Aajke | ‘মমতা রাজ্যকে ভোগে পাঠিয়েছে!’ আসুন দেখি সত্যি নাকি

0
24

সে এক সময় ছিল জানিস তো, আমাদের সেই আমলে, পুকুর পাড় দিয়ে গেলে তিনশো-চারশো ওজনের কই, লাফিয়ে পিঠে এসে পড়ত, তোর ঠাকুরদার জন্য ঘানি ভাঙা তেল দিয়ে, তেল-কই রান্না হত। তোরা তো আজকাল সব ভেজাল খাস, জল থেকে তেল – সব ভেজাল, গুঁড়ো মশলা থেকে ফ্রজেন খাবার, ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস। তো আমার ভাগ্নে রাঙা জেঠুর এই কথা শুনে সোনামুখ করে জিজ্ঞেস করেছিল, দাদু ১৯৪৭-এ ভারতীয়দের গড় আয়ু কত ছিল? রাঙা জ্যেঠু জিজ্ঞেস করেছিল, কত? ভাগ্নের জবাব, ৩২, আর সব ভেজাল খেয়ে আজ ভারতীয়দের গড় আয়ু ৭০। রাঙা জ্যেঠু এক বিরাট দীর্ঘশ্বাস আর চোখে অবিশ্বাস নিয়ে কেটে পড়েছিলেন। কই তেলের গল্প আর কাউকে শোনাননি। হ্যাঁ, মুখে মুখে এরকম কিছু কথা চালু হয়ে যায়, আর একবার চালু হলে তা পল্লবিত হতে থাকে, মাসির গোঁফ গজায়, পিসির প্রস্টেট অপারেশন হয়। তেমনই এক গল্প কথা আজকাল আমরা শুনি, আর ভোটের আগে তো তা এক পরিকল্পিত প্রচার হয়ে ওঠে, এই বাংলাতে কিসসসু হবে না রে, সব ভোগে গিয়েছে। কেউ কেউ বলেন, সব কিছু তো ছিল বিধান রায়ের আমলে। আর কেউ কেউ বলেন, ওই পরিবর্তনের পর থেকেই কেলোটা হয়েছে, দিদিমণির রাজত্বে কিছুই হয়নি, কিছুই হয় না। সত্যিটা কী? আলোচনার আগেই বলে রাখি বিধান রায়ের আমলের স্ট্যাটিসটিক্স আজকের সঙ্গে তুলনায় আনার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিই নেই, কারণ জনসংখ্যা থেকে চাহিদা থেকে মালিকানা থেকে উৎপাদন পদ্ধতি – এতটাই বদলে গিয়েছে যে, সে তুলনা করাই যাবে না। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০২৫ করাই যায়। আসুন সত্যিটা দেখি। সেটাই বিষয় আজকে, ‘মমতা রাজ্যকে ভোগে পাঠিয়েছে!’ আসুন দেখি সত্যি নাকি।

একটা কথা প্রায়শই শুনবেন, গ্রামে দেখেছিস কারও কাজ নেই, সব চলে গিয়েছে কেরল, নাগপুরে। যিনি বলেন, তিনি এটা বলেন না যে, ২০১১-র জনসুমারি বলছে বাংলাতে ২০ লক্ষ মানুষ কাজ করতে আসে, প্রায় সমান সংখ্যক মানুষ কাজ করতে বাইরে যায়। মানে মাইগ্রেশন দু’ধারেই আছে। তারপরের হিসেব নেই? আছে তো, একটু নাক ঘুরিয়ে দেখতে হবে, এই মাইগ্রেটরি শ্রমিকরা তো থ্রিটিয়ার এসির টিকিট কেটে যান না, যান অসংক্ষিত কামরায়। তার হিসেব, ২০১২ সালে সারা দেশে মোট অসংরক্ষিত দ্বিতীয় শ্রেণির ভ্রমণের পাঁচ শতাংশের গন্তব্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ, ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭.৩৩ শতাংশ। দুই, ২০২৩ সালে দেশের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যাওয়ার পাঁচটি ব্যস্ততম রুটের একটি হল বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গ। এটা অসংরক্ষিত দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভ্রমণের নিরিখে। তিন, ২০১২ সালে অসংরক্ষিত দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রীদের গন্তব্য হিসাবে সারা দেশের স্টেশনগুলির মধ্যে হাওড়ার স্থান তিন নম্বরে ছিল, ২০২৩ সালেও তাই আছে। মানে মাইগ্রেশন সেই ২০১১ থেকে কমবেশি তাই আছে, কিন্তু ওই যে রাঙাজ্যেঠু আমাদের সময়ে না। চলুন আরেকটা হিসেবে যাই, চমকে উঠবেন না সারা দেশে বাংলা এখন লাইভ স্টক, মানে গরু, শুয়োর, মুরগি খামারে, মিট প্রডাকশনে এক নম্বরে আছে, ডিমে তিন নম্বরে। হ্যাঁ, মোদি সরকারের ডেটা।

আরও পড়ুন: Aajke | পদ্ম রুখতে ঘাসফুল, মজিদ মাস্টার বোঝেন, কমরেড সেলিম কেন বোঝেন না?

ধরুন ‘ডেট টু জিডিপি রেশিও’, মানে রাজ্যের সম্পদের কত শতাংশ ধার? এক নম্বর তথ্য হল- বাংলার রেশিও কমছে। দু’নম্বর তথ্য হল- বাংলা এখন অন্ধ্র, সিকিম, রাজস্থান, মণিপুর, কেরল, বিহার, মেঘালয় রাজ্যগুলোর ব্রাকেটেই আছে। তিন নম্বর তথ্য হল- এই ধারের হিসেব বলে দিচ্ছে যে উত্তর পূর্বাঞ্চল, বাংলা, বিহার বা দক্ষিণের রাজ্যগুলোর ধার বেশি, আর পশ্চিমের রাজ্য গুজরাত, মহারাষ্ট্রের ধার কম। কারণ সেই রাজ্যে সম্পদ জড়ো করা হয়েছে, আর সেই রাজ্যগুলোতে চোখ বুজে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে তাদের ‘ডেট টু জিডিপি রেশিও’ কম। চার নম্বর তথ্য হল- বাংলার বেকারত্ব নিয়ে। গগননিনাদি আওয়াজ শোনা যায় মাঝে মধ্যেই, বাংলাতে চাকরি কই? হিসেব কী বলছে? ভারতের গড় বেকারত্ব কত? ৪.৮ শতাংশ, বাংলার বেকারত্ব ৩.৬ শতাংশ। দেশের পুরুষদের মধ্যে বেকারত্ব কত? ৪.২ শতাংশ, বাংলার কত? ৩.৪ শতাংশ। মহিলাদের দেশের হিসেব ৩.৫ শতাংশ আর বাংলার মহিলাদের বেকারত্ব ২.৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেকার কোথায়? উত্তরাখণ্ড ৮.৫ শতাংশ, কেরলে ৭.৬ শতাংশ, জম্মু কাশ্মীরে ৭.৪ শতাংশ। হিসেব মিলছে? আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, ভোট দরজায় কড়া নাড়লেই বাংলাতে কিছুই হয়নি গোছের একটা প্রচার শোনা যায়, আপনারা কি মনে করেন সত্যিই বাংলাতে কিছুই হয়নি? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।

আবার হয়েছে মানে কি দুধের বান বইছে? না, তেমনও নয়, স্কুলে ড্রপ আউটের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় রকমের সমস্যা আছে, স্বাস্থ্যে অনেক হয়েছে, কিন্তু বহু কাজ বাকিও আছে, গ্রামে আগে হেলথ সেন্টার ছিল না, এখন হয়েছে, কিন্তু ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই। উচ্চশিক্ষা নিয়ে সমস্যা আছে, সমস্যা আছে পুলিশ প্রশাসনে, সমস্যা আছে রেশন বন্টনে। আছে বৈকি। কিন্তু কিছুই হয়নি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যটাকে রসাতলে পাঠিয়েছেন বলার আগে জেনে নেবেন বাংলা এখন সুখের মাপকাঠিতে আগের থেকে অনেক উপরে, বাকি রাজ্যকে সে টেক্কা দিচ্ছে।

দেখুন আরও খবর:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here