Fourth Pillar | ইরান হবে ভিয়েতনাম, ট্রাম্প সাহেবের মুখ পুড়বে, আরব দুনিয়ায় ইজরায়েল আবার একলা

0
42

ইরান কি আমেরিকার নতুন ভিয়েতনাম হয়ে উঠতে পারে? না, এই প্রশ্নটা আমি করছি না, আমেরিকার মিডিয়া করছে, মানুষজন করছেন, আমেরিকার নির্বাচিত সেনেটরা করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের আগুনবলয় আর এক অনিশ্চিত যুদ্ধর এই দিনগুলো পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিষণ্ণ অধ্যায় হয়ে থেকে যাবে। যখন ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে আগুন বোমা যখন দখল নিল ইরানের আকাশ, তখন ওই নেতানিয়াহু বা ট্রাম্প বাদে অনেকেই হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রটা এক্কেবারে বদলে যেতে পারে। ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করেছে, তার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—ইরানের পারমাণবিক স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ভাণ্ডারের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু যুদ্ধের ১০ দিন পেরিয়ে আসার পরে আজ আমরা এই সংঘাতের গভীরতা দেখে অবাক হচ্ছি, বিশ্লেষণ করছি, তখন একটা ভয় শুধু আমাদের নয়, খোদ আমেরিকার বাসিন্দাদের ঘিরে ধরছে, আমেরিকা কি জেনে শুনে ইরানের এই দুর্গম চোরাবালিতে পা রাখল? ইরান কি সত্যিই আমেরিকার জন্য আবার এক ভিয়েতনাম হতে চলেছে? এই যুদ্ধের রেশ এখন আর শুধু তেহরান বা তেল আবিবের অলিগলিতে তো আটকে নেই, ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে—আর্থিক বাজার থেকে শুরু করে আমেরিকার রাজপথ আজ যুদ্ধের উত্তাপে টালমাটাল।

২০২৬-এর এই যুদ্ধের শুরুটা তো হঠাৎ করে হয়নি, ২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সেই ভয়াবহ হামলার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল ইরানের ছায়াযুদ্ধ একটা বিপজ্জনক বাঁক নিতে শুরু করেছিল। ২০২৪-২৫ সালে সরাসরি মিসাইল দেগে দেওয়া, ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে আমেরিকার হামলা পরিস্থিতিকে চূড়ান্ত খাদের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল, না সারা বিশ্বের নেতারা কেউ কোনও কথা বলেননি, এই নীরবতা আজ বিশ্বকে আরেক খাদের ধারে নিয়ে এসে দাঁড় করাল। আমেরিকার দাবিটা কী? তাদের প্রতিরক্ষা দফতরের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছে, আর তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরাসরি আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর যে যে দেশে তেল আছে, সেই দেশই কোনও না কোনও ভাবে আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, এ তো আমরা জানি। ক’দিন আগেই তো ভেনেজুয়েলার ঘটনা আমরা দেখেছি। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা, ইজরায়েল তাদের যৌথ সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, প্রথম আঘাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইকে হত্যা করা হল। এরপরে তারা কী আশা করে? আলোচনা? পাশাপাশি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের শীর্ষ কমান্ডার মহম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহকেও খতম করা হল। ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, এই ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ মানে শীর্ষ নেতৃত্বকে খতম করার পরেই ইরানের শাসনব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, আর সাধারণ মানুষ তাদের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করবে। কিন্তু বাস্তবে হল তার ঠিক উল্টো। খামেনেইর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরে খামেনেইয়ের পক্ষে সমর্থন বেড়েছে, মোজতবা খামেনেইয়ের উত্থান আমরা দেখলাম আর ইরানের প্রতিশোধ স্পৃহা, ইরানের নেতৃত্বের এই দ্রুত পরিবর্তন আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেই নয়, বিশ্বের মানুষজনকে অবাক করে দিয়েছে। মোজতবা খামেনেই তাঁর বাবার তুলনায় অনেক বেশি কট্টরপন্থী আর প্রতিহিংসাপরায়ণ বলেও পরিচিত। তাঁর স্ত্রী, পরিবারের অন্য সদস্যরাও মার্কিন-ইজরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন, যা জন্ম দিয়েছে এক প্রচণ্ড ব্যক্তিগত আক্রোশ, আর মোজতবা তাঁর প্রথম ভাষণেই এই যুদ্ধকে এক পবিত্র ‘জিহাদ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন, জানিয়েছেন যে ইরান শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। মানে আমেরিকার যে প্রত্যাশা ছিল, ইরান আত্মসমর্পণ করবে, তা ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। বরং মোজতবা খামেনেইয়ের নেতৃত্বে ইরান এখন অনেক বেশি মরিয়া।

আরও পড়ুন:

ইরানের সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC), তাদের নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য জানিয়েই ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’ শুরু করেছে। এই অভিযানের ৩১তম পর্যায়ে তারা ইজরায়েলের ভেতরে আর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে শয়ে শয়ে মিসাইল ছুঁড়েছে। শুধু তাই নয়, ইরানের সমর্থনে ইরাকের শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ আলি আল-সিস্তানি, ইরানের ভেতরে সুন্নি আলেমারাও এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, যা ইরানের জাতীয় ঐক্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমেরিকান বিশ্লেষকরা এখন বুঝতে পারছেন যে, বাইরের শক্তির এই প্রচণ্ড আক্রমণ ইরানের সাধারণ মানুষকে বরং সরকারের আরও কাছে নিয়ে এসেছে, যা যুদ্ধের খরচ আর সময়—দুটোকেই বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এটাও তো বুঝতে হবে যে, আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে ইজরায়েল-আমেরিকা বনাম ইরান যুদ্ধ, কেন আমেরিকার জন্য নতুন এক ভিয়েতনাম তৈরি করে তুলছে? তার সবচেয়ে বড় কারণ হল ইরানের সামরিক কৌশল আলাদা। (১) তারা একটা লো কস্ট প্রোলংড ওয়ার, কম খরচে বহুদিনের যুদ্ধ চালানোর দিকে যাচ্ছে। (২) তারা এখন দেশকে সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছে। (৩) আগের রেজিমের প্রচন্ড বিরোধীরা হঠাৎই জনবিচ্ছিন্ন বা মত বদলেছেন। আর ভিয়েতনামের জঙ্গলে আমেরিকা যেমন নাজেহাল হয়েছিল, ইরানের মরুভূমি আর পাহাড়ঘেরা দুর্গম অঞ্চলও ঠিক তেমনভাবেই মার্কিন সেনার জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠছে। ইরান খুব ভালো করেই জানে যে, আকাশযুদ্ধে তারা আমেরিকা বা ইজরায়েলের সমকক্ষ নয়। তাই তারা বেছে নিয়েছে ‘অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা বিকল্প যুদ্ধের পথ। তাদের মূল অস্ত্র এখন সস্তা কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ড্রোন আর ছোট মিশাইলের ঝাঁক। আমেরিকা ইজরায়েল ইতিমধ্যেই ইরানের ২,০০০-এর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, তাদের ধারণা ছিল তারা ইরানের মিসাইল তৈরির জায়গাগুলোকেই ধ্বংস করেছে, কিন্তু এখন তারাও বুঝতে পারছে, কিন্তু ইরানের ড্রোন কারখানাগুলো কোনো একটা বিশাল ভবনে নয়, বরং ছোট ছোট বেসমেন্টে বা মাটির নিচের সুড়ঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একে বলা হচ্ছে ‘রিজেনারেশন কনস্ট্যান্ট’ মানে খুব তাড়াতাড়ি আবার তৈরি করার ক্ষমতা। মানে আমেরিকা যদি একটা কারখানা ধ্বংসও করে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্য জায়গায় নতুন করে ড্রোন তৈরি শুরু হয়ে যায়। এই ড্রোনগুলো দিয়ে ইরান ক্রমাগত লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগরের জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে কাঁপুনি ধরিয়েছে।

কেবল ভারতের শেয়ার মার্কেটের দিকে তাকান, ৮৪ হাজার থেকে নেমে এখন ৭৭ হাজারে এসেছে, ক’দিনের মধ্যে লক্ষ কোটি টাকা ভ্যানিশ। অন্যদিকে, আমেরিকার গোলাবারুদের ভাণ্ডারেও টান পড়তে শুরু করেছে। পেন্টাগনের গোপন রিপোর্ট বলছে, আমেরিকা যে হারে অত্যাধুনিক টমাহক মিসাইল বা ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে, তা বজায় রাখা অসম্ভব। প্রতিটা নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার, অথচ ইরানের ড্রোনগুলো তৈরি করতে খরচ হচ্ছে মাত্র কয়েক হাজার ডলার। এই ভারসাম্যহীন লড়াইয়ে আমেরিকা যদি দীর্ঘকাল আটকে থাকে, তবে তাদের সামরিক ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যাবে, যা চীন বা রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য এক বড় সুযোগ তৈরি করে দেবে, ট্রাম্প সাহেবের মাথাতে সেই ভয়ও ঢুকেছে। অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবেই এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর ওপর। ইরান এখন আর শুধু ইজরায়েলকে লক্ষ্য করছে না, তারা বাহরিন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলোকেও টার্গেট করছে। তাদের দেশে যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো আছে, সেগুলো আক্রমণের মুখে। তাদের লক্ষ্য খুব পরিষ্কার—মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে আমেরিকার উপর চাপ তৈরি করা। দুবাই, আবু ধাবিতে ইরানের মিসাইল হামলায় জনজীবন বিপর্যস্ত। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত দুবাই বিমানবন্দর এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ বা খুব সীমিত পরিসরে চলছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা এখন আমেরিকার উপর ক্ষুব্ধ। তাঁদের অভিযোগ, আমেরিকা তাঁদের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেই এই যুদ্ধ শুরু করেছে, যার ফল ভুগতে হচ্ছে তাঁদের। এখন তাঁরা ইরান আর আমেরিকার মাঝখানে যাঁতাকলে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ইতিমধ্যেই জানিয়েই দিয়েছে যে, তাদের মাটি ব্যবহার করে ইরানের উপর কোনও হামলা চালানো যাবে না। সৌদি আরবও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

বটমলাইন হল আমেরিকার এই হঠকারি একক সিদ্ধান্তের ফলে তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু দেশগুলো এখন তাদের থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েই থামেনি, তাকে কার্যকরও করেছে, সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এর ফলে এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত এবং চীন, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল, তারা এক আর্থিক সংকটে পড়েছে। অনেকেরই মত হল তেলের দামের এই ১০ শতাংশ বৃদ্ধি বিশ্বের জিডিপি শূন্য দশমিক দুই শতাংশ কমিয়ে দেবে আর মুদ্রাস্ফীতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। আমেরিকার ভেতরেও পেট্রোলের দাম গ্যালন প্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে, যা সাধারণ আমেরিকানদের জীবনযাত্রা নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। আর ঠিক সেই সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যেমন আমেরিকার রাজপথ বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল, ২০২৬-এর এই যুদ্ধও আমেরিকার ভেতরে ঠিক একই রকম এক অস্থিরতা তৈরি করেছে। নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত ৫০টারও বেশি শহরে হাজার হাজার মানুষ ‘হ্যান্ডস অফ ইরান’ স্লোগান নিয়ে মিছিলে নেমেছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মূল কারণ হল অর্থনীতির বেহাল দশা। যখন দেশের মানুষ মুদ্রাস্ফীতি আর বেকারত্বের সাথে লড়ছে, তখন সরকার প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ডলার যুদ্ধের পিছনে খরচ করছে, যা কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছেন না ট্যাক্সপেয়াররা। আমেরিকার বর্তমান জনমতের ৫৬ শতাংশই এই যুদ্ধের বিপক্ষে। ভিয়েতনামের মতোই এখন কফিনে করে মার্কিন সেনাদের মৃতদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছে বিশ্ব, আর সেটা শুরু হলেই আমেরিকার রাজপথ আবার সেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ের চেহারা নেবে। হ্যাঁ, ইরান আমেরিকার নতুন ভিয়েতনাম হয়ে উঠছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল আবার একঘরে হবে, আমেরিকার এই হঠকারিতা সারা বিশ্বে আবার নতুন ‘ব্যালেন্স অফ পাওয়ার’ তৈরি হতে বাধ্য।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here