১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে শ্রীনগর ভ্যালি থেকে ২৫৪৭ জন জওয়ানকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল জম্মুতে। এই বিশাল রুটে যে কোনও সময় উগ্রপন্থীদের আক্রমণ হতেই পারে, জানা ছিল। আর্মি স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর, এসওপি, মানে যে সাধারণ নিয়ম মেনে সেনাবাহিনী কাশ্মীর বা উত্তর পূর্বাঞ্চলে কাজ করে, তাতে সাফ বলা আছে পাঁচ কি সাত গাড়ির বেশি কনভয় নিয়ে জওয়ানেরা বের হবে না। কিন্তু ২৫০০ জওয়ানকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার ছিল ৮০টার মতো আর্মি ট্রাক। সেই সিদ্ধান্ত ছিল বিপজ্জনক, তাই সিআরপিএফ-এর তরফে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে চিঠি লিখে জানানো হয় যে এই বিরাট ট্রান্সফারের জন্য তাদের ৫টা বিমান লাগবে। না, সেদিন মাত্র ৫টা বিমান দেওয়া হয়নি জওয়ানদের। ৭৮টা গাড়ির কনভয় বেরিয়েছিল শ্রীনগর ভ্যালি থেকে। সেদিন আমাদের দেশপ্রেমিক প্রধানমন্ত্রী কাউবয় সেজে জিম করবেটে অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার খেলা খেলছিলেন ডিসকভারি চ্যানেলের সঙ্গে। সেই দিনেই ওই আর্মি কনভয়ের ওপর আক্রমণ হয়। ৪০ জন জওয়ান মারা যান। সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীকে এত বড় ঘটনার খবর দেওয়া যায়নি, কারণ তিনি ওই যে, ডিসকভারি চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে অভিনয় করছিলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পরে উনি ঘটনার খবর পান এবং ফেরার পথে রাস্তার এক ধাবা থেকে সেই সময়ের রাজ্যপাল সতপাল মালিককে ফোন করেন। রাজ্যপাল ওনাকে বলেন, ওরা ৫টা প্লেন চেয়েছিল, আমরা সেটাও দিতে পারিনি, এই ঘটনার দায় তো আমাদের। সামনে নির্বাচন, মোদিজি বিশ্বের অনেক কিছুই বোঝেন না, কিন্তু নির্বাচন বোঝেন, তিনি জানেন এই ইস্যু কতটা কাজে লাগতে পারে, তিনি রাজ্যপাল সতপাল মালিককে বলেন, এ নিয়ে কোনও কথা বলার প্রয়োজন নেই, তুমি চুপ করে থাকো।
কে এই কথা জানাচ্ছেন? সতপাল মালিক নিজেই। কেবল এটাই নয় তিনি জানাচ্ছেন, ওই বিশাল রাস্তায় অন্তত ৯-১০টা জায়গায় ছোট রাস্তা এসে মিলেছে, যেখানে প্রহরা ছিল না। তার মানে প্রথম সিকিউরিটি ল্যাপস হল এতবড় ৭৮ জনের কনভয় পাঠানো, দ্বিতীয় সিকিউরিটি ল্যাপস হল, এই গোটা রুটে যে অন্য রাস্তা মিশেছে তাতে প্রহরা না রাখা। তিন নম্বর যে তথ্য সতপাল মালিক দিলেন তা আরও ভয়ঙ্কর। ওই পুলওয়ামা এলাকায় একটা গাড়ি ৩০০ কেজি আরডিএক্স নিয়ে ওই ঘটনার আগে ৭-৮ দিন ধরে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছিল। অর্থাৎ কেবল সিকিউরিটি ল্যাপস নয়, বিরাট ইন্টলিজেন্স ফেলিওরের ফলেই দেশের ৪০ জন জওয়ান মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব গোপন করে রাখা হয়েছিল, কারণ তখন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক জঙ্গি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেওয়াটাই ছিল নরেন্দ্র মোদির প্রথম কাজ। আর সে তো কেবল সতপাল মালিকের কথা থেকে নয়, অর্ণব গোস্বামীর সেই মোবাইলের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের কথা মনে করুন, যেখানে অর্ণব উল্লসিত, এই পুলওয়ামা বিজেপিকে বিরাট জয় এনে দেবে, অর্ণব মেসেজ করেছিলেন। জওয়ানদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে এমন নির্লজ্জ রাজনীতি করেছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী? করেননি? সতপাল মালিক, জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন রাজ্যপাল মিথ্যে বলছেন? বেশ তো সেটাই বলুন না প্রধানমন্ত্রী, তদন্ত হোক, সে রিপোর্ট সামনে আনুন। কেবল তাই নয়, সতপাল মালিকের ভাষায় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি নিয়ে যে খুব চিন্তিত তাও নয়, দুর্নীতির সুস্পষ্ট অভিযোগের পরেও তিনি কোনও ব্যবস্থা নেননি বলে সতপাল মালিক অভিযোগ করেছেন।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | সম্রাট মোদি জমানায় রামরাজ্য, বিচার এবং হত্যা
কীরকম দুর্নীতি? সতপাল জানাচ্ছেন, উনি রাজ্যপাল থাকাকালীনই জম্মু-কাশ্মীরের সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটা ইনসিওরেন্স পলিসি নিয়ে এসেছিল রিলায়েন্স। সে প্রস্তাব পাশ হওয়ার পরে রাজ্যপালের কাছে যায়, তিনি দুটো কারণে সেটা বাতিল করেন। প্রথম কারণ ছিল ওই ইনসিওরেন্স-এর জন্য সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে পয়সা নেওয়া হচ্ছিল। দু’ নম্বর কারণ হল, গুচ্ছের ওঁচা হাসপাতালের লিস্ট গুঁজে দেওয়া হয়েছিল। উনি এই প্রস্তাব বাতিল করার পরের দিন সকাল সাতটায় আরএসএস-বিজেপির অন্যতম মুখ রাম মাধব তাঁর বৈঠকখানায় এসে হাজির হন। ওই প্রস্তাব রিজেক্ট করে চিঠি পাঠানো হয়ে গেছে শুনে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়েছিলেন। একই ভাবে জম্মু-কাশ্মীরের রোড কনস্ট্রাকশনের একটা ফাইল পাশ করার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলেও তিনি জানান। এরপরের অভিযোগ সরাসরি নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে। কাশ্মীর থেকে ওনাকে গোয়ার রাজ্যপাল করে পাঠানো হয়, গোয়াতে তখন বিজেপির সরকার। তিনি দেখেন খুল্লমখুল্লা দুর্নীতি চলছে, তিনি ব্যক্তিগতভাবেই এই দুর্নীতির খবর নরেন্দ্র মোদির কানে তোলেন। ক’দিনের মধ্যেই তাঁকে গোয়া থেকে মেঘালয়ে পাঠানো হয়, এত তাড়া ছিল পাঠানোর যে এক সৈন্যবাহিনীর বিমানে তাঁকে বসিয়ে দেওয়া হয়, যা তাঁকে গোয়া থেকে উড়িয়ে নিয়ে যায় গুয়াহাটিতে। আচ্ছা এসব সতপাল মালিক বলছেন কেন? তিনি কি রাজনীতিতে ফিরতে চান? সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, না তিনি আর কোনওদিন অ্যাক্টিভ পলিটিক্স-এ আসতে চান না। এবং এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের শেষে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র ভাই দামোদরদাস মোদি মানুষটা কীরকম? উনি দুটো কথা বলেছেন। তার প্রথমটা হল উনি দুর্নীতি নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন, দুর্নীতি হচ্ছে এবং কোথায় হচ্ছে সেটাও তাঁর জানা। গৌতম আদানির দুর্নীতির পিছনে ওনার সমর্থন রয়েছে যে কারণে সংসদের বাইরে এবং ভেতরে এত বড় অভিযোগ আসার পরেও উনি মুখও খোলেননি। উনি মুখ খুললে বিজেপির কোনও অস্তিত্ব থাকবে না, একা গৌতম আদানিই বিজেপিকে শেষ করে দেবে।
সতপাল মালিক কি এসব বানিয়ে বলছেন? মনমোহন আমলে, ওনার মন্ত্রিসভার কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছিল, এ রাজা বা কানিমোঝি ইত্যাদির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ ছিল, সংসদে এ বিষয় আসার পরে মনমোহন মামলা সিবিআই-এর হাতে দেন, সিবিআই এঁদের গ্রেফতারও করে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি? আদানিকে নিয়ে অজস্র প্রশ্নের সম্মুখীন, কিন্তু আদানি নিয়ে একটাও কথা বলেছেন, বিরোধীরা আমার নামে সুপারি দিয়েছে, বিরোধীরা দেশের অপমান করছে, আমি তো ফকির, আমার কাজে হতাশ বিরোধীরা দুর্নীতির অভিযোগ আনছেন ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু একবারের জন্যও আদানি শব্দটাও উচ্চারণ করেননি। কেন? সিবিআই-এর হাতে তুলে দিন, সিবিআই তদন্ত করুক, না উনি এটা করেননি। সতপাল মালিক ঠিক এই কথাটাই বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি এই তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন না, কারণ তাহলে ঝোলা থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়বে। নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে তিনি দ্বিতীয় কথাটা যা বলেছেন তা এক ওপেন সিক্রেট। তা হল, উনি ‘ইল ইনফর্মড’। আসলে সতপাল মালিক স্বল্পবাক, কিন্তু খুব একটা কটু কথা ব্যবহার করেন না। করলে বলতেন, নির্বোধ, মূর্খ, ইগনোর্যান্ট। এসব না বলে তিনি আলতো করে বলেছেন ‘ইল ইনফর্মড’। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে কোনও খবরই রাখেন না, তাঁর জানাই নেই কাশ্মীরে সমস্যাটা ঠিক কোথায়। নানান বিষয়েই তিনি ইল ইনফর্মড। সতপাল মালিক এর বেশি উদাহরণ দেননি। আসুন আমরা সেই উদাহরণগুলোকে হাজির করি।
উনিই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি জন গণ মন অধিনায়ক, মানে জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন বিদেশে গিয়ে হাঁটতে শুরু করেছিলেন। উনিই সেই বিচক্ষণ মানুষ যিনি মনে করেন পুরাণ কাহিনিতে গণেশের মাথায় হাতির মাথা বসানোটা আসলে প্লাস্টিক সার্জারির বিষয়। উনিই বিশ্বের প্রথম ম্যাথমেটিসিয়ান যিনি এ প্লাস বি ইন্টু ব্রাকেট হোলস্কোয়ার ইনটু ব্রাকেট-এ একটা এক্সট্রা টুএবি পেয়ে যান। তাঁর প্রশ্ন, ইয়ে এক্সট্রা টুএবি কহাসে আতা হ্যায়? উনিই প্রথম বৈজ্ঞানিক যিনি বিশ্ববাসীকে জানান যে, প্লেনকে মেঘের আড়াল দিয়ে নিয়ে গেলে কোনও রাডারের চোখে তা পড়বে না। উনিই প্রথম উদ্ভাবক যিনি জি-মেল আবিষ্কার হওয়ার বহু আগেই ফটো অ্যাটাচ করে মেল পাঠিয়েছিলেন। উনিই প্রথম পর্বতারোহী যিনি মানস সরোবর যাত্রায় ২৩ হাজার ফিট উঁচুতে ট্রেক করেছিলেন। জানিয়ে রাখি মানস সরোবর যাত্রায় সবচেয়ে উঁচু জায়গা হল কৈলাস পর্বত যার উচ্চতা ২১৭৭৮ ফিট এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন তীর্থযাত্রীদের কাছে এক পুণ্যস্থান হওয়ার সুবাদে কৈলাস শৃঙ্গে কেউ ওঠার চেষ্টাও করে না। নরেন্দ্র মোদি শুধু ওঠেননি, তিনি শৃঙ্গ জয় করার পরে ২৩ হাজার ফিট পর্যন্ত লাফও দিয়েছিলেন। এবং সব শেষে জানাই তিনিই এ বিশ্বে একমাত্র শিশু যিনি পুকুর থেকে কুমির ধরে বাড়ি ফিরেছিলেন। সত্যি, এসব গল্প শুনলে আমাদের প্রতিভাবান প্রধানমন্ত্রীকে ঘনাদা টেনিদার চেয়েও বড় বলেই মনে হয়। এই নরুদাকে নিয়ে সিনেমা করুন সৃজিৎ কিংবা কৌশিক, জাতীয় পুরস্কার বাঁধা।