯ সালে আদানি গ্রুপ বিমানবন্দর ব্যবসায় পা রাখল, সাত তাড়াতাড়ি তারা আহমেদাবাদ, লখনউ, ম্যাঙ্গালুরু, জয়পুর, গুয়াহাটি তিরুবনন্তপুরমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ছটা বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেল। এর বাইরে মুম্বই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৭৩ শতাংশ শেয়ার এখন তাদের হাতে, তারা নভি মুম্বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাজও হাতে নিয়েছে। ঠিক এই সময়ে ভারতের ২৫ শতাংশ বিমানযাত্রী, ৩৩ শতাংশ এয়ার কার্গো গৌতম আদানির হাতে। সেই তাদের হাতেই দেশের সম্পদ আলতো করে বেচে দেবার নাম হল অ্যাসেট মনিটাইজেশন। একই ছবি দেখতে পাবেন জাহাজ বন্দর, কয়লা খনির ক্ষেত্রেও। মুন্দ্রা থেকে ধামরা—ভারতের বড় বড় বন্দরগুলো এখন আদানি গোষ্ঠীর হাতে চলে গিয়েছে। আম্বানিও পিছিয়ে নেই, ভাগাভাগি করেই খাচ্ছে। এই গুটিকয়েক কর্পোরেট গোষ্ঠী এখন দেশের বাজারকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে যে ছোট ব্যবসায়ী বা প্রতিযোগীদের নাভিশ্বাস উঠছে। ফলে বাজারে একচেটিয়া দাদাগিরি, যাকে ‘মনোপলি’ বলে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের, প্রান্তিক মানুষের, গরীব মানুষজনের ভাত কেড়ে নেবে। আগেই বলেছি এনএমপি ২.০- তে রোডওয়েজ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ জোগাড়ের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এখানে সরকার ‘টোল-অপারেট-ট্রান্সফার’ মডেলের উপর ভরসা করছে। এই মডেলে সরকার ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে যাওয়া রাস্তাগুলো বেসরকারি সংস্থাকে লিজ দেবে। বেসরকারি সংস্থা সরকারকে অগ্রিম কয়েক হাজার কোটি টাকা দেবে, আর বদলে ৩০ বছর পর্যন্ত সেই রাস্তায় টোল আদায়ের অধিকার পাবে। ভারতের পরিবহন শিল্পের উপর করা একটা সমীক্ষা বলছে টোল ট্যাক্সের খরচ পরিবহন ব্যয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশে পরিণত হয়েছে। মানে ট্রাক মালিকদের আয়ের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে টোল দিতে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হু হু করে বাড়ছে। আগে কী বলা হয়েছিল? রাস্তা তৈরির খরচ উঠে যাওয়ার পরে টোল আদায় বন্ধ হবে। এখন কী হচ্ছে? বেসরকারি সংস্থাগুলো যখন টোল আদায়ের দায়িত্ব পায়, তখন তাদের মূল টার্গেট হল সবথেকে বেশি লাভ করা। টোল করের হার যেভাবে বাড়ছে, মানে হিসেব বলছে বার্ষিক ১২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হচ্ছে, তা সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তৈরি খরচের ১০ গুণ তোলার পরেও টোল থেকে যাচ্ছে, আমাদেরর ট্যাক্সের টাকায় তৈরি সম্পদের থেকে মুনাফা চলে যাচ্ছে বেসরকারি সংস্থার ব্যাঙ্কে।

ভারতীয় রেলকে দেশের ‘লাইফলাইন’ বলা হয়। কয়েক কোটি গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষ প্রতিদিন রেলের উপর ভরসা করে যাতায়াত করেন। সরকার হাই স্পিড ট্রেন আনছে, ঝাঁ চকচকে স্টেশন তৈরি করছে, কাদের পয়াসাতে? আমাদের। আর তার পরে তা লিজ দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে। প্ল্যাটফর্ম টিকিটের দাম গত দশ বছরে বেড়েছে ৬-৭ গুণ। কেন? ভেতরে এসি আছে। কেন? আপনি আধঘন্টা আগে পৌঁছে যাচ্ছেন। ক্রমশ রেলে চড়াটাও গরীব মানুষজনের কাছে এক বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।  একই অবস্থা বিএসএনএল (BSNL) এমটিএনএল (MTNL) এও। সংস্থা দুটোকে কার্যত রুগ্ন করা হয়েছে, আর তার পরে দুটো সংস্থার হাতে থাকা জমি, টাওয়ার ফাইবার পরিকাঠামো বিক্রি বা লিজ দেওয়া হচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে এই দুটো সংস্থার সম্পদ বেচে সরকার পেয়েছে প্রায় ১৩,০০০ কোটি টাকা। এই সংস্থাগুলোকে ইচ্ছে করেই ৪জি বা ৫জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ করতে দেরি করা হয়েছে, যাতে বেসরকারি সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই বাজার দখল করে নিতে পারে। সেখানে আদানি বিরাট প্লেয়ার। তারপর এখন সেই রুগ্ন সংস্থার সম্পদগুলো মনিটাইজেশনের নামে জলের দরে বেচে দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রেও ছবিটা একই রকম। পাওয়ার গ্রিড বা এনটিপিসির মতো লাভজনক সংস্থার ডিস্ট্রিবিউশন লাইনগুলো ‘বেচে দেওয়া হচ্ছে আর সরকার বাহাদুরের দাবি এতে নাকি বিদ্যুতের মান বাড়বে, আসলে কী হবে? বিদ্যুৎ পরিষেবা পুরোপুরি বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে বিদ্যুতের মাশুল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে, যাচ্ছে। জঁ দ্রজ, অমর্ত্য সেনের মতো বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, কেবল পরিকাঠামো উন্নয়ন করলেই দেশ উন্নত হয় না, যদি না সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছয়। জঁ দ্রজ বলছেন, ৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রাটা কেবল উচ্চবিত্তদের ‘সুপারপাওয়ার’ হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা মেটানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের জীবনের মান কমছে। এই মনিটাইজেশন আসলে শ্রমজীবী মানুষের উপর একটা সার্জিকাল স্ট্রাইক। সরকারি সম্পদ যখন বেসরকারি হাতে যায়, তখন সেখানে স্থায়ী কর্মসংস্থান কমে যায়, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থাকেনা, এ তো আমরা দেখছি।

অনেকগুলো প্রশ্ন- (১) এই সমস্ত পরিসেবার দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাবে। সরকার কি সেটা জানেন না? ইতিমধ্যেই টোল ট্যাক্সের বৃদ্ধি বা প্লেনের টিকিটের দাম বাড়া তার বড় প্রমাণ। (২) কর্মসংস্থান কি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে? সরকারি চাকরিতে যে নিরাপত্তা আর সামাজিক সুরক্ষা থাকে, বেসরকারি চুক্তিবদ্ধ চাকরিতে তা তো থাকবে না। (৩) দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা কি বিঘ্নিত হবে? টেলিযোগাযোগ বা বন্দরের মতো কৌশলগত সম্পদ যখন পুরোপুরি বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে যায়, তখন জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি দেশের মানুষকে বাদ দিয়ে কেবল মুষ্টিমেয় কয়েকটা কর্পোরেট গোষ্ঠীকেই, বড়লোক, আরও বড়লোক তৈরি করার কাজেই লেগে থাকে তাহলে সেই উন্নয়নের লক্ষ্য ব্যর্থ হতে বাধ্য। পুরোটাই আসলে দেশ বেচে দেবার ছকবাজি, যার বিরুদ্ধে এখনই না রুখে দাড়ালে অনেক দেরি হয়ে যাবে, দেশ চলে যাবে ফড়েদের হাতে।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here