‘আমরা একসঙ্গে গান গাইবো, খাঁচায় বন্দি পাখিও গান গায়’ এই ক’টা লাইন তিনি শেষ লিখেছিলেন, রোমান ক্যাথলিক চার্চের ফাদার স্ট্যান স্বামী। তারপর আর কিছু লেখেননি, তাঁকে খুন করা হয়েছে, ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত খুন, রাষ্ট্রের নেতৃত্বে জল্লাদেরা তাঁকে খুন করল, কারণ সে ছিল অবাধ্য, পোষ মানা অর্ণব গোস্বামী বা সম্বিত পাত্র নয়। স্টানিস্লাস লরডুস্বামী, কেউ স্ট্যান সাহেব বলে ডাকতো, কেউ কেউ আবার স্বামীজী বলেও ডাকতো, সবার ডাকে সাড়া দিতেন, আর মুখে লেগে থাকতো এক চিলতে হাসি, ২০১৯ এ ভারত সেবা হলে এক সেমিনারে এসেছিলেন, মানবাধিকার কর্মীদের সভা, পেছনের সারিতে বসে একমনে শুনছিলেন অন্যদের কথা, তখন বয়স ৮২। ছিপছিপে রোগা চেহারার এই অশক্ত মানুষটা নাকি দেশের পক্ষে বিপদজনক, কোটি কোটি টাকা মেরে দিয়ে ব্যঙ্ক লুঠ করে বিদেশে চলে গেলো, তাঁরা দেশের পক্ষে বিপদজনক নয়, এই অশক্ত চেহারার ৮৪ বছর বয়সী জেসুইট ফাদার স্ট্যান স্বামী কেন দেশের পক্ষে বিপদজনক? আসুন তাই নিয়েই আজ আলোচনা করা যাক, কখন এক সাধারণ মানুষ, এই রাষ্ট্রের কাছে বিপদজনক হয়ে ওঠে, সেটা বুঝে নেওয়া ভালো।
অন্যান্য চার্চের ফাদারদের মত, সকাল সন্ধ্যায় চার্চের প্রেয়ারে হাজির থাকা, খ্রিস্টান ভক্তদের কাজ শোনার মধ্যেই যদি নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন, তাহলে কি এমনটা হত? কোনখানে রাষ্ট্রের সমস্যা? শুধু তো স্ট্যান স্বামী নয়, এর আগে আরেকজন ক্যাথলিক ফাদার গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইনকে, তাঁর দুই পুত্র সন্তান সমেত জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, হ্যাঁ রাতের বেলায় তাঁদেরকে ঘিরে ফেলা হয়, তাঁরা গাড়িতে উঠে বসেন, গাড়িতে পেট্রোল ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়, আর সেই জঘন্য অপরাধীদের মাস্টার মাইন্ড আজ ইউনিয়ন মন্ত্রী সভার মন্ত্রী, গৌরি লঙ্কেশ, যিনি লিখতেন, কেবল লিখেই প্রতিবাদ জানাতেন, হিন্দু রাষ্ট্রের উদগাতাদের প্ররোচনায়, পরিকল্পনায় তাঁকে তাঁর বাড়ির সামনে গুলি করে মারা হয়, একই ভাবে ওই তালিকায় দাভোলকরের নাম আছে, পানসারের নাম আছে, কেবল এই দেশেই নয়, বিভিন্ন দেশে মৌলবাদীরা এই কাজ করে, বাংলাদেশে অভিজিৎ রায়ের খুন একইভাবে ইসলামিক মৌলবাদীদের সাহায্যেই করা হয়েছিল, ফ্রান্সের পত্রিকা চার্লি হেবেডোর কার্টুনিস্টকে খুন করা হয়েছিল, এমনি এমনি নয়। মৌলবাদের চরিত্রই এমন, তারা বিরোধিতা পছন্দ করে না, তারা বিরুদ্ধ স্বরকে চুপ করিয়ে দিতে চায়, পদ্ধতি দুটো। ক্ষমতায় না থাকলে গুপ্ত হত্যা করো, আততায়ী যাবে মাথা কেটে চলে আসবে, গুলি করবে, কুপিয়ে কুপিয়ে মারবে। আর ক্ষমতায় থাকলে তাঁর নামে অভিযোগের পাহাড় আনো, তাঁকে দেশদ্রোহী তকমা দাও, জেলে পুরে পচিয়ে মারো, আজ নয়, এ বহুকালের পদ্ধতি। বিভিন্ন দেশের শাসকেরা এই পদ্ধতিতে বিশ্বাস করতো, বিরুদ্ধ মতকে তারা এভাবেই চুপ করাতো, স্ট্যান স্বামী আপাতত সেই তালিকায় নতুন সংযোজন মাত্র। আসুন, কেন স্ট্যান স্বামী হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রের কাছে বিপদজনক, তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
বেঙ্গালুরুতে, ইন্সটিটিউট অফ স্যোশাল সায়েন্সে পড়াশুনো করেছেন, আধ্যাত্মবাদ নিয়েও আগ্রহ ছিল, শেষমেষ বেছে নিলেন ক্যাথলিক জেসুইটের মিশনারি কাজ, চলে এলেন বিহারে, তখনও ঝাড়খন্ড তৈরিই হয়নি, কিন্তু আদিবাসী মানুষজন তাঁদের রাজ্যের দাবি তুলছেন, তাঁদের অধিকারের কথা বলছেন। তিনি এলেন সিংভূমের এক প্রান্তে, প্রথম কাজ হো ভাষা শেখা, কিছু ছাত্রদের নিয়ে চলে যেতেন স্থানীয় হাটে। দেখতেন, কেমনভাবে আদিবাসীদের ঠকানো হয়, দেখতেন উন্নয়নের নাম করে কেমনভাবে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়, ক্রমশ জড়িয়ে গেলেন সেই কাজে, আর ফেরা হল না। এরপর ঝাড়খন্ড তৈরি হল, নতুন উদ্দিপনার রেশ কমে আসতেই অন্য আর পাঁচজনের মতই স্ট্যানও বুঝেছিলেন, আদিবাসীদের রাজ্য হলেই হবে না, তাঁদের অধিকারের লড়াইটা লড়তে হবে। এরমধ্যে যদুগোড়ার ইউরেনিয়াম ওয়েস্ট, ইউরেনিয়াম বর্জ ফেলা হবে চাঁইবাসাতে, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন তৈরি হল, ঝাড়খন্ড অর্গানাইজেশন এগেন্সট ইউরেনিয়াম রেডিয়েশন, ছোট করে বলা হত জোয়ার আন্দোলন, তার সামনের সারিতে দেখা গেলো তাঁকে। এরপর তিনি চলে এলেন রাঁচিতে, বাগাইচা জেসুইট চার্চের ক্যাম্পাসে তৈরি করলেন আদিবাসী ছেলেমেয়েদের ট্রেনিং সেন্টার, কেবল আন্দোলন নয়, সঙ্গে চললো নির্মাণের কাজ। বাছাই করা আদিবাসী যুবক যুবতীদের নিয়ে শুরু হল ক্লাস, যেখানে আদিবাসীদের জল জঙ্গল জমির অধিকারের আইনী দিকগুলো নিয়ে আলোচনা হত, লেখালেখি হত, বই ছাপানো হত। আর সেখান থেকেই ছুটে গেছেন ছোটনাগপুর, সাঁওতালপরগণার বিভিন্ন অঞ্চলে, যেখানেই আদিবাসীদের জমিকাড়ার কথা হয়েছে, যেখানেই তাঁদের উচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে, সেখানেই পাওয়া গেছে স্ট্যান স্বামীকে।
আসল সমস্যাটা এইখানে, দেশের ফড়ে পুঁজিপতিদের নজর পড়েছে দেশের আকরিক, খনিজ ভাণ্ডারের ওপর, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বক্সাইট, ডলোমাইট, ইউরেনিয়াম সমেত দামী খনিজ ভাণ্ডারের ওপর বসে আছে কতগুলো অর্ধনগ্ন অশিক্ষিত মানুষ, তাদের কয়েকজনকে নেতা করে দেওয়া হয়েছে, এবার তাদেরকে দিয়ে সই করাতে হবে, ওই পাহাড়, নদী, জঙ্গলের দখল নিতে হবে, কোটি কোটি টাকার ডিল, ফড়ে শিল্পপতিরা একলাই পাবে নাকি? বখরা পাবে মন্ত্রী নেতা, আমলা, দামলারা। নতুন যন্ত্রপাতি কেনা হবে, ইঞ্জিনিয়ার বাবুর চাকরি হবে, কমপিউটার বাবুর চাকরি হবে, ম্যানেজার বাবুর চাকরি হবে, আর কিছু কুলি কামিনের কাজ পাবে আদিবাসীরা, তাদের মেয়েদের নিয়ে ফূর্তি করবে বাবুরা, ছকটা তো জানা। চলছিলও ভালো। কিন্তু কিছু মানুষ, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো শুরু করল। সেই কবে শঙ্কর গুহনিয়োগী সূত্রপাত করেছিল, সংঘর্ষ আউর নির্মাণ। ইউনিয়ন অফিসের বাইরে সন্ধ্যে বেলায় বয়স্কদের স্কুল চলছে, ঘরের মেয়েরা দল বেঁধে গিয়ে চোলাই মদের ভাঁটি ভেঙে আসছে, আটকে যাচ্ছে উচ্ছেদ, চোখ কপালে উঠেছিল সরকারের, তখন ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের শাসন, এক রাতে গুলি করে মারা হল শঙ্কর গুহ নিয়োগীকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, শঙ্কর গুহ নিয়োগী তো একটা আদর্শ, আদর্শকে কি গুলি করে মারা যায়? সে আগুন ছড়িয়ে গেলো, শ্রমজীবী হাসপাতাল হল, আদিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন সংগঠন কাজ করতে লাগলো। উচ্ছেদ, বেদখল, জল জঙ্গল জমি কেড়ে নেওয়া আর তার সঙ্গে কোটি কোটি টাকা মুনাফা আর নিরক্ষর, অর্ধনগ্ন আদিবাসীদের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়লেন কিছু মানুষ, হ্যাঁ রাঁচিতে স্ট্যান স্বামী, ছত্তিশগড়ে সুধা ভরদ্বাজ, সোমা সেন, নাগপুর, পুনেতে সুরেন্দ্র গ্যাডলিং, রোমা উইলসন। তাঁদের হয়ে ছাত্র ছাত্রীরা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের, বিভিন্ন শহরের, দেশের বেশ কিছু মানবাধিকার কর্মীরা, কলেজের অধ্যাপক, লেখক, কবি একসঙ্গে ব্যারিকেড তৈরি করলেন, আটকে যেতে থাকল বিভিন্ন প্রকল্প, দেশের বর্তমান আইনেই সেসব লুঠতরাজ অনেকটা আটকে গেলো, আজ নয়, এ কাজ বহু দিন ধরেই চলছিল, সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের চিল চিৎকার, উন্নয়ন বিরোধী কাজ, এরা উন্নয়ন করতে দেবে না। কাদের উন্নয়ন? উচ্ছেদ হবে কেবল আদিবাসীরা, তাদের ঘর ভেঙে বাঁধ হবে, তাদের পাহাড় কেটে খাদান হবে, তাঁদের নদীর জল হয়ে উঠবে রক্তবর্ণ, ব্যবহারের অযোগ্য, কিসের উন্নয়ন? অন্যদিক থেকেও আওয়াজ আসতে শুরু করল, স্ট্যান স্বামী বই লিখলেন, ‘হয়ার অ্যান্ট ড্রোভস আউট এলিফ্যান্টস, স্টোরি অফ পিপলস রেজিসস্ট্যান্স টু ডিসপ্লেসমেন্ট ইন ঝাড়খন্ড, তথ্য দিলেন, কিভাবে দেশের আদিবাসীদের নির্মমভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, উন্নয়নকে শিখন্ডী করে। ২০০১ থেকে ২০১০ এর মধ্যে, কেবল ঝাড়খন্ডে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া হল ১.৪ লক্ষ হেক্টর জমি, যে জমি সেই অঞ্চলের মানুষের শৈশব, তাঁদের যৌবন, তাঁদের জীবন, সংস্কৃতি। অথচ সেই আদিবাসীরাই সবথেকে গরীব, হাজার একটা বিদ্যুৎ প্রকল্প হলেও তাঁদের ঘরে জ্বলে না আলো, তাঁদের ছেলেমেয়েদের জন্য হাসপাতাল নেই, তাদের জীবন জুড়ে আজও চোলাই, হাঁড়িয়া আর মহুয়া, ইঁদুরের মাংস। ২০০৫ থেকে, সেই আদিবাসীদের আটকানোর জন্য সালওয়া জুড়ুম, মাওবাদের বিরুদ্ধে সামরিক লড়াই অপারেশন গ্রিন হান্ট, মাথায় চিদাম্বরম, এরাজ্যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, দেশের নেতা মনমোহন সিংহ। তিনি সাফ বললেন, খনিজ সম্পদ বহুল অঞ্চলগুলোতে যদি এইসব চলতে থাকে, তাহলে বিদেশি পুঁজি আসবে না। মানে বিদেশী পুঁজি চাই, মরে মরুক আদিবাসীরা। সেই কংগ্রেস আমলেও দমন করা হয়েছে এই উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনকে, কিন্তু নরেন্দ্র মোদির আমলে এল গুণগত পরিবর্তন, একধার থেকে তাদের গ্রেফতার করা শুরু হল, যাঁরা এই আদিবাসীদের হয়ে কথা বলছেন, অবিশ্বাস্য অভিযোগ আনা শুরু হল, স্ট্যান স্বামী কোনও দিন পুণেতে যানইনি, তাঁকে, পুণের ইয়ালগার পরিষদের সভা আর পরবর্তী হিংসার অপরাধে গ্রেফতার করা হল, শুধু তাঁকে নয়, গ্রেফতার করা হল, সুধা ভরদ্বাজ, সোমা সেন, কবি ভারাভারা রাও, সুরেন্দ্র গ্যাডলিং, রোমা উইলসন, সাংবাদিক গৌতম নভলাখা এবং শেষে, ৮ মাস আগে স্ট্যান স্বামীকে। আদিবাসীদের হয়ে কথা বলা চলবে না, তাঁদের জল জঙ্গল জমিন হবে অবাধ লুঠতরাজের ক্ষেত্র, অজুহাত, তাঁরা আর্বান নকশাল, তাঁরা মাওবাদী, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করার চক্রান্তে জড়িত, বিনা বিচারে তাঁরা আটক আজ বছর আড়াই কেটে গেলো, জেলেই মারা গেলেন স্ট্যান স্বামী, ৮৪ বছরের পার্কিনসনস রোগে আক্রান্ত এক জেসুইট পাদরি, অপরাধ? আদিবাসীদের পক্ষে কথা বলা।
কতটা নির্মম হলে এক পার্কিনসনস ডিজিজে আক্রান্তকে, জল খাবার জন্য, স্রেফ জল খাবার জন্য একটা সিপার, একটা স্ট্র দেওয়া যায় না, আদালতের সায় পেতে কেটে যায়, ২০ টা দিন।
যারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত, আসুন আমরা তাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদের সুর আরও তীব্র করি, যদিও জানি জেসুইট পাদরি স্ট্যান স্বামী বেঁচে থাকলে বলতেন, ঈশ্বর ওনাদের মঙ্গল করুক। একটু হাসতেন, তারপর তথ্য পরিসংখ্যান নিয়ে তৈরি হতেন, ভারতীয় সংবিধান হাতে নিয়ে দেখাতেন, আদিবাসীদের জল জমিন জঙ্গল কাড়ার অধিকার কারোর নেই, রাষ্ট্রেরও নেই। সে লড়াই জারি আছে, সে লড়াই জারি থাকবে, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আমরা লড়বো।