রাষ্ট্রের উদ্ভবের অন্যতম কারণ ছিল মাৎসন্যায়, বিশৃঙ্খলা। বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খাচ্ছে, আরও বড় মাছ সেই বড় মাছকে খাচ্ছে, যে যার ইচ্ছে তাই করছে। এমন এক অবস্থায় মানুষ এক জায়গায় বসে এক ব্যবস্থার কথা ভাবে, যেখানে একজন বা কয়েকজনের নেতৃত্বে দেশ চলবে, এক নির্দিষ্ট এলাকার মানুষজন সেই শাসক বা শাসকদের খাজনা বা টাক্স দেবে, বদলে সেই শাসক এক আইনের শাসন নিশ্চিত করবেন, যেখানে, যার যা ইচ্ছে তেমন করার অধিকার থাকবে না, যেখানে কেবল সবল হলেই দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করা যাবে না। এই চুক্তির ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে রাষ্ট্র এবং তা আধুনিক হয়েছে, আইন কানুন আরও অনেক যুক্তিসঙ্গত করা হয়েছে, করার কাজ চলছে। সে যে-ই আসুক ক্ষমতায় তাকে কিছু নিশ্চিত আইন মেনে দেশ চালাতে হবে এবং মানুষ তার দেয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ খাজনা দেবে। রাজা থাকুক মাথায় বা গোষ্ঠী বা নির্বাচিত সরকার, এটাই হল রাষ্ট্রের চেহারা, রাষ্ট্রের মূল কাঠামো। এর বিপরীতে এক ধারণা আছে যা মধ্যযুগের বললেও ভুল বলা হবে, সে ধারণায় রাজা তাঁর শৌর্য বীর্য দিয়ে অন্যদের পরাজিত করে রাজা হন। মনুসংহিতা বলছে, রাজার দিকে তাকিয়ে কথাও বলা যাবে না, রাজার আদেশ না পালনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি। মোদ্দা কথা হল, রাজা হল রাজা, তিনি যেমন মনে করবেন তাই হবে। এদিকে আমাদের দেশে এমনকী ইংরেজ শাসনেও আদালত ছিল, আইন ছিল, অন্যায় বিচার হত, কিন্তু বিচার হত। একটু উদাহরণ দেওয়া যাক, ক্ষুদিরাম তো বোমা মেরেছিলেন, তাঁর ছোড়া বোমায় কিংসফোর্ড না হোক দু’জন ইংরেজ তো মারা গেছেন, ইংরেজরা তো তাঁকে ধরে গুলি করে দেয়নি। ভগৎ সিংকে পুলিশকর্তা স্যান্ডার্স হত্যায় অভিযুক্ত করা হয়। মানে মাথায় রাখুন ভগৎ সিং আইন সভায় বোমা ফেললেন, কিন্তু সেই অভিযোগে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পরে তাঁর ফাঁসি হচ্ছে না, হচ্ছে স্যান্ডার্স হত্যার অভিযোগে। ধরুন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, পরবর্তী সময়ে ধরা পড়ার পরে বিচার হওয়ার পরে সূর্য সেন, তারকেশ্বর ঘোষদস্তিদারকে ফাঁসি দেওয়া হল, অনন্ত সিংহ থেকে গণেশ ঘোষের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। সবাইকে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারা হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সবার চোখের সামনেই সতবন্ত সিং বিয়ন্ত সিং ইন্দিরা গান্ধীর বডিগার্ড, তারা ঝাঁঝরা করে দেয় ইন্দিরার শরীর। তাদেরকে কি সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করে মারা হয়েছিল? না। বিচার চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে, তারপর ফাঁসি হয়েছে। বা ধরুন কাসভ, সে তো আমাদের দেশের নাগরিকও নয়, একজন টেররিস্ট, অসংখ্য মানুষকে খুন খুনের ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত, কিন্তু তারও বিচার হয়েছে, তারপর ফাঁসির রায় দিয়েছে আদালত। সভ্য রাষ্ট্রে এটাই তো নিয়ম।
সভ্য রাষ্ট্র যখন অসভ্যদের হাতে গিয়ে পড়েছে, তখন নিয়মের ব্যতিক্রম হয়েছে বইকী। বহু ইসলামিক দেশে শাসকের যথেচ্ছাচার আমরা দেখেছি, আফ্রিকার কিছু দেশে শাসকের রাজা হয়ে ওঠা দেখেছি। আমাদের দেশেও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দেখেছি, কিন্তু এই ১৪তে মোদি–শাহ ক্ষমতায় আসার পরে এটা কী চলছে? এক ভয়াবহ অবস্থা। ফেক এনকাউন্টারকে এখন এনকাউন্টার বলা হয়। এনকাউন্টার মানে দুষ্কৃতী গুলি চালাচ্ছে, তাদের হাতে অস্ত্র আছে, পুলিশও আক্রান্ত, কাজেই পুলিশও গুলি চালাচ্ছে। এই এনকাউন্টারে পুলিশ মারা গিয়েছে, বা আহত হয়েছে, দুষ্কৃতীও মারা গেছে, এটা হল এনকাউন্টার। কিন্তু এখন? অন্তত সিনেমায় আর উত্তরপ্রদেশে? পুলিশ অভিযুক্তদের ধরছে, গুলি করে মারছে, বলছে এনকাউন্টারে মারা গেছে। মুখ্যমন্ত্রী গর্ব করে জানাচ্ছেন, কেবল এনকাউন্টারেই মারা গেছে বা আহত হয়েছে ১০ হাজার অপরাধী। অর্থাৎ তিনিই ঠিক করছেন কে অপরাধী কে নয়। তার ফল হাতের সামনে। আদিত্যনাথ যোগীর এই সর্বনেশে আইনের শাসনে একজন ধর্ষিতাকে ধর্ষণ করা হয়, খুন করার চেষ্টা করা হয়, সে হাসপাতালে মারা যাওয়ার পরে তার মৃতদেহ মাঝরাতে শুনশান জায়গায় পুড়িয়ে ফেলা হয়, ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল বের হয়। একজন ধর্ষকও কি পুলিশের গুলিতে মারা গেছে? না। একজনও না। উন্নাওয়ের ঘটনা দেখুন, ধর্ষকরা জামিন পেল, ছাড়া পেয়েই অভিযোগকারীর ঘরে ঢুকে ঘর ভেঙে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে, যেখানে জ্যান্ত শিশুও আগুনে পুড়ে মারা যাচ্ছে। তিনদিন হয়ে গেছে পুলিশ কাউকে গুলি করে মেরেছে? ধরুন লখিমপুর খেরি, গাড়ির চাকার তলায় পিষে মারা হল, হাজার মানুষের সামনে, মন্ত্রীপুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি জামিনে, একজনও ধরা পড়েনি, পুলিশ একজনকেও গুলি করে মারেনি।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | জওয়ানরা মারা গিয়েছেন পুলওয়ামায়, আসল রহস্য মোদিজির জানা ছিল?
তার মানে খুব পরিষ্কার, শাসকের ইচ্ছে হলে তবেই গুলি করে মারবে, না হলে নয়। মানে মুখ্যমন্ত্রীই ঠিক করে দিচ্ছেন কে অপরাধী কে অপরাধী নয়। সেই ধারাবাহিকতা ধরেই আতিক আশরফের হত্যা, তার আগে আতিক আহমদের ছেলে আসাদ সমেত চারজনের এনকাউন্টার। তাদেরকে কেন মারা হল? কারণ মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন মিট্টি মে মিলা দেঙ্গে, বলেছেন ঠোক দো। আতিক আহমদ এবং আশরফের হত্যার ব্যাপারটা আরেকবার দেখা যাক। দুজনকে রাজস্থানের জেল থেকে প্রয়াগরাজে উমেশ পাল হত্যা মামলার জন্য আনা হচ্ছে। এর আগেই এই দুজনেই রাজু পাল হত্যাকাণ্ডে কনভিক্ট, শাস্তিপ্রাপ্ত আসামী। এরা দুজনেই আলাদা আলাদা করে আদালতকে জানায় যে আমাদের মেরে ফেলার চক্রান্ত চলছে। আদালত বলে, আপনাদের সুরক্ষার দায়িত্ব রাজ্য প্রশাসনের। যেদিন এই দুজনকে হত্যা করা হচ্ছে, তার একদিন আগে এদের মধ্যে আতিক আহমদ যিনি এলাহাবাদ ইস্ট-এর পাঁচবারের বিধায়ক ছিলেন, ফুলপুরের সাংসদ ছিলেন, তাঁর ছেলেকে এনকাউন্টার করা হচ্ছে। পরের দিন ছেলের দেহ কবর দেওয়া হচ্ছে। আতিক আশরফকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছিল, তাদের একজনের তরফেও শরীর খারাপ বা অসুস্থতার কোনও ইঙ্গিত পর্যন্ত ছিল না। তবুও তাদের মেডিক্যাল চেকআপের জন্য লকআপ থেকে বাইরে আনা হয় রাত ১০টায়। এই চেকআপ অনায়াসে তার পরের দিন সকালেও করা যেত। ধরে নেওয়া যাক এদের হত্যাকারীরা হত্যার পরিকল্পনা করছিল, কিন্তু তারা জানল কীভাবে যে এদের ঠিক রাত ১০টায় হাসপাতালে আনা হবে? কেবল তাই নয়, এই খবর নিশ্চয়ই কিছু সংবাদপত্রের কিছু সাংবাদিকদেরও জানানো হয়েছিল। এবার খেয়াল করুন যে হত্যাকারীরাও এল সাংবাদিকদের ছদ্মবেশে, হাতে ক্যামেরা মাইক বুম নিয়ে। তার মানে তারাও জানত ওখানে সাংবাদিকরা থাকবে। কে তাদের জানাল? জানা গেছে ওখানে ১০ জন পুলিশকর্মী ছিলেন, এত হাই প্রোফাইল অপরাধীদের নিয়ে যাওয়া আসার সময়ে তাঁদের কাছে অস্ত্র ছিল? যদি থেকে থাকে তাহলে তারা একটা গুলিও কেন চালাল না? যদি না থেকে থাকে তাহলে সেটাও তো আর এক প্রশ্নের জন্ম দেয়?
এই যারা হত্যা করল আতিক আশরফকে তাদের তিনজন তিন প্রান্তের, তারা এক জায়গায় এল কী করে? কে তাদের এই কাজ করতে বলল? এদের তিনজনেই আগে খুব ছোটখাটো অপরাধ বা বড় জোর সাধারণ পাইপগান ব্যবহার করেছে। কে তাদের তিনখানা ৫ লাখি টার্কির পিস্তল জিগানা এনে দিল? এই তিনজনকে আতিক আশরফ হত্যার পরে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হল না, সোজা জেল হেফাজতে পাঠিয়ে দেওয়া হল, এ আবার হয় নাকি? পুলিশ কোনও তদন্তই করল না নাকি পুলিশ সব জানে, তদন্ত শেষ? এরকম অসংখ্য প্রশ্নই বলে দেয় যে আতিক আশরফ হত্যা এক কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার, প্ল্যানড মার্ডার। মাস্টার মাইন্ড কে? যিনি বলেছিলেন ঠোক দো, সেই আদিত্যনাথ যোগী? পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে? অন্যান্য ফেক এনকাউন্টারের মতো এটা ছিল একটা ফেক মার্ডার, কিন্তু এটা তো করা যায় না, এরকমটা তো রাষ্ট্রের আইন কানুন বলে না। হায়দরাবাদে ধর্ষণের পরে তিনটি ছেলেকে গ্রেফতার করার পরে এনকাউন্টার করে মারা হল, রাষ্ট্র চাইল তাই এনকাউন্টার হল। আর অন্যদিকে গুজরাতে অন্য ছবি। ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০২, গোধরায় ট্রেনের কামরায় আগুন লাগানো হল, ৫৯ জন করসেবক আগুনে পুড়ে হয় ঘটনাস্থলে, না হলে হাসপাতালে মারা গেলেন। তাঁদের দেহ পরদিন সকালে হাসপাতালের সামনে রাখা হল, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। ভয় পেলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার, পাঁচমাসের গর্ভবতী বিলকিস বানো তার সাড়ে তিন বছরের মেয়ে আর পরিবারের অন্য ১৫ জন সদস্য তাদের গ্রাম, রাধিকাপুর, গোধরা ছেড়ে পালালেন পাশের জেলা ছাপরভাদে। ৩ মার্চ, মাথায় রাখুন গোধরায় ট্রেনে আগুন লাগানোর পরে গোধরা সমেত সারা গুজরাতে দাঙ্গা শুরু হয়েছে, যা মোদিজির ভাষায় রি-অ্যাকশন, ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া। সেই ২৭ ফেব্রুয়ারির চার দিনের মাথায় ২৫-৩০ জন মানুষ, তাদের হাতে অস্ত্র, তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল এই আশ্রয়হীন অসহায় পরিবারের ওপরে। মহিলাদের ধর্ষণ করল, তার মধ্যে ছিল পাঁচমাসের গর্ভবতী বিলকিস বানো, তার মা এবং আরও তিনজন মহিলা। এখানেই শেষ? না, কেবল ধর্ষণ নয়, ওই ধর্ষণের পরে তাদের পরিবারের বিলকিস, তিন বছরের এক শিশু, একজন পুরুষ বেঁচে ছিল। ৮ জনের মৃতদেহ ওখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল, ৬ জনকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। জ্ঞান ফেরার পরে উলঙ্গ বিলিকিস বানোকে এক আদিবাসী মহিলা একটা কাপড় দেয়, সেটা গায়ে জড়িয়ে সে লিমখেডা পুলিশ স্টেশনে হাজির হয়, তারা অভিযোগ দায়ের করে না। বিলকিস গোধরা রিলিফ ক্যাম্পে যায়, সেখান থেকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং থানায় অভিযোগও দায়ের করানো হয়। এই ধর্ষণের বিচারে ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়।
আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন আজ হলে তো তাদের গুলি করে মারা হত, তাই না? ভুল ভাবছেন, ধর্ষিতা হয়েছিলেন বিলকিস বানো, ধর্ষণ করেছিল গোধরার বিজেপি এমএলএ-র ভাষায় কোট আনকোট ১১ জন সংস্কারী ব্রাহ্মণ, তাই তাদের গুজরাত সরকার জেল থেকে ছেড়ে দিল। এক ধর্ষণের পর ধর্ষকরা লাশ হয়ে পড়ে থাকে, অন্য ধর্ষণের পরে ধর্ষকদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়, গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে মিষ্টি খাওয়ানো হয়। এটাই আপাতত আমাদের দেশ, আমাদের রাষ্ট্র এখন কিছু স্বেচ্ছাচারীদের হাতে, তাদের ইচ্ছে মতো আইন গড়া হচ্ছে, ভাঙা হচ্ছে, লেখা হচ্ছে, বদলানো হচ্ছে।