বিরোধী জোট, বিরোধী ঐক্য এসব কথা শুনলে ফাজিল বেড়াল মুচকি হাসে। তৃতীয় ফ্রন্টের কথা অকংগ্রেসি, অবিজেপি রাজনৈতিক জোটের কথা শুনলে ভারি আমোদ হয় মোদি-শাহের। কিন্তু সেই কবে থেকেই ভারতবর্ষে বিরোধী দলেরা একসঙ্গে এসেছে, একে অন্যকে ফুল মালা পরিয়েছে, তারপর ধুতি খুলিয়ে দৌড় করিয়েছে। জনতা জনার্দন সেই তখন থেকেই এই বিরোধী ঐক্য আর তৃতীয় ফ্রন্টের কথা শুনলেই ব্যাঁকা চোখে তাকায়, কিংবা পাত্তাও দেয় না। স্বাধীনতার পরে ১৯৬৭ ছিল প্রথম নির্বাচন যখন নেহরু প্রধানমন্ত্রিত্বে নেই, মারা গেছেন। ওই ৬৭তেই প্রথম অকংগ্রেসি দলগুলোর মধ্যে এক বোঝাপড়া করার সূত্রপাত হয়েছিল। সংযুক্ত বিধায়ক দল, এসবিডি বা সবদ। পিএসপি, এসএসপি, লোক দল, ক্রান্তি পার্টি, বিজেপির উৎস সংগঠন জনসঙ্ঘ ইত্যাদির বিধায়ক মানে এমএলএরা মিলে মিলিজুলি সরকার বানিয়েছিল বিভিন্ন রাজ্যে। উত্তরপ্রদেশ সমেত সাতটা রাজ্যে এই সবদ-এর সরকার তৈরি হয়েছিল। আদর্শে, সংগঠন কাঠামোর দিক থেকে বিশ্রীরকমের আলাদা হলেও এই দলগুলো কমন মিনিমাম এজেন্ডা ছিল কংগ্রেস বিরোধিতা। রাজ্যে রাজ্যে সরকার হল বটে কিন্তু যথারীতি টিকল না, টেকার কথাও নয়। এরপরে ইন্দিরা নিজের দলকে বামপন্থী করে তোলার উদ্যোগ নিলেন, সমর্থনে এল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। সিপিএম বাদে বাকিরা সম্মিলিত বিরোধী, সিপিএম বিরোধী কিন্তু একলা। প্রথমে রাজন্য ভাতা বিলোপ, ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ, কয়লাখনি জাতীয়করণ ইত্যাদি পদক্ষেপে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোই পালটে দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর বিরোধীরা যখন ইন্দিরা হটাও বলছেন, তখন ইন্দিরা স্লোগান দিয়েছিলেন গরিবি হটাও।
৭১-এ বিরাট জয় ইন্দিরা এবং কংগ্রেসকে আবার নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। এরপর জরুরি অবস্থা, সম্পত্তির অধিকার, মৌলিক অধিকার থেকে সরিয়ে নেওয়া, সংবিধানের ভূমিকাতে সেকুলার এবং সমাজতান্ত্রিক শব্দ জুড়ে ইন্দিরা গান্ধী তখন আরও বামপন্থী এবং সোভিয়েত ব্লকের আরও কাছাকাছি। কিন্তু ওই জরুরি অবস্থাই কাল হল, এক মিলিজুলি খিচুড়ি দল ক্ষমতায় এল। নেতৃত্বে জয়প্রকাশ এবং স্লোগান একটাই, ইন্দিরা হটাও। হলও তাই, ইন্দিরা পরাজিত ১৯৭৭-এ, যদিও দেশজুড়ে নয়। উত্তর ভারতে প্রায় মুছে গেলেও অন্ধ্রে চমকে দেওয়ার মতো ফলাফল, ৪২টা আসনে ৪১টা কংগ্রেসের। কর্নাটকে ২৮টার মধ্যে ২৬টা কংগ্রেসের। এবং সেই জনতা দলের খিচুড়ি সরকারও টিকলো না, ইন্দির গান্ধীর ফিরে আসা ছিল অনিবার্য। মূলত ক্ষমতার মধুভাণ্ড নিয়ে বিরোধী দলের আকচা আকচি আর জনসঙ্ঘ নেতাদের ডুয়াল মেম্বারশিপের কাজিয়ার ফলে ভেঙে গেল বিরোধী ঐক্য। এরপর আমরা দেখলাম রাজীব মন্ত্রিসভা থেকে ভি পি সিংকে বেরিয়ে গিয়ে বোফর্স ইস্যুতে বিরোধী ঐক্যের কথা বলতে। একপাশে বিজেপি, লালকৃষ্ণ আদবানি, বাজপেয়ী, অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টি, জ্যোতি বসু, হরকিষেণ সিং সুরজিৎ। সে আরেক খিচুড়ি সরকার, তৈরিই হয়েছিল ভাঙার প্রত্যেক উপাদান সঙ্গে নিয়েই। কিন্তু ওই সরকারের অধ্যেই আজকের সরকারের বীজ লুকিয়ে ছিল, কারণ আদবানি আর বাজপেয়ীর হাত ধরে আরএসএস–বিজেপি সেই প্রথম দেশের সেন্টার স্টেজে। তারপরেই রথযাত্রা, বাবরি মসজিদ ভাঙা। পর পর প্রধানমন্ত্রী এসেছে এবং পদত্যাগ করেছে। ক্রমশ বিজেপির শক্তি বেড়েছে, ইউপিএ-ও ছিল এক রামধনু বিরোধী জোট, কিন্তু তা ততদিনে বিজেপি বিরোধিতার ভিত্তি পেয়েছে। অতএব রাস্তা খুলে গেল বিজেপির। ২০১৪তে বিজেপি আসার আগেই কমিউনিস্টরা আরও দুর্বল, বাংলা হাতছাড়া। এবং বাতাসে ভাসছে তৃতীয় ফ্রন্ট, বিরোধী ঐক্য। কিন্তু মানুষ যথেষ্ট বিরক্ত, মানুষ এক স্থায়ী সরকার চায়। অন্যদিকে এমনও নয় যে ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে কোনও শক্তিশালী একটা দল আছে, যে দল বিজেপিকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারে। বিজেপি সরকারকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্য অনেকের আছে, কিন্তু তার জন্য আবার সেই বিরোধী ঐক্য দরকার। সে ঐক্য কীভাবে গড়ে উঠবে? কে তার মাথায় থাকবে? কে নেতৃত্ব দেবেন? তা নিয়ে বিস্তর ধোঁয়াশা। আর বিরোধী দলের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক?
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজির শিক্ষাদীক্ষা এবং মোগল ইতিহাস
দক্ষিণ থেকেই শুরু করা যাক। বিরোধী ঐক্যে শান দিতে দুজনেই হাজির, কংগ্রেস আর সিপিএম, এদিকে দুজনে যুযুধান কেরলে, মাঝেমধ্যেই বিরোধিতা চরমে ওঠে। কর্নাটকে, কংগ্রেস আর জনতা দল সেকুলার এই সামনের কর্নাটকে ভোটে একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেবেন, লড়বেন। কিন্তু তারাই আবার জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে চান। আমি গান্ধী, আমি সাভারকার নই, বলছেন রাহুল গান্ধী, ওদিকে সাভারকার পূজারী শিবসেনার সঙ্গে কংগ্রেসের মহারাষ্ট্র বিকাশ আঘাড়ি, তাঁরাই জাতীয় রাজনীতিতে ঐক্য গড়ে তুলতে চান। আরও একটু ওপরে যান, আপ কংগ্রেসের সম্পর্ক নিয়ে কী নতুন করে কিছু বলার আছে? আপ দিল্লিতে কংগ্রেসকে সরিয়েই ক্ষমতায় এসেছে, পঞ্জাবে কংগ্রেসকে সরিয়ে রাজ্য সরকারে এসেছে। গুজরাতে কংগ্রেসের ভোট ছিল ৪১ শতাংশ, গত নির্বাচনে কংগ্রেসের ভোট কমে ২৭ শতাংশ আর কেজরিওয়ালের আপ ১৪ শতাংশ, মোট ৪১ শতাংশ ভোট। মানে কংগ্রেসের ভোট কেটেই আপের ঝোলা ভরেছে। এরপরেও আপ কর্নাটকে লড়বে, মধ্যপ্রদেশে, রাজস্থানে এমনকী ছত্তিশগড়েও লড়বে। বিজেপির ভোট কাটবে? না। সব্বাই জানি, আপ কংগ্রেসের ভোট কাটবে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস এবং আপ নাকি বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলবে। বাংলায় চোখ ফেরানোর আগে যে কোনও দিনের গণশক্তি খুলে দেখে নিন, বিজেপি এবং মমতার গোপন আঁতাঁত নিয়ে ৭০ শতাংশ খবর পেয়ে যাবেন। কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএম কেরলে লড়েই যাচ্ছে, আর তৃণমূল নেত্রী তো সোজা বলেই দিয়েছেন রাম বাম কংগ্রেস জগাই, মাধাই, গদাইয়ের জোট এ রাজ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। অথচ দিল্লির বিরোধী ঐক্য বৈঠকে তৃণমূল ও বাম দুই দল কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলছে। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়ছে, কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে এঁরা নাকি বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলবেন। অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআর কংগ্রেস আর তেলুগু দেশম দুজনে মুখোমুখি লড়ে যাচ্ছে, আবার দুজনেই জল মাপছে, একজন বিজেপির সঙ্গে গেলে, অন্যজন বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলবে। এই প্রেক্ষিতেই চেন্নাইতে বৈঠক হয়ে গেল।
বিজেডি সেখানে যায়নি, ওয়াইএসআরসিপি ওখানে যায়নি। নতুন কী কথা হল চেন্নাইতে? অন্তত একটা কথা গুরুত্বপূর্ণ তো ছিলই। বৈঠকটা হয়েছিল সোশ্যাল জাস্টিস নিয়ে, এবং বৈঠকে কাস্ট সেনসাস, জাতিভিত্তিক জনগণনা চালু করার দাবি তোলা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত প্রায় প্রত্যেক দলের নেতারা এই কাস্ট সেনসাসের কথা বলেছেন। বিহারে তো নীতীশ সরকার এই কাস্ট সেনসাসের কাজ শুরুও করে দিয়েছে। আপনি বলতেই পারেন আবার সেই পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক মঞ্চে কি মানুষ আস্থা রাখবে? তাহলে আবার ঐ বিরোধী ঐক্যের ইতিহাসেই ফিরে যাওয়া যাক। আগেই বলেছি ১৯৬৭ থেকে বিরোধী দল জোট বাঁধার চেষ্টা করেছে, তারপর থেকে বহুবার এই জোট প্রচেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সফল হয়েছে কখন? প্রথম সফলতা ১৯৭৭-এ, দ্বিতীয় সফলতা ১৯৮৯-এ, বাকি জোট রাজনীতির নামে যা হয়েছে তা হল হয় কংগ্রেস নাহলে বিজেপির সরকারে কিছু দলের সমর্থন। মানে জোটের চাবিকাঠি ছিল ওই দু’ দলের হাতে। তাহলে ওই ১৯৭৭ বা ১৯৮৯-এর সাফল্য কেন এল, সেটা দেখা যাক। সে সফলতা জোটের দলের জন্য আসেনি, মানুষ এক নির্দিষ্ট ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে শাসকদলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। ১৯৭৭-এ ইস্যু ছিল জরুরি অবস্থার বাড়াবাড়ি, গণতন্ত্রহীনতা। ১৯৮৯-এর ইস্যু ছিল করাপশন, অন্তত বিরোধীদের তৈরি বোফর্স ইস্যু মানুষ বিশ্বাস করেছিল। দুটো ক্ষেত্রেই মানুষ ভোট দিয়েছিল শাসকদলের বিরুদ্ধে। অতএব বিরোধীরা যতই বিচ্ছিন হন, একে অন্যের বিরোধী হন, যতই তাঁদের মতাদর্শের ফারাক থাকুক, শাসকদল হেরেছে, ওনাদের কাছে সুযোগ এসেছে মিলিজুলি সরকারের গদিতে বসার। কাজেই বিরোধী দলের মধ্যে আদর্শগত তফাত আছে, বিভিন্ন রাজ্যে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে, এসব সত্যি কিন্তু কোনও ইস্যু যদি মানুষকে শাসকদলকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, তাহলে ওই আদর্শের ফারাক বা একে অন্যের বিরোধিতা কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এখন লাখ টাকার প্রশ্ন হল তেমন কি কোনও ইস্যু আছে, যা মানুষকে সরকার বিরোধী করে তুলতে পারে? অবশ্যই আছে। প্রথমটা হল বেকারত্ব, যা আপাতত এক চরম সীমায়। দ্বিতীয় হল জাতিভিত্তিক জনগণনা, যা এই মুহূর্তে গরিষ্ঠ হিন্দু দলিত, ব্যাকওয়ার্ড কমিউনিটি, আদার ব্যাকওয়ার্ড কমিউনিটির বিশাল সংখ্যক মানুষের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম। অবশ্যই তার সঙ্গেই রয়েছে দেশের সংখ্যালঘু মানুষের সরকার বিরোধিতা। চেন্নাইয়ের বৈঠকে তার সূত্রপাত হয়েছে। নন্দমুরি তারকা রামারাও জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসার বহুদিন পরে একজন দক্ষিণী রাজনৈতিক নেতা মুথুভেল করুণানিধি স্তালিন, আবার বিরোধী জোটের প্রবক্তা হয়ে উঠে আসছেন শুধু নয়, তিনি তুণীর থেকে যে অস্ত্র বার করেছেন, সেই জাতিভিত্তিক জনগণনার ডাকের মধ্যেই থাকতে পারে আগামী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বীজ। দক্ষিণ দুয়োরে কড়া নাড়ার শব্দ, দরজা খুলবে কি?