একটা একটা করে দিন যাচ্ছে আর ২০২৪ কাছে আসছে। দেশের শাসক আর বিরোধী দল, দুই তরফেই বিরাট হলচল। আরএসএস–বিজেপি দেখছে ১০০ বছরের মধ্যেই তাদের স্বপ্নপূরণ, এক হিন্দুরাষ্ট্র হাতের মুঠোয়। মানে সেই ব্যাটসম্যান যিনি জানেন ওভার পিছু ৩ কি ৪ রান করলেই জিত হাসিল, মধ্যে উইকেট না পড়ে গেলেই হল। অন্যদিকে বিরোধীদের বেশিরভাগই মনে করেন, প্রতি ওভারে ১২ রান না তুলতে পারলে ম্যাচ হাত থেকে বেরিয়ে যাবে, পিটিয়ে খেলা। হয় এবার, নয় নেভার। এবার যদি বিজেপিকে হারানো না যায়, অন্তত বিজেপিকে ২৪০-এর মধ্যে বেঁধে রাখা না যায়, তাহলে সম্ভবত আর কোনওদিন এই সুযোগ পাওয়া যাবে না, বিজেপি আবার ৩০০ আসনে জিতলে দেশে গণতন্ত্রের অবশিষ্টও পড়ে থাকবে না। তাঁদের এই মনে করার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে বই কী। কিন্তু আজ সেই কারণ নিয়ে আলোচনা নয়, বরং এই ধারণা জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী ঐক্যের কথা উঠেছে, এক ঐক্যবদ্ধ শক্তিই নাকি বিজেপিকে হারাতে পারে। এই ন্যারেটিভ বাজারে ঘুরছে। শরদ পাওয়ার, নীতীশ, তেজস্বী, মমতা, অখিলেশ, উদ্ধব ঠাকরে, স্তালিন, ইয়েচুরি, ডি রাজা এবং অবশ্যই কংগ্রেস নেতাদের বিভিন্ন আলোচনা বৈঠকে এই বিরোধী ঐক্যের কথা শোনা যাচ্ছে বহুদিন ধরেই। প্রথমে এক অকংগ্রেসি, অবিজেপি জোটের কথা ভাবা হচ্ছিল, তা নিয়ে কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই বোঝা যায়, তা সম্ভব নয়। কেন? কারণ এখনও দেশের ২০০টার কিছু বেশি আসনে কংগ্রেস আর বিজেপির সরাসরি লড়াই হয়। কাজেই কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে কোনও বিরোধী ঐক্য সম্ভব নয়।
এরপরে সমস্যা কংগ্রেস নিজেই, তারাও এই বিরোধী ঐক্য চায় বটে কিন্তু সেই ঐক্যের নেতৃত্বের রাশ নিজেদের হাতে রাখার প্রাক শর্তকে সামনে রেখেই আলোচনা চালাতে চায়, মানে রাহুল গান্ধীকে নেতা মানলে তবেই বিরোধী ঐক্য হবে বা হতে পারে। এমনটাই ছিল তাদের হাবভাব। কিন্তু এসবের মধ্যেই বিজেপিই মোটামুটি বিরোধী ঐক্যের দায় নিজের কাঁধে নিল। দু’ভাবে, প্রথমে তারা তাদের শরিকদলের সঙ্গে এমন দাদাগিরি করল যে সেই শরিক দলেরা এখন প্রবল বিজেপি বিরোধী, নীতীশ কুমার তো বিরোধী ঐক্যের মুখ। দ্বিতীয় হল ক্রমাগত ইডি আর সিবিআই লেলিয়ে দেওয়ার রাজনীতি, ক্রমাগত বিরোধী দলের সরকারকে ভাঙার, অপদস্থ করার রাজনীতি আজ বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক দিল্লির অর্ডিনান্সের কথাই ভাবুন, অরবিন্দ কেজরিওয়াল কংগ্রেস সভাপতির সঙ্গে বৈঠক চাইছেন আর কংগ্রেস কেজরিওয়ালকে অন্তত এই ইস্যুতে সমর্থন করছে। এই যে বাঘে আর গরুতে এক ঘাটে জল খাচ্ছে, তার কৃতিত্ব কি বিজেপির নয়? সেই হিটলারের কথা মনে করুন, রাশিয়ার সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি, উনি লড়ছিলেন ব্রিটেন, ইউরোপের সঙ্গে, হঠাৎ সেই চুক্তি ভেঙে অপারেশন বারবারোসা, রাশিয়া আক্রমণ করলেন। ব্যস, ভয়ঙ্কর কমিউনিস্ট বিরোধী ব্রিটেন, রাশিয়া আমেরিকা হাত মেলাল, হিটলারের পতন নিশ্চিত হল। না, বিজেপির ক্ষেত্রে সেই নিদান হাঁকার সময় এখনও আসেনি, কিন্তু এটা তো ঘটনা যে বিজেপির অতি সক্রিয়তার ফলেই আজ বিরোধীরা পিঠ বাঁচাতেই একে অন্যের হাত ধরছেন।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | কখনও মৌনিবাবা কখনও কেবল বকওয়াস
শেষমেশ এক প্ল্যাটফর্মে বসবেন মমতা, রাহুল, কেজরিওয়াল, অখিলেশ, সীতারাম ইয়েচুরি, এও কি কম কথা? কিন্তু সমস্যা হ্যাজ, সমস্যা আছে। প্রথম সমস্যা হল পাটনাতেই এই কনক্লেভ হলে কী হবে, এটা তো ১৯৭৭ নয়। তখন জরুরি অবস্থা আর গণতন্ত্রের দাবিতে বিরোধী দলেরা এক হয়েছিল, দলগুলো মিলে মিশে একটা নতুন দল হয়েছিল। তাদের ঐক্য ছিল এক আদর্শকে সামনে রেখে, ইডি সিবিআই-এর গেরিলা আক্রমণ সামলাতে নয়, নিজেদের গদি সামলাতে নয়, তার আগে বিরোধী নেতারা জেলে গিয়েছেন, এক দেড় বছর জেল খেটেছেন, সারা দেশের মানুষ দেখেছে এই গণতন্ত্রহীনতা, দেখেছে নাসবন্দি, পরিবার পরিকল্পনার নামে অত্যাচার। দেখেছে পুলিশের বাড়াবাড়ি। তারপর এক উজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রামীর নেতৃত্বে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নেমেছেন রাস্তায় নেমেছেন বিরোধী দলনেতারা, মানুষ নেমেছিল সেদিন, স্লোগান উঠেছিল সিংহাসন খালি করো কি জনতা আতি হ্যায়। আজ কাকে সেই জয়প্রকাশ নারায়ণের জায়গাতে বসাবেন? নীতীশ কুমার, যিনি বিরোধীদের কাছেই পরিচিত পাল্টি কুমার নামে, এ নাম তো তাঁকে বিজেপি দেয়নি, দিয়েছিলেন লালু যাদব। শরদ পাওয়ার? যিনি দেশের প্রত্যেক দলের সঙ্গে প্রয়োজনে জোট বেঁধেছেন এবং ভেঙেছেন, এই মুহূর্তে তাঁর দলের এমএলএরা বিজেপি সরকারকে সমর্থন করছেন মেঘালয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর দলের সিনিয়র নেতারা, পুরো শিক্ষা দফতর জেলে, অভিযোগ দুর্নীতির। কেজরিওয়াল? যিনি দলের মধ্যে তাঁর বিরোধীদের বের করেছেন বা বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেছেন? স্তালিন, যিনি তাঁর রাজ্যের বাইরে আর কোনও রাজনীতির কথা এতদিন বলেননি, এখন, এই সবে বলা শুরু করেছেন। বামপন্থীরা, যাঁরা এই বিরোধীদের অন্যতম শক্তি তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে কোনও ফারাকই দেখেন না এবং যাঁরা সংসদীয় রাজনীতিতে কর্পূরের থেকেও আগে উবে যাচ্ছেন। কাদের নিয়ে ঐক্য হবে?
আবার উল্টোদিকে এটাও ঠিক যে দেশজুড়ে চলছে এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, যারা সংবিধান মানে না, যাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বলে কিছু নেই, যারা নিজেদের দলের দুর্নীতির দিকে ফিরেও তাকায় না বরং স্টেট স্পনসরড করাপশন চালিয়ে যাচ্ছে। যারা দেশটাকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে চায়, যারা আদতে এক হিন্দুরাষ্ট্র চায় যা দেশকে পিছিয়ে নিয়ে যাবে মধ্যযুগে, যাদের নেতা নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় পান, যারা গণতন্ত্রকে সংখ্যাগুরুবাদে পরিণত করেছেন। কাজেই দেশের মানুষের কাছে এই জঘন্য শাসকের অপসারণ, এক স্বৈরতন্ত্রের পরাজয়কেই মূল ইস্যু, অসলি মুদ্দা হিসেবে তুলে ধরাটাই তো আপাতত সবথেকে জরুরি, এবং সেই ইস্যুকে ঘিরেই গড়ে উঠতে পারে এক বিরোধী ঐক্য। তার মানে প্রয়োজন এক আদর্শগত ঐক্য, যা এখনও পর্যন্ত নেই, যা হচ্ছে সবটাই হল সিট শেয়ারিং-এর পাটিগণিতের অঙ্ক। মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার জন্য আগে দরকার এক অভিন্ন কর্মসূচি, এক আদর্শগত ঐক্য, যার ছিটেফোঁটাও এখনও আমরা দেখতে পাইনি। এরপরের সমস্যা হল কংগ্রেসের, গতবার মানে ২০১৯-এর নির্বাচনে ১৯০টা আসনে কংগ্রেস-বিজেপি মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল, কংগ্রেস পেয়েছিল ১৫টা, মাত্র ১৫টা আসন। বিজেপি পেয়েছিল ১৭৫। আবার ক্রিকেটের ভাষায় স্ট্রাইক রেট, বিজেপির স্ট্রাইক রেট ছিল ৯২.১ শতাংশ, কংগ্রেসের স্ট্রাইক রেট ছিল ৭.৯ শতাংশ । ১০০ বলে ৮ রান করে তো ম্যাচ জেতা যায় না, কাজেই কংগ্রেসকে এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। এটা ঘটনা যে হিমাচলপ্রদেশ বা কর্নাটকের পর থেকে কংগ্রেস কর্মীরা উজ্জীবিত, কিন্তু এটুকুতেই তো হবে না, ৮ শতাংশ অন্তত ৫১ শতাংশতে নিয়ে যেতে হবে। সেটাই সমস্যা।
বিরোধীদের কী হিসেব ছিল, সেটাও দেখে নেওয়া যাক, যেখানে বিজেপি আর অকংগ্রেসি দলের সঙ্গে মোকাবিলা হয়েছে, সেখানে বিজেপির স্ট্রাইক রেট ছিল ৬৯.২ শতাংশ আর বিরোধীদের ৩০.৮ শতাংশ, আসনের হিসেবে ১৮৫টা আসনে বিজেপি ১২৮, অকংগ্রেসি দলগুলো ৫৭। কংগ্রসের থেকে অনেক ভালো, কিন্তু বিজেপিকে হারানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আবার কিছু আসন আছে যেখানে কংগ্রেস বনাম অবিজেপি বিরোধী দলের লড়াই হয়েছে, সেখানে কংগ্রেসের স্ট্রাইক রেট ৫২.১ শতাংশ, বিরোধী দলগুলোর স্ট্রাইক রেট ৪৭.৯ শতাংশ, আসনের হিসেবে ৭১টা এমন আসনের মধ্যে ৩৭টা আসন কংগ্রেসের ৩৪টা আসন বিরোধীদের। হ্যাঁ, এই হিসেবেই সমস্যা লুকিয়ে আছে। সে সমস্যা মেটাতে হলে কংগ্রেসকে বেশ কিছু আসন ছাড়তে হবে, অবিজেপি অকংগ্রেসি দলগুলোকেও ছাড় দিতে হবে? ছাড় দেবেন তাঁরা? সমস্যা নম্বর দুই হল বিজেপির বিরাট জয়কে মুছে বিরোধীদের জিততে হবে। বিজেপির জয় কতটা বড় ছিল? ২০১৯-এ ৫০ শতাংশের বেশি আসনে জিতেছিল বিজেপি এমন আসনের সংখ্যা ৩০৩-এ ২২৪, মানে প্রায় ৭৪ শতাংশ। আর কংগ্রেসের? ৫২টার মধ্যে ১৮টা আসনে কংগ্রেস ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল। যদি কংগ্রেস এবং অন্য অবিজেপি দলগুলোকে মিলিয়ে হিসেব করা হয় তাহলে বিজেপি ২২৪টা আসনে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল, আর কংগ্রেস অবিজেপি দলগুলো মিলে ১১৭টা আসন পেয়েছিল। মানে এই মুহূর্তে বিজেপির কাছে সেফ সিট ২২৪ আর বিরোধীদের কাছে সেফ সিট ১১৭। অর্থাৎ সেরকম হাওয়া তোলা না গেলে, মানুষের কাছে নতুন খবর না পৌঁছে দিলে বিজেপি অনেক এগিয়ে থেকেই খেলতে নামবে, অবিজেপি দলেদের শুরু করতে হবে ১১৭ থেকে। এরপরের সবথেকে বড় সমস্যা হল, তেলঙ্গানা, পঞ্জাব, দিল্লি, বাংলা, কেরল আর উত্তরপ্রদেশে। তেলঙ্গানায় লড়াই বিআরএস আর কংগ্রেসের মধ্যে, ঐক্য সম্ভব? পঞ্জাব, দিল্লিতে কেজরিওয়াল কংগ্রেসকে আসন ছেড়ে দেবে? সেখানে ঐক্যের ফর্মুলা কী? কেরলে কংগ্রেস-সিপিএম লড়াই, কী হবে? কেরলে কুস্তি দিল্লিতে দোস্তি? বাংলায়? কংগ্রেসকে আসন ছেড়ে দেবেন মমতা? ঐক্য হবে? তাহলে সেই সাধের লাউ, মানে বাম-কংগ্রেস ঐক্যের কী হইবে? উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস-সমাজবাদী দলের ঐক্য সম্ভব? ফর্মুলাটা কী হবে? হ্যাঁ, আপাতত এটাই সবথেকে বড় ফল্ট লাইন, এখানেই জট লেগেছে, সেই জট না খুলে পাটনা, চেন্নাই, হায়দরাবাদ বা দিল্লিতে হাত ধরাধরি করে ছবি তোলাই সার হবে, বিজেপিকে হারানো যাবে না। এবং আমি অন্তত এই ব্যাপারে একমত যে এবার বিজেপি তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসলে বচাখুচা, অবশিষ্ট গণতন্ত্রের গঙ্গাযাত্রা আটকানো যাবে না।