কলকাতা: সালিশি আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে লোকসভা ভোটের মুখে ফের রাজনৈতিক চর্চায় চলে এল সিঙ্গুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমি আন্দোলনের আঁতুড়ঘর সিঙ্গুরকে কার্যত লোকে ভুলতেই বসেছিল। মুখ্যমন্ত্রীর মুখেও এখন আর সিঙ্গুরের কথা তেমন শোনা যায় না। সোমবার তিন সদস্যের সালিশি আদালত রায় দিয়েছে, ক্ষতিপূরণ মামলায় রাজ্য শিল্প উন্নয়ন নিগমকে ৭৬৬ কোটি টাকা দিতে হবে টাটা মোটরসকে। তারপর থেকেই সিঙ্গুর নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। এই রায়ের পক্ষে বিপক্ষে নানা কথা শোনা যাচ্ছে।
নবান্ন সূত্রের খবর, রাজ্য সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আঁটঘাট বেঁধে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারে। তার জন্য আইনি পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা এই মুহূর্তে শাসকদলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সালিশি আদালতের রায় নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, সিপিএম আমলে টাটাদের সঙ্গে নিগমের চুক্তি হয়েছিল। সেই আমলেই সুপ্রিম কোর্ট জমি অধিগ্রহণ অবৈধ বলে রায় দিয়েছিল। সিপিএমের জন্যই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, মমতার ঔদ্ধত্যের মাসুল দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। মমতা হিংসাত্মক আন্দোলনের জন্যই তরুণের স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছে। টাটারা মোদির গুজরাতে ন্যানো কারখানা সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলার মানুষ কোনও দিন মমতাকে ক্ষমা করতে পারবে না। সিপিএম সাংসদ এবং বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য বলেন, এই ক্ষতিপূরণ দিতে হলে রাজ্য সরকার দেউলিয়া হয়ে যাবে।
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মঙ্গলবার দাবি করেন, তৃণমূলের দলীয় তহবিল থেকে ওই ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে হবে। তাঁর দাবি, তৃণমূলের তহবিলে এখন ৮০০ কোটি টাকা রয়েছে। জনগণের করের টাকায় যদি ওই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তাহলে রাজ্যে তীব্র আন্দোলন শুরু করবে বিজেপি।
বিজেপি সাংসদ এবং দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ আবার সিপিএম এবং তৃণমূল উভয়কেই দুষেছেন। তিনি বলেন, এরা রাজনৈতিক স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে দেশের কোনও লাভ হয়নি। রতন টাটার মতো বড় শিল্পপতিকে সিঙ্গুর থেকে সরানো যেমন ঠিক হয়নি, তেমনি টাটাদের তিন ফসলি জমি দিয়েও সিপিএম ঠিক করেনি। দিলীপ বলেন, চাকরি গেল, ব্যবসা গেল, জমিও গেল। এখন টাকাও যাবে। এর দায় তৃণমূলকে নিতে হবে, মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
সালিশি আদালতের রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন। দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এক বিবৃতিতে বলেন, বাতিল ও পরিত্যক্ত সিঙ্গুর প্রকল্পের জন্য টাটা মোটরসকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর অবিচার। রাজ্যের মানুষের কাছে এর চেয়ে অযৌক্তিক, স্বেচ্ছাচারী এবং অন্যায় আর কিছু হতে পারে না। একটি বাতিল, পরিত্যক্ত প্রকল্প এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষিজমির জন্য এখন এই অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে হবে রাজ্যবাসীকে। উর্বর বহুফসলি জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধের কারণে ওই প্রকল্প বাতিল হয়। সিঙ্গুর হল এরকম প্রকল্পগুলির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জনপ্রিয় প্রতিরোধগুলির একটি অনন্য উদাহরণ।
দীপঙ্কর আরও বলেন, কৃষি, কৃষিজমি ও জীবিকার উপর আঘাত নামিয়ে আনা পরিত্যক্ত এক প্রকল্পের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান আজ রাজ্যবাসীর কাটা ঘায়ে নতুন করে নুন ছিটিয়ে দেওয়া। সালিশি পুরস্কারের নামে এই নির্লজ্জ কর্পোরেট তোষণকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এবং সরকারের অবশ্যই বিরোধিতা করা প্রয়োজন।